পরোক্ষভাবে পরাজয় মানছেন ট্রাম্প

আপডেট : ২৯ নভেম্বর ২০২০, ২০:৫৩

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত চার বছরে অনেক বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন। অনেক সিদ্ধান্ত দিয়ে আবার পিছিয়েছেন। আধুনিককালে এমন ‘আনপ্রেডিকটেবল’ প্রেসিডেন্ট যুক্তরাষ্ট্র কমই দেখেছে। নির্বাচনের প্রায় এক মাস আগে তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, হারলে তিনি শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন কি না? তিনি কোনো প্রতিশ্রুতি দিতে অস্বীকার করেছিলেন। কিছুদিন পর একই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছিলেন, অবশ্যই শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর হবে। তবে সত্যি বলতে আমি ক্ষমতা হস্তান্তর করতেই চাই না। আমি জিততে চাই, আবারও থাকতে চাই। এরপর বিভিন্ন সময় আগাম ভোট বিশেষ করে ডাকযোগে ভোটের বিরুদ্ধে কথা বলেন ট্রাম্প। ডাকযোগের ভোটে ব্যাপক জালিয়াতি হবে বলে মন্তব্য করেন।

করোনা মহামারির কারণে এবারের নির্বাচনে রেকর্ড ১০ কোটির বেশি আগাম ভোট পড়েছে। যার বেশির ভাগই ডাকযোগের ভোট। ধারণা করা হচ্ছিল, এই ভোটের বেশির ভাগই পাবেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেন। যে কারণে শঙ্কা তৈরি হয়, শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প হারলে পরাজয় মানবেন কি না তা নিয়ে।

গত ৩ নভেম্বর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর ঐ রাতেই বিজয়ী সম্পর্কে কোনো আভাস পাওয়া যায়নি। এর কারণ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে ভোটগ্রহণ ও গণনার সময় ভিন্ন হওয়ায় ফল পেতে দেরি হয়েছে। চার দিনের মাথায় বেশির ভাগ মার্কিন গণমাধ্যম বাইডেনকে জয়ী বলে পূর্বাভাস দেয়। কিন্তু পরাজয় মানতে অস্বীকার করেন ট্রাম্প। আশঙ্কাকে সত্যি প্রমাণ করে আগাম ভোটে ব্যাপক জালিয়াতির অভিযোগ তোলেন তিনি। নির্বাচনের ফল উলটে দিতে পাঁচটি সুইং স্টেটে তার প্রচারণা টিম ও রিপাবলিকান পার্টি দুই ডজনের বেশি মামলা করে। কিন্তু অভিযোগ সুনির্দিষ্ট না হওয়ায় এবং প্রমাণ করতে না পারায় বেশির ভাগ মামলা খারিজ হয়ে গেছে। বেশির ভাগ সুইং স্টেটে বাইডেনকে জয়ী ঘোষণা করে ফল সত্যায়ন করা হয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্প টিম আইনি লড়াই চালিয়ে গেলেও সময় শেষ হয়ে যাচ্ছে। রাজ্যগুলোকে ৮ ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচনি বিরোধ নিষ্পত্তি করতে হবে। মামলাগুলোর কোনো মেরিট না থাকায় আইনি লড়াইয়ে ট্রাম্পের সফল হওয়ার সম্ভাবনাও কম।

প্রথমদিকে অনেক রিপাবলিকান নেতা ট্রাম্পের সঙ্গে ছিলেন। তার আইনি চ্যালেঞ্জে সমর্থন দিয়েছেন। কিন্তু সময় যত যাচ্ছে, রিপাবলিকান নেতারা ততই দূরে সরে যাচ্ছেন। পরাজয় মেনে নিতে ট্রাম্পের ওপর চাপ বাড়ছে। দলীয় সমর্থন কমায় এবং আদালতে একের পর এক হারে কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন ট্রাম্প। তবু পরাজয় স্বীকার করছেন না। অনেকে বলছেন, ট্রাম্প পরাজয় স্বীকার করছেন না তার ‘ইগো’ এর জন্য।

আদালতে হারের কারণে ভিন্ন পথে ফল উলটে দিতে কাজ শুরু করেন ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট হতে প্রার্থীকে বেশি পপুলার ভোট নয় বরং ২৭০টি ইলেকটোরাল কলেজ ভোট লাগে। জনসংখ্যার ভিত্তিতে ৫০ অঙ্গরাজ্যে মোট ইলেকটোরাল ভোটের সংখ্যা ৫৩৮টি। বাইডেন এরই মধ্যে ৩০৬টি ইলেকটোরাল ভোট নিশ্চিত করেছেন। অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প নিশ্চিত করেছেন ২৩২টি ইলেকটোরাল ভোট। সাধারণত রাজ্যে পপুলার ভোটে জয়ী প্রার্থীকেই ঐ রাজ্যের সব ইলেকটোরাল ভোট দেন। কিন্তু এখানে সাংবিধানিক কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তারই সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করেছেন ট্রাম্প। সম্প্রতি মিশিগানের রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের হোয়াইট হাউজে ডাকেন ট্রাম্প। উদ্দেশ্য ছিল রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের বোঝাবেন তারা যেন বাইডেনের জয়কে অগ্রাহ্য করেন। তারা এমন ইলেকটোরদের মনোনীত করবেন যারা বাইডেনকে নয় বরং তাকে ভোট দেবেন। কিন্তু মিশিগানের আইনপ্রণেতারা জানিয়ে দিয়েছেন ভোটে জালিয়াতির কোনো প্রমাণ তারা পাননি।

চতুর্মুখী চাপে একটু নমনীয় হয়েছেন ট্রাম্প। গত সপ্তাহে তিনি এক টুইট বার্তায় বলেন, দ্য জেনারেল সার্ভিস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (জিএসএ) প্রধান এমিলি মার্ফিকে বলেছি, নিয়ম মেনে ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য যা করার করুন। আমার টিমকেও আমি একই পরামর্শ দিয়েছি। তবে তিনি বলেন, তাকে জোর করে ভোটে হারানো হয়েছে। এ নিয়ে লড়াই চলবে। এরপর গত বৃহস্পতিবার তিনি সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ইলেকটোরাল কলেজ ভোটে বাইডেন আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচিত হলে হোয়াইট হাউজও ছাড়বেন তিনি। কিন্তু একদিন পরই আরেক টুইট বার্তায় তিনি বলেন, এবারের নির্বাচনে বড় জালিয়াতি হয়েছে। প্রেসিডেন্ট হিসেবে বাইডেন তখনই হোয়াইট হাউজে প্রবেশ করতে পারবেন, যখন তিনি প্রমাণ দেবেন ৮ কোটি ভোট জালিয়াতি করে ও অবৈধভাবে তিনি পাননি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ধাপে ধাপে ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়ার পথ পরিষ্কার করছেন। কিন্তু পরাজয় স্বীকার করছেন না। এখানে দেখার বিষয় হলো, ৪৬তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে বাইডেনের দায়িত্ব গ্রহণের জন্য ট্রাম্পের পরাজয় মেনে নেওয়াটা জরুরি নয়।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সম্ভবত আগামী কয়েক মাস, এমনকি কয়েক বছর ট্রাম্প ও তার অনুসারীরা ভোট জালিয়াতির মিথ্যা অভিযোগ উত্থাপন করে যাবে। এর মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন কমিউনিটির মধ্যে উত্তেজনা ছড়াবে। একই সঙ্গে বাইডেন প্রশাসনকে চাপে রাখবে, যাতে তারা প্রগতিশীল নীতি অনুসরণ করতে না পারে। আর এর মাধ্যমে ২০২৪ সালের নির্বাচনে আবারও প্রার্থী হওয়ার পথ খোলা রাখার চেষ্টা চালাবেন ট্রাম্প। যে কারণে সরাসরি পরাজয় না মেনে পরোক্ষভাবে ফল মানবেন তিনি।