তোমার সঙ্গে ঘর করব অপু

আপডেট : ১৯ নভেম্বর ২০২০, ২১:০৩

অপু, আমি অপর্ণা। আমাকে তোমার মনে পড়ে! বন্ধু পুলুর বোনের বিয়ের নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে এসে শেষ রক্ষা করলে আমার। জানি না নিজে কতটা সুরক্ষিত ছিলে! চাল-চুলো নেই বলে আক্ষেপ ছিল তোমার। বাসর রাতে জিজ্ঞেসও করেছিলে... নানা ছুঁতোয় কতবার জিজ্ঞেস করেছ  অনুশোচনা হয় কি না! অনুশোচনা শব্দটি তোমার কাছেই শেখা। এমনকি ওয়াইফ মানে কী তা-ও আমি জানতাম  না। সেটাও তোমার কাছ থেকে পাওয়া অভিজ্ঞান। তুমি যদি আমার অমন মিষ্টি বর না হতে তাহলে আমার কাছে অপর্ণার এই পরিচয়টা চিরদিন অজানা থেকে যেত। দারিদ্র্য তোমাকে জিতিয়ে দিয়েছিল, জানো। বিয়ের পর অপর্ণার চোখের কাজল খুঁজতে গিয়ে উপন্যাসের এক পাতাও লেখা হয়নি। বলেছিলে উপন্যাসের চেয়ে বড়ো আমি। আমি বিশ্বাস করি তোমাকে। আমার তোমার কাছ থেকে চলে আসতে খুব কষ্ট হচ্ছিল। কলকাতার সেই ধোঁয়া ধোঁয়া জীবনটায় সত্যিই একটা আমেজ ছিল। তোমার মনে আছে আমাদের ঘরের জানালার ছেঁড়া পর্দাটার কথা! প্রথম যেদিন তুমি সেই ঘরটিতে নিয়ে গেলে, সেদিন সেই ছিন্ন পর্দা দেখে আমার চোখে জল গড়িয়ে পড়েছিল, তুমি দেখোনি! তুমি দেখলে হয়তো কত ছাইপাশ ভাবতে, ভাবতে আমি তোমার দারিদ্র্যকে কটাক্ষ করছি! না গো, আমি সেজন্য কাঁদছিলাম না, আমি কাঁদছিলাম সুখে। পাগল বরের আসল পরিচয় বিবাহলগ্নে না প্রকাশ পেলে কী হতো বলো তো! হয়তো সোনার পালঙ্কে গিয়ে গা গড়াতাম, কিন্তু আমার মিষ্টি বরের দুষ্টুমি খুব মিস করতাম। অপু, আমি এখন অনেক ইংরেজি জানি। তুমি তো চেয়েছিলে আমি এই ভাষায় পারদর্শী হই। তা সে সড়গড় হয়েছে! তুমি কি ইংরেজি জানা কোনো শহুরে মেয়ের জীবনকথা তোমার উপন্যাসে লিখতে! অপু, আগের জীবনটা আমাকে পিছু টানে! মনে পড়ে গেল, রাতে আমার শাড়ির আঁচলের সঙ্গে তোমার ধুতির খুঁট বেঁধে রেখেছিলে যাতে সকালে তোমার কাছ থেকে আমি পালিয়ে যেতে না পারি। আমাকে হারাবার তোমার এত ভয় ছিল! অপু, আমি সারাক্ষণ তোমায় খুঁজি জানো! আমার বর্তমান স্বামী একজন কেউকেটা। অর্থ যশ তার সবই আছে। সেই বলেই আমার সঙ্গে তার সংসার। সংসার! সংসারের সত্যিকারের মানে কী তা তো আমার অজানা নয় অপু! আমাদের সেই দারিদ্র্যমথিত সংসারের সৌরভ সারা ঘর জুড়ে থাকত! অপেক্ষায় থাকতাম উদয়স্ত পরিশ্রম শেষে কখন তুমি ঘরে ফিরবে! তোমাকে টিউশনি ছেড়ে দিতেও বলেছিলাম, সন্ধের আগে তোমাকে কাছে পাবার জন্য। তোমার খুনশুটি তোমার আদর তোমার আশ্লেষ তোমার অপর্ণাকে কত ভরিয়ে রাখত তা কি তুমি জানতে! আমার বর্তমান স্বামীর জন্য আমাকে অপেক্ষা করতে হয় না। অপেক্ষা শব্দটি তার অভিধানে নেই। কোনো ধরনের অপেক্ষাই তিনি করতে চান না। আমার বিয়ের সময় আমার মতামতের অপেক্ষা তিনি করেননি। বাসর রাতে শাড়ি খোলার সময়ও না। তিনি জানেন না—নারী নদীর মতো কীভাবে জেগে ওঠে, কীভাবে বয়ে যায়! কীভাবে স্রোতস্বিনী কলস্বনা হয়! নারী তার কাছে  নিতান্তই ব্যবহার্য বস্তু। সাবান-শ্যাম্পুর মতো ফুরিয়ে গেলেই ব্র্যান্ড চেঞ্জ। আমি চুলে সন্ধ্যামেথি মাখতাম। তুমি সারারাত আমার চুলের অরণ্যে নাক ডুবিয়ে নিতে তার আঘ্রাণ! খুব ভালোবাসতে চুল সরিয়ে আমার পেলব গ্রীবা দেখতে। পাখির মতো নাক ঘষতে। আমি তখন তোমার আকাশে উড্ডীন। উড়ে চলেছি এক অজানা নক্ষত্রের পানে। তোমার দু’চোখে খুঁজে পেয়েছিলাম তার ঠিকানা। আশ্চর্য তোমার সেই সম্মোহনী দৃষ্টি। ভালোবাসা দিয়ে বিবশ এবং বশ করতে একমাত্র তুমিই পারো। কতদিন আমি মানুষের চোখ দেখি না জানো! চোখের কোটরে ঘোর অন্ধকার। ক্লেদ। জিঘাংসা। কাল রাতে হঠাত্ নিষ্পেষণে ঘুম ভেঙে গেল। আমার ঘুমন্ত শরীর নিয়ে উন্মত্ত আমার স্বামী, কী পৈশাচিক উল্লাস। অনেক রাতে বাড়ি ফিরেছেন। ইচ্ছে হয়েছে শরীর চাখতে। বিয়ে করা বউয়ের অনুমতি লাগে না। এই উল্লাসকে ধর্ষণও বলা যাবে না। বলবে এ তো পৌরুষ! বীরভোগ্যা বসুন্ধরা। এখানে অপর্ণা সুপর্ণা ঋতুপর্ণার মধ্যে কোনো প্রভেদ নেই। রতিঘোরে আমার স্বামী কত নামে যে আমায় ডেকেছে! ঘরের দাসী থেকে শুরু করে বিগতযৌবনা পাশের বাড়ির আন্টিও তাকে রতিসুখ দিয়েছে। আমি সেখানে কলকব্জা মাত্র। আমার কোনো দুঃখ হয়নি জানো! আমি যে পূর্বজন্মে তোমায় পেয়েছিলাম। আর জন্মে তোমায় পাব কি না জানি না! আমি কিন্তু সত্যিই তোমার অপেক্ষায়  থাকব। ভুল বলছি প্রতীক্ষায়। তোমার সঙ্গে ঘর করব। তুমি টানা গাড়িতে আমায় নিয়ে কলকাতা দেখাবে। আমি পয়সা খরচ হবে বলে আক্ষেপ করব। তুমি ঘোর দারিদ্র্যের মধ্যে থেকেও ঔদার্য্যের হাসি সারা মুখে ছড়িয়ে সিগারেট জ্বালাতে যাবে, আমি সদ্য নাগরিক বউ হয়ে শলাকায় অগ্নিসংযোগ করব। একদিন একটি মধুর স্বপ্ন রচনার জন্য এই বাড়তি খরচটুকু আমরা দুজনেই মেনে নেবো। তুমি আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলবে—তোমার চোখে কী আছে বলো তো! আমি বলব ‘কাজল’। তুমি অনবধানে আমাদের অনাগত সন্তানের নাম রাখবে ‘কাজল’। জয় গোস্বামীর একটি কবিতার পঙিক্ত মনে পড়ে গেল। ‘কলঙ্ক আমি কাজলের ঘরে থাকি, কাজল আমার জানে সমস্ত কথা, কলঙ্ক আমি তীর বেঁধা এক পাখি মানি না অবৈধতা।’ অপু, সত্যিই আমি তোমাকে খুঁজছি। এই বৈধ সমাজটিকে আমার সবচেয়ে অবৈধ মনে হয়। এই যে বৈধ বৈবাহিক সম্পর্কের মাঝে আমার বাস, নিত্য অজাচারের সঙ্গে আমার সহবাস, এর থেকে আমি মুক্তি চাই। আমি চাই সব অপর্ণারা মুক্ত হোক এই বিভীষিকা থেকে। সবাই আমার মতো অপুর সংসারের স্বপ্ন দেখুক। অপুর সন্তানের মা হোক। তার জন্য অপর্ণার যদি স্বল্পায়ুও হয় কোনো  ক্ষতি নেই। আমরা সারাজীবন অল্পের জন্যই বাঁচি, বাকি সময়টা কাটাই।

‘অপুর সংসার’-এর অপু ও অপর্ণা [সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও শর্মিলা ঠাকুর]