দি এক্সেল ক্রোধ নয়, মমতায় বাঁধা যায় প্রাণ

আপডেট : ১৬ জানুয়ারি ২০১৯, ১৮:৩১

 

মা হ বু ব  আ ল ম

 

চিরাচরিত এক রূপরেখা ভাইয়ে ভাইয়ে দ্বন্দ্ব। ক্ষমতার স্বাদ আস্বাদনের জন্য রাজমহলে ভাই যে ভাইকে হত্যা করতে পারে, সে একেবারেই চিরচেনা ঘটনা। বাংলা নাট্য সাহিত্যেও এর দেখা পাওয়া যায় বিস্তর। পৃথিবীর সকল রাজমহল এভাবেই কলঙ্কিত হয়েছে। রাজা ফকিরের রচনা ও নির্দেশনায় সংশপ্তক থিয়েটারের ‘দি এক্সেল’ নাটকটিও সেই ষড়যন্ত্রের বুনন। রোমান চ্যারিটিতে স্যাটান তার ভাই সিমনকে ক্ষমতার লোভে কারাগারে বন্দি করে রাখে। সেই সঙ্গে প্রহরীদের নির্দেশ দেয় যেন সিমনকে এক ফোঁটা পানিও পান করতে না দেওয়া হয়। ধুঁকে ধুঁকে মেরে ফেলতে চায় সে তার ভাইকে। পিতৃ সমতুল্য ভাইকে হত্যা করতে নীল নকশাটা অবশ্য আঁকে স্যাটার্নের স্ত্রী জুনো। রাজা সিমনের একমাত্র পুত্র ঘাতকের হাতে নিহত হলে সিংহাসনের আর কোনো উত্তরাধিকার থাকে না। তখন পেরোর স্বামী, সিমনের জামাতা ঈনিয়াস যুদ্ধ জয় করে ফিরলে সীমন খুশি হয়ে তাকে সিংহাসনের উত্তরাধিকার বানাতে চায়। কিন্তু নিয়তি তার সহায় হয় না। একদিকে সন্তানসম্ভবা পেরো প্রসব যন্ত্রণায় কাতর অন্যদিকে রাজ প্রাসাদে ষড়যন্ত্র করে ঈনিয়াসকে হত্যা। পেরো ঈনিয়াসের সন্তান পোলাস দেখতে পেল না তার পিতাকে। পেরো প্রাসাদে ফিরে জানতে পারে তার স্বামীকে হত্যা করা হয়েছে এবং পিতা সিমনকে বন্দি করে রাখা হয়েছে কারাগারে। পেরো তার পিতা সিমনকে দেখার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে। অনুরোধ করে তার চাচা স্যাটার্নকে। স্যাটার্ন তাকে দেখা করার অনুমতি দেয় কিন্তু কোনো খাদ্যদ্রব্য না নেওয়ার জন্য বলে। কারাগারে পিতার সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে বেদনাতুর হয়ে পড়ে পেরো। সিমন পানির জন্য হাহাকার করতে থাকে। তৃষ্ণার্ত পিতাকে বুকের দুধ খাওয়ানো ছাড়া আর কোনো পথ থাকে না তাকে বাঁচানোর। শেষে কন্যা হয় মাতা আর পিতা হয় পুত্র। উপায়ন্তর না দেখে সে এক কোলে তার সন্তান পোলাসকে রেখে নিজের স্তনের দুধ পান করার আহ্বান করে পিতাকে। মুহূর্তেই যেন প্রকৃতি নিজের রূপ বদলে ঐশ্বরিক আকার ধারণ করে। কন্যা, মাতা হয়ে স্বর্গীয় সুধা পান করাতে থাকে পিতাকে। নাট্য ঘটনা এখানে এসে বাঁক নেয় ক্রুরতা থেকে মমতায়। কন্যার মধ্যে বোধদয় ঘটে মাতৃত্বের। উপলব্ধি হয়—ক্রোধ নয়, মমতায় বাঁধা যায় প্রাণ। কন্যার দুগপানে বেঁচে যায় পিতার জীবন। কিন্তু সেখানেও রক্ষা পায় না তারা। কন্যা পেরো ধরা পরে যায় রক্ষীদের হাতে।

বগুড়ার সাংস্কৃৃতিক অঙ্গনে যে কয়টি নাটকের দল নাট্যচর্চায় নিয়মিত তাদের একটি সংশপ্তক থিয়েটার। বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশানের অন্তর্ভুক্ত নাটকের দল সংশপ্তক থিয়েটার তাদের আমন্ত্রণে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে নাট্য প্রদর্শনীর জন্য আসে গত ১১ জানুয়ারি সন্ধ্যায়। সংশপ্তক এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার হলে থিয়েটার তাদের নিয়োমিত আয়োজন ‘দি এক্সেল’ নাটকের মঞ্চায়ন করে সফলভাবে। রোমান চ্যারিটি অবলম্বনে ‘দি এক্সেল’ নাটকটি সংশপ্তক থিয়েটারের ৩৬তম প্রযোজনা। নাটকের শুরুতে এপিডি অ্যাঞ্জেলের আশা জাগানিয়া কোরিওগ্রাফি দেখে মন আনন্দে নেচে ওঠে, কিন্তু নাটকের দৃশ্যান্তরে কালক্ষেপণ সেই আনন্দকে মাটি করে দেয়। দৃশ্যান্তরে আরও সময় সচেতন হওয়া জরুরি। নাটকে ঈনিয়াসকে হত্যা করা এবং পেরোর সন্তান জন্ম দেওয়া দুটো আলাদা ঘটনা; পেরোর ভাইয়ের হত্যার বর্ণনা; সীমন ও ঈনিয়াসের আলাপকালে গুপ্তচরের দেখা—এই ঘটনাগুলো ভিন্নভাবে উপস্থাপন হলে দৃশ্যকাব্য আরও প্রাণবন্ত হতো হয়তো। শেষের দিকে ঘনঘন দৃশ্য বদল মনে হয়েছে শেষ করার তাড়া দিচ্ছে কেউ। দৃশ্যগুলোর নাটকীয়তা প্রাণ প্রতিষ্ঠা পাওয়ার আগেই তা যেন প্রাণহীন হয়ে যাচ্ছে। পোশাকে আরও যত্নশীল হওয়া দরকার ছিল। তবে ভালোর ভালো হচ্ছে দলের সকলের সমন্বিত অভিনয়। দারুণ সাবলীল অভিনয় করেছেন সবাই। বিশেষ করে সিমন চরিত্রে সাদেকুর রহমান সুজনের সু-অভিনয় নজর কেড়েছে বেশি। নাটকের সুন্দর আবহ সংগীত করেছেন কাজল।

‘দি এক্সেল’ নাটকের বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন আব্দুলাহেল কাফী তারা, সাদেকুর রহমান সুজন, নিভা সরকার পূর্ণিমা, শুভ মোহন্ত, সাবিনা ইয়াসমিন, রহিমা খাতুন, মৃন্ময় রায়, অভি, গৌরব, শুভন, রুমা খাতুন, আলিফ, জুঁই, নীরব, আপন, শাওন।