সময় বাড়ানোর গুঞ্জন
ইত্তেফাক রিপোর্ট
করোনার ধাক্কা লেগেছে এবারের করদাতাদের আয়কর বিবরণী বা রিটার্ন জমার ক্ষেত্রে। স্বাভাবিক নিয়মে আগামীকাল (৩০ নভেম্বর) আয়কর রিটার্ন জমার শেষ দিন। এর পর রিটার্ন জমা দিতে হলে জরিমানা গুনতে হবে। ফলে অতীতে এই সময়ের মধ্যেই বেশির ভাগ করদাতা তাদের আয়কর রিটার্ন জমা দিতেন। কিন্তু এবার এই সময়ে করদাতাদের আয়কর রিটার্ন জমা পড়েছে প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, গত বছরের এই সময়ের মধ্যে ১৬ থেকে ১৭ লাখ রিটার্ন জমা হলেও এবার এখন পর্যন্ত তার অর্ধেকের মতো রিটার্ন জমা হয়েছে। অথচ এবার সামান্য কিছু ব্যতিক্রম বাদে সব করদাতার রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করেছে এনবিআর। এবার স্বাভাবিকভাবেই গতবারের চেয়েও রিটার্ন জমা বেশি হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।
এ পরিস্থিতিতে ব্যাপকভাবে আলোচনা হচ্ছে, এনবিআর রিটার্ন জমার জন্য সময় বাড়ায় কি না। সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকের এ বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে এনবিআর চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম জানিয়েছিলেন, সময় বাড়ানোর সুযোগ নেই। তবে কেউ সময়মতো রিটার্ন জমা দিতে ব্যর্থ হলে পরবর্তী দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। অর্থাত্ সেক্ষেত্রে বিদ্যমান আইন অনুযায়ী, করদাতাকে প্রযোজ্য করের ওপর মাসে দুই শতাংশ হিসেবে জরিমানা গুনতে হবে। তবে এনবিআরের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন। করোনার কারণে মানুষ এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে পারছে না। আবার অনেকের আয়ও কমে যাওয়ায় রিটার্ন জমা দেওয়ায় আগ্রহ কমে গেছে। সবমিলিয়ে যেহেতু নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রিটার্ন জমা অনেক কম হয়েছে, ফলে এনবিআরের হাতে থাকা বিশেষ ক্ষমতায় জরিমানা বাদে সময় বাড়ানোর যৌক্তিকতা রয়েছে। বিষয়টি এনবিআরের অভ্যন্তরে আলোচনা হলেও নাম প্রকাশ করে দায়িত্বশীলদের কেউই কোনো বক্তব্য দিতে চাইছেন না। তারা ধারণা করছেন, শেষদিন কোনো ঘোষণা আসতে পারে।
তবে সূত্র জানিয়েছে, বিদ্যমান আয়কর অধ্যাদেশে ১৮৪ (জি) নামে একটি ধারা সংযোজন করা হয়েছে, যাতে বিশেষ পরিস্থিতিতে সময় বাড়ানোর বিষয়ে এনবিআরকে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এই ধারার বলেই গত জুনের মধ্যে ব্যক্তি করদাতাদের ফাইল অডিট শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা তিন মাস পর্যন্ত বাড়ানো হয়। ফলে ইতিমধ্যে এ বিষয়ে একটি উদাহরণ তৈরি হয়ে আছে।
করদাতাদের সঙ্গে আলোচনা করে জানা গেছে, করোনার কারণে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়েছে। মহামারির এ পরিস্থিতিতে মানুষ এখন জীবন ও জীবিকা নিয়েই ভাবছে বেশি। ফলে এক মাস সময় বাড়ানো হলে রিটার্ন দাখিল কিছুটা বাড়বে।
অর্থনীতিবিদরাও তাই মনে করছেন। সামষ্টিক অর্থনীতিবিদ ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী ইত্তেফাককে বলেন, করোনা পরিস্থিতি বিবেচনায় সময় এক মাস বাড়ানো যেতে পারে। তবে দেশের স্বার্থে করদাতাদের কর প্রদানে এগিয়ে আসা উচিত। করোনার কারণে মানুষের আয় কমে গেছে, ঠিক। সেক্ষেত্রে কম আয় হলে কম কর হবে। কিন্তু সময়মতো রিটার্ন জমা দেওয়া উচিত।
২০১৬ সালে দেশে ৩০ নভেম্বরকে আয়কর দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ঐ দিনই আয়কর জমা দেওয়ার শেষ দিন। এর আগে ৩০ সেপ্টেম্বর ছিল আয়কর জমা দেওয়ার শেষ দিন। কিন্তু প্রতি বছরই সময় এক বা দুই মাস বাড়ানো হতো, যা এক ধরনের নিয়মে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। ফলে সময় বাড়বে ধরে নিয়েই করদাতাদের বেশির ভাগই ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে রিটার্ন জমা দিতেন না। এই সমস্যা সমাধানে তত্কালীন অর্থমন্ত্রীর আগ্রহে সরকার আবুল মাল আবদুল মুহিত ৩০ নভেম্বরকে আয়কর দিবস হিসেবে ঘোষণা দিয়ে ঐ দিনকে আয়কর জমা দেওয়ার শেষ দিন হিসেবে নির্ধারণ করে দেয়। এর পর সময় বাড়বে না। উপ কর কমিশনারের অনুমতি নিয়ে পরে আয়কর জমা দেওয়া যাবে। তবে এজন্য মাসে দুই শতাংশ হিসেবে জরিমানা গুনতে হবে।
দেশে বর্তমানে টিআইএনধারী (করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর) ৪৫ লাখের ওপরে। এর মধ্যে গত বছর রিটার্ন জমা দিয়েছে প্রায় ২২ লাখ। এবার তিনটি ব্যতিক্রম বাদে সব টিআইএনধারীর রিটার্ন জমা বাধ্যতামূলক করায় রিটার্ন ৩০ লাখ ছাড়িয়ে যাওয়ার আশা করেছিল আয়কর বিভাগ। কিন্তু সময় শেষ হয়ে আসলেও সবমিলিয়ে জমা পড়েছে মাত্র ৭ থেকে ৮ লাখ।
