শিশুদের সুরক্ষায় চাই সামাজিক প্রতিরোধ

আপডেট : ১৬ জানুয়ারি ২০১৯, ২২:১৭

প্রাণবন্ত ও হাসিখুশি শিশুরাই আগামী দিনে জাতিকে নেতৃত্ব দিবে। প্রত্যেক সুস্থ ও সবল শিশুই একটা সুস্থ জাতির প্রতীকি স্বরূপ। তাই পরিবারের পাশাপাশি প্রতিবেশী, সমাজ, বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও সর্বোপরি রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে শিশুদের সুষ্ঠুভাবে বেড়ে ওঠার পরিবেশ সুনিশ্চিত করা। শিশুদের পরিপূর্ণ বৃদ্ধির জন্য মৌলিক চাহিদাসহ আরও কিছু অত্যাবশ্যকীয় চাহিদা পূরণ করতে হয় পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রকে। তবে দুঃখজনক হলেও এটি চরম সত্য যে বর্তমানে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র শিশুদের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। ফলাফল স্বরূপ শিশুরা প্রতিনিয়তই হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের যৌন হয়রানির শিকার। বেড়ে যাচ্ছে শিশু ধর্ষণসহ অপ্রত্যাশিত শিশু মৃত্যুর হার।

সাম্প্রতিককালে শিশু ধর্ষণ ও অমানুষিক নির্যাতনের পর শিশু হত্যার ঘটনা ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ডেমরার দুই শিশু ধর্ষণের পর হত্যা, সাতক্ষীরার আশাশুনিতে দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রীকে ধর্ষণের পর হত্যা, রাজধানীর তুরাগে ৬ষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী, কুষ্টিয়ায় ৩য় শ্রেণির ছাত্রী, জামালপুরে ৮ম শ্রেণির ছাত্রী, কুড়িগ্রামে ৫ম শ্রেণির ছাত্রীকে ধর্ষণ। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি এলাকাই শিশুদের জন্য অনিরাপদ। প্রতিদিন পত্রিকার পাতা উল্টালেই শিশু নির্যাতন, শিশু ধর্ষণসহ অনেক খারাপ খবর আমাদের নজরে আসছে, যা একজন সুস্থ মানুষের পক্ষ থেকে মেনে নেওয়া প্রায় অসম্ভব। দেশের আনাচে কানাচে প্রতিদিন ধর্ষকের বিষাক্ত ছোবলের শিকার হচ্ছে শিশুরা। ধর্ষকরা আদিম চাহিদা মিটাবার জন্য শিশুদের অপব্যবহার করছে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে, ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন জায়গায় ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৭১১ জন। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৬০ জনকে। ধর্ষণ চেষ্টা করা হয়েছে ৯৮ জনকে। আর ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করেছে ৭ জন। অন্যান্য বছরের তুলনায় ২০১৮ সালে ধর্ষণের হার কিছুটা কমলেও শিশুদের উপর চালানো বর্বরতা ছিল খুবই পৈশাচিক ও নির্মম। ধর্ষণের পর হত্যার চেষ্টা চালানো হয় প্রায় ক্ষেত্রেই। বিকৃত যৌন চাহিদা নিবৃত্ত করার জন্য শিশুদের উপরে চালানো হয় তাণ্ডবলীলা যা হত্যা পরবর্তী সময়ে যে কেউ দেখলে আঁতকে উঠবে।

এত বেশি শিশু ধর্ষণের মূল অনুঘটক হচ্ছে সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়। আর এ অবক্ষয়ের গতিকে আরও বেশি ত্বরান্বিত করে মাদকদ্রব্য সেবন ও পর্ণগ্রাফির মতো অনৈতিক কর্মকাণ্ডগুলো।

এছাড়াও অশ্লীল পত্র-পত্রিকা ও বই ধর্ষককে উত্সাহ যোগান দেয়। বিভিন্ন সিনেমায় জোরপূর্বক ধর্ষণের দৃশ্যও ধর্ষকের অভিরুচিকে আরও বেশি বিকৃত করে তোলে। তাছাড়া পারিবারিক ও ধর্মীয় অনুশাসন না থাকলেও যে কোনো ব্যক্তি খুব সহজে এ ধরনের ন্যক্কারজনক কাজে নিয়োজিত করতে পারে। আমাদের দেশের আইনী প্রক্রিয়ায় যথেষ্ট ফাঁক-ফোঁকর থাকায় ধর্ষকরা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পাচ্ছে না। এমনকি অনেক সময় ধর্ষকরা নিজেদের ক্ষমতা প্রয়োগ করে থেকে যায় ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। তাছাড়া কালো টাকার ছড়াছড়িও এক্ষেত্রে জাদুটোনার মতো কাজ করে।

আর কত? ধর্ষণ যে শুধু একটি শিশুর সম্ভ্রম কেড়ে নেয় তা নয় বরং ধ্বংস করে দেয় তার সমস্ত সম্ভাবনাগুলোকে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিশুরা শারীরিক ও মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে। সারাজীবন তাকে এই কলঙ্কের অভিশাপ বয়ে নিয়ে বেড়াতে হয়। প্রত্যেকটা মুহূর্ত সে মরে মরে বাঁচে। জীবন্ত লাশ হয়ে অতিবাহিত করতে হয় সমস্ত জীবন তার সম্ভাবনাময় জীবনকে বিসর্জন দিয়ে। এটুকুতেই শেষ নয়। এক্ষেত্রে সমাজের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করা আরও বেশি দুষ্কর।

গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুরা মূলত ধর্ষিত হয় আত্মীয়-স্বজন ও পরিবারের খুব কাছের লোকজন দ্বারা। তাই পরিবারের লোকজন বিশেষ করে মা-বাবাকে সব সময় সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে শিশুদের প্রতি এবং কারো আচরণ সন্দেহজনক হলে দ্রুত তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। সর্বোপরি শিশু ধর্ষণের বিরুদ্ধে আমাদের তীব্র প্রতিবাদ গড়ে তুলতে হবে। ধর্ষকদের দ্রুত প্রচলিত আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। পরিবেশ যেন শিশুবান্ধব হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। তাই আসুন আমরা প্রত্যেকে মাদকদ্রব্য ও পর্ণগ্রাফীকে না বলি ও শিশু ধর্ষণ বন্ধে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলি। পাশাপাশি শিশুদের সুস্থ, সুন্দর ও স্বাভাবিক বেড়ে ওঠা নিশ্চিত করি। গড়ে তুলি এমন সোনার বাংলা যেখানে ধর্ষকের কোনো স্থান হবে না।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়