প্রতারণার কুফল

আপডেট : ১৯ নভেম্বর ২০২০, ২০:৩১

প্রতারণা অর্থ—ঠকানো বা ফাঁকি দেওয়া, ধোঁকা দেওয়া, বিশ্বাস ভঙ্গ করা ইত্যাদি। শরিয়তের পরিভাষায়—প্রকৃত অবস্থা গোপন রেখে ফাঁকি বা ধোঁকার ওপর ভিত্তি করে নিজ স্বার্থ হাসিল করাকে প্রতারণা বলা হয়। প্রতারণার মাধ্যমে অন্যকে ভুল বুঝিয়ে ঠকানো হয়। এটি মিথ্যাচারের একটি বিশেষ রূপ। মানুষ মানুষকে ঠকানোর জন্য যেসব পন্থা অবলম্বন করে থাকে, সেগুলোর অন্যতম হলো প্রতারণা বা ধোঁকা। এটি একটি জঘন্য অপরাধ। এর দ্বারা সমাজ ও রাষ্ট্রে মানুষের মধ্যে আস্থা ও সম্প্রীতি বিনষ্ট হয়। প্রতারণা নানাভাবে হতে পারে, যেমন—ওজনে কম দেওয়া, জাল মুদ্রা চালিয়ে দেওয়া, পণ্যদ্রব্যের মান গোপন করা, ভালো পণ্যের সঙ্গে মন্দ পণ্য মিশ্রিত করা, ভেজাল মেশানো, খাদ্য ও ফলমূলে ফরমালিন দেওয়া, পণ্যদ্রব্যের মিথ্যা প্রচারণা করা ইত্যাদি। মানবজীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও প্রতারণা হতে পারে। যেমন—পরীক্ষায় নকল করা, মুদ্রা, সার্টিফিকেট, পাসপোর্ট ও অন্যান্য দলিলপত্র জাল করা, মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া, বিশ্বাস ভঙ্গ করা, সত্যের সঙ্গে মিথ্যার মিশ্রণ করা। এমনকি নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথ পালন না করাও প্রতারণার শামিল।

প্রতারণা অত্যন্ত গর্হিত কাজ। এটি মিথ্যাচারের শামিল। অনেক ক্ষেত্রে এটি মিথ্যা অপেক্ষা জঘন্য। প্রতারণার দুটি পাপ—একটি মিথ্যা বলা, অপরটি বিশ্বাস ভঙ্গ করা। সুতরাং সর্বাবস্থায় এটি বর্জনীয়। যে ব্যক্তি প্রতারণা করে সে প্রকৃত মুমিন নয়। কেননা ইমান ও প্রতারণা এক ব্যক্তির মধ্যে একত্রে থাকতে পারে না। প্রকৃত মুমিন কখনো প্রতারণার আশ্রয় নিতে পারে না। নিজ স্বার্থবিরোধী হলেও মুমিন সর্বদা সত্য ও ন্যায়ের ওপর অটল থাকে। মুসলিম শরিফের হাদিস প্রিয়নবি (স) বলেছেন, ‘যে আমাদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করে সে আমার উম্মত নয় আর যে কারো সঙ্গে প্রতারণা করে সে মুসলমানদের দলভুক্ত নয়।’ তিরমিযি শরিফে রসুলুল্লাহ (স) বলেছেন, ‘যে প্রতারণা করে সে আমাদের আমাদের দলভুক্ত নয়।’ (হাদিস নম্বর-১৩১৫)। ইসলামি শরিয়তে প্রতারণা করা, কাউকে ধোঁকা দেওয়া সম্পূর্ণ হারাম। ব্যবসা-বাণিজ্য, লেনদেন, আচার, ব্যবহার, আর্থসামাজিক কর্মকাণ্ডে কোনো অবস্থাতেই প্রতারণা জায়েজ নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা সত্যকে মিথ্যা দিয়ে ঢেকো না এবং জেনে-শুনে সত্য গোপন কোরো না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত-৪২)

প্রতারণা একটি সমাজদ্রোহী অপরাধ। প্রতারককে কেউ পছন্দ করে না। সে সমাজে যেমন ঘৃণিত, তেমনি আল্লাহ তাআলার নিকটও ঘৃণিত। মহানবি (স) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি দোষযুক্ত পণ্য বিক্রি করে এবং ক্রেতাকে দোষের কথা জানায় না, এমন ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার নিকট ঘৃণিত। ফেরেশতাগণ সর্বদা তাকে অভিশাপ দিয়ে থাকেন।’ (ইবনে মাজাহ)। প্রতারণা বা ধোঁকাবাজির পরিণতি জাহান্নাম। রসুলুল্লাহ (স) বলেছেন—‘কোনো ধোঁকাবাজ, কৃপণ ও খোঁটাদানকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (জামে আত-তিরমিযি)। প্রতারক সার্বিক দৃষ্টিতে মানুষের হক নষ্ট করে; যেটা ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। যতক্ষণ না প্রতারিত ব্যক্তি ক্ষমা করে। অর্থাত্, যার সঙ্গে প্রতারণা করা হলো অথবা যাকে ঠকানো হলো তিনি যতক্ষণ না ক্ষমা করবেন ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ তাআলাও তাকে ক্ষমা করবেন না। তাই তো ইসলামি সাম্রাজ্যের বহু মনীষী পণ্য বিক্রি করার সময় পণ্যের দোষ-ত্রুটিগুলো সুস্পষ্টভাবে ক্রেতার নিকট তুলে ধরতেন। সতর্কতা সত্ত্বেও ত্রুটিযুক্ত পণ্য বিক্রি হওয়া অর্থ কোনোভাবে গচ্ছিত অর্থের সঙ্গে মিশে গেলে, সেদিনের সকল অর্থ বিলিয়ে দিয়ে হলেও তারা পরিচ্ছন্ন থাকার চেষ্টা করতেন। এমন দৃষ্টান্ত ইতিহাসে অনেক খুঁজে পাওয়া যায়।

একটি কথা আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রতারণার মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ দিয়ে দান-সদকাহ, ধর্মীয় কাজ, মসজিদ-মাদ্রাসা নির্মাণ এক কথায় সদকায়ে জারিয়ার উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য কোনো কাজ করা বৈধ নয়; এতে কোনো সাওয়াব পাওয়া যাবে না। তার ইবাদত-বন্দেগিও আল্লাহর দরবারে কবুল হবে না। আমরা যেন সর্বাবস্থায় যে কোনো ধরনের প্রতারণা ও ধোঁকাবাজি থেকে নিজেকে নিবৃত্ত রেখে আল্লাহর সান্নিধ্য হাসিল করার চেষ্টা করি এবং নির্মল, স্বচ্ছ, পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর সমাজ গড়ে তুলতে পারি; মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে সে তাওফিক দান করুন। আমীন!

l লেখক :চেয়ারম্যান, আরবি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়