আবুল মাল আবদুল মুহিতের স্থলে নতুন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তাফা কামাল তার কার্যভার গ্রহণ করেছেন কয়েকদিন আগে। এরই মধ্যে তিনি তার অনেক করণীয় সম্পর্কে বিভিন্ন কাগজে বলেছেন। দু’য়েক জায়গায় তিনি সাক্ষাত্কারও দিয়েছেন। এসব থেকে বোঝা যাচ্ছে তার অগ্রাধিকার কী? আমার কাছে মনে হয়েছে, তার অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রগুলোর অন্যতম হচ্ছে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি এবং ব্যাংকিং খাত। ২০১৮-১৯ অর্থ বছরের প্রথম ছয় মাসের যে রাজস্ব আদায় পরিধার্য তাতে মনে হয় যথার্থই তিনি রাজস্ব বৃদ্ধির ক্ষেত্রটি বেছে নিয়েছেন প্রথম করণীয় ক্ষেত্র হিসেবে। কাগজে দেখলাম ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে ‘জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের’ (এনবিআর) মোট ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২৪ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা। ছয় মাসের লক্ষ্যমাত্রা ছিল এক লাখ ২৬ হাজার ২৫০ কোটি টাকা। এর বিপরীতে রাজস্ব আদায় হয়েছে মাত্র এক লাখ এক হাজার ৮শ কোটি টাকা। ‘জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের’ আয়ের প্রধান তিনটি উত্স যথা: ‘মূল্য সংযোজন কর’ বা মূসক বা ‘ভ্যাট’, আমদানি শুল্ক এবং আয়কর। দেখা যাচ্ছে, তিনটিতেই বিশাল ঘাটতি দেখা দিয়েছে। সবচেয়ে বেশি ঘাটতি ‘মূসক’-এর ক্ষেত্রে। তারপরেই আমদানি শুল্ক এবং তৃতীয় স্থানে রয়েছে আয়কর।
উল্লেখ্য, বছরের লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে সর্বমোট ২ লাখ ৯৬ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রথম ছয় মাসের লক্ষ্যমাত্রা ছিল বরাবরের মতোই কিছুটা কম অর্থাত্ এক লাখ ২৬ হাজার ২৫০ কোটি টাকা। প্রথম ছয় মাসে আদায় পরিস্থিতি একটু কম থাকে এবং পরের ছয় মাসে তা গতি পায়। এতে বছর শেষে মোটামুটি লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়ে যায়। তবে গত কয়েক বছর যাবত্ই দেখা যাচ্ছে লক্ষ্যমাত্রা মাফিক রাজস্ব আদায় হচ্ছে না। এর জন্য অর্থনীতিবিদরা মাত্রাতিরিক্ত লক্ষ্যমাত্রাকে দায়ী করেন। বলা হয়, লক্ষ্যমাত্রা উচ্চাভিলাষী কিন্তু প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী এসব শুনতেন না। তিনি বড় টার্গেটে বিশ্বাস করতেন। সেই বিশ্বাস থেকেই তিনি ২০১৭-১৮ অর্থ বছরের তুলনায় ২০১৮-১৯ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৩২ শতাংশ বৃদ্ধি করেন। এখন দেখা যাচ্ছে বছরের ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও লক্ষ্যমাত্রা মাফিক রাজস্ব আদায় হয়নি। আগামী ছয় মাসের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা আরো কঠিন হবে। এদিকে দেখা যাচ্ছে আমদানি ঋণপত্র খোলার হার বেশ কম। আগের মতো আমদানি হৈ হৈ করে বাড়ছে না।
কাগজে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির পরিমাণও কমে গেছে। কমে গেছে অনেক নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের আমদানি। এর মধ্যে আছে চিনি, গুঁড়ো দুধ, সয়াবিন, ওষুধের কাঁচামাল, সিমেন্ট তৈরির ক্লিঙ্কার, আপেল, কমলা জাতীয় ফলমূল। বলা হচ্ছে, নির্বাচনই এর কারণ। নির্বাচনকে উপলক্ষ করে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রায় পুরোটাতেই প্রচুর আমদানি হয়েছে। সরকার তার অবকাঠামোর জন্য, বড় বড় মেগা প্রজেক্টের জন্য প্রচুর ঋণপত্র খুলেছে। তেলের দামও গেল অর্থবছরের বেশ কিছুটা সময় বেশি ছিল। এতে আমদানি মূল্য বেশি হয়েছে অর্থাত্ আমদানিও হয়েছে বেশি বেশি।
এখন বড় বড় ঋণপত্র বা এলসি খোলার প্রবণতা কম। সঙ্গত কারণেই আমদানির পরিমাণ হ্রাসের দিকে। আরেকটি কারণ ব্যাংক ফিন্যান্স। ব্যাংক অনেক ক্ষেত্রে মাত্রাতিরিক্ত আমদানি ব্যবসা ফিন্যান্স করে তাদের ‘লিক্যুইডিটি’ সমস্যা তৈরি করে। এখন তারা ঐ সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে। ইতোমধ্যে একটা ক্ষতি হয়ে গেছে। আমানত বৃদ্ধির তুলনায় ঋণের সরবরাহ বেশি হয়েছে। এর ফলে ডলারের দামের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়েছিল। ডলার হয়ে ওঠে দুর্লভ। অবস্থা এমন হয়েছে এখন অনেক ব্যাংক তার এলসির অঙ্গীকার রক্ষা করতে পারছে না। বিদেশি রপ্তানিকারকরা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে অভিযোগ করেছে বলে খবরে প্রকাশ। কারণ কিছু কিছু ব্যংক অতিরিক্ত আমদানি ঋণপত্র খুলে এখন তার বিপরীতে ডলারে পরিশোধ করার মতো ‘লিক্যুইডিটি’ জোগাড় করতে পারছে না। এসব কারণে ব্যাংকও এখন আমদানি ঋণপত্র খুলতে বেশ কিছুটা সাবধানী। আবার সাধারণভাবেই ব্যাংকগুলো এখন অতি সাবধানী হয়েছে দেশে তাদের সম্পর্কে বিরূপ ধারণা সৃষ্টি হওয়ার কারণে।
অতএব, দেখা যাচ্ছে, আমদানি কমছে। আমদানি কমলে স্বাভাবিকভাবেই আমদানির বিপরীতে শুল্ক আদায়ের হারও কমবে। যেহেতু আমাদের বাজার আমদানিনির্ভর, অতএব, এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সর্বত্র অনুভূত হবে, তাই স্বাভাবিক। ব্যবসা-বাণিজ্য কমলে ‘ভ্যাট’ আদায়ও কমবে। আবার এর প্রভাব পড়বে আয়কর আদায়ে। আয়করের একটা অংশ আসে অগ্রিম আয়কর আদায় থেকে। এটা উেসই আদায় করা হয়। সরকার দফায় দফায় পোশাক রপ্তানির ওপর উেস কর হ্রাস করেছে। তা ছিল এক শতাংশ। দুইবার তা হ্রাস করে এখন করা হয়েছে দশমিক ২৫ শতাংশ। এর প্রভাবও পড়েছে রাজস্ব আদায়ে। সর্বোপরি নির্বাচন অনেক ব্যবসা-বাণিজ্যকে শ্লথ করে দিয়েছে। নির্বাচনে ব্যস্ত ছিল বহুসংখ্যক বড় বড় ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি। তারা কয়েক মাস ব্যবসায় মন দিতে পারেননি। অনেক বিনিয়োগ উদ্যোগও হয়েছে বিলম্বিত। এর প্রভাব বিনিয়োগে যেমন পড়েছে, তেমনি পড়েছে দৈনন্দিন ব্যবসা-বাণিজ্যে। এমন একটা মন্দভাবের মধ্যেই আবার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা গেল বছরের তুলনায় ৩২ শতাংশ বেশি। রাজস্ব বোর্ডের শীর্ষ কর্মকর্তা চেয়ারম্যান সাহেব লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় হবে না বলে মত প্রকাশ করেছেন। অথচ অর্থমন্ত্রী চান লক্ষ্য মাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব। এই হচ্ছে বর্তমান সময়ের চ্যালেঞ্জ। কারণ লক্ষ্যমাত্রানুযায়ী রাজস্ব আদায় না হলে সরকারের উন্নয়ন কাজ বিঘ্নিত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা। সরকার রাজস্ব বাজেটে বড় বেশি ধরতে পারবে না। অতএব বরাবরই যা হয় এবারও তাই হতে পারে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) কাটছাঁট হতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে কত পরিমাণ হ্রাস হবে। আরেকটা পথ আছে। সরকারকে বাজার থেকে ঋণ করতে হবে। হয় ব্যাংক থেকে নতুবা সঞ্চয়পত্র থেকে। ব্যাংক থেকে সরকার ঋণ করুক ব্যবসায়ীরা তা পছন্দ করেন না। তারা মনে করেন, এতে তাদের ভাগে কম পড়বে। এমন একটা পরিস্থিতির মুখোমুখি নতুন অর্থমন্ত্রী।
এখন রাজস্ব বৃদ্ধির যে তিনটি উত্স আছে তাকে নড়াচড়া করিয়ে রাজস্ব কিছুটা বৃদ্ধি করা যায় কিনা তাই ভাবতে হবে। ‘মূসক’-এর ক্ষেত্রে সরকারের অনেক করণীয় আছে। এটা সোনার খনি। বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, মোট মূসকের অর্ধেকই আসছে কয়েকটি কোম্পানি থেকে। বাংলাদেশ আমেরিকা টোবাকো কোম্পানি এই অর্ধেকের মধ্যে ২০-২৫ শতাংশ দেয়। এখন মুশকিল হচ্ছে এর বাইরে ভ্যাট আদায়ের পরিস্থিতি হতাশজনক। ঢাকা দক্ষিণের ওপর কিছুদিন আগে একটা জরিপ হয়। ৫৯টি বড় বড় মার্কেটে জরিপ চালানো হয়। প্রায় ৯ হাজার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করা হয়। এরমধ্যে নিবন্ধিত হচ্ছে প্রায় ৫০ শতাংশ এবং বাকিরা নিবন্ধিত নয়। নিবন্ধিতদের মধ্যে মাত্র ৫৭৫টি প্রতিষ্ঠান ‘ভ্যাট’ দেয়। ৬৫১ জন প্যাকেজ পদ্ধতিতে ভ্যাট দেয়। এর থেকে বোঝা যায় ভ্যাট আদায়ের পরিস্থিতি কী। ব্যবসায়ীদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ভ্যাট আইন স্থগিত আছে। এই জট ভাঙানোর দায়িত্ব নতুন অর্থমন্ত্রীর ওপর বর্তেছে। দেখার বিষয় তিনি এই দায়িত্ব পালনে কীভাবে এগোন।
বলা বাহুল্য, এই ‘সোনার খনি’ যদি সত্যি সত্যি আবিষ্কৃত হয় তাহলে রাজস্বের অভাব অনেকটা কাটবে। রইল বাকি ‘শুল্ক’, আমদানি শুল্ক। এখানে ফাঁকির পরিমাণ কত তা আন্দাজ করা কঠিন। ২৫-৩০ শতাংশ ফাঁকি রোধ করতে পারলেও প্রচুর রাজস্ব বৃদ্ধি পাওয়া সম্ভব। অথচ কাজটি খুবই কঠিন। এর সাথে জড়িত দেশের বড় বড় ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, আমদানিকারকরা। তাদের সহযোগিতায় কিছু একটা অগ্রগতি দেখাতে পারলে দেশ বেঁচে যায়। আরেকটা ফাঁকির জায়গা ‘বন্ডেড’ ওয়্যার হাউজ। এই সুবিধাটির অপব্যবহার হচ্ছে দীর্ঘদিন যাবত্। ‘এনবিআর’-এর প্রাক্তন চেয়ারম্যান গত বছরের অক্টোবর মাসে বলেছিলেন, এই ফাঁকিতে রাজস্ব ক্ষতি প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা। এই ক্ষেত্রে প্রচুর করণীয় আছে। মুশকিল হচ্ছে, এসবে অগ্রগতি দেখাতে না পেরে সরকার আয়করের ওপর মাত্রার বাইরে গুরুত্ব দিচ্ছে। বলা হয় ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত আমাদের কম। দৃশ্যত তাই। কিন্তু মানুষকে সরকারের প্রায় সব সার্ভিস পেতে পয়সা-টাকা খরচ করতে হয়। এটা করের সাথে যোগ করলে পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে তা সহজেই অনুমেয়। মধ্যবিত্ত মা-বাবাকে দেখে, বেকার ভাই-বোনদের দেখে, এমনকী পাড়া-প্রতিবেশিকেও অনেক সময় সাহায্য করতে হয়— যা উন্নত দেশে সরকারের দায়িত্ব। এসবের পেছনে খরচ হয়, চিকিত্সার জন্য যে খরচ হয় তা যোগ করলে করের পরিমাণ কত হয় তা আরো সহজে অনুমেয়। এসব বিবেচনা করে নতুন মন্ত্রী মহোদয় এগুবেন আশা করি।
n লেখক : অর্থনীতিবিদ এবং সাবেক শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
