ফ য় জু ল আ ল আ মী ন
বহুমাত্রিক আলী যাকের ছিলেন কর্পোরেট জগতের বস, সংগঠক, নাট্যব্যক্তিত্ব ও কলামিস্ট। তবে সবকিছু ছাপিয়ে তিনি ছিলেন একজন সফল মানুষ। যখন যে কাজে হাত দিতেন পূর্ণ মনযোগ দেওয়াই ছিল যার নেশা। দেশীয় বিজ্ঞাপনশিল্পের একজন পুরোধা ব্যক্তিত্ব যাকের টেলিভিশন ও মঞ্চ নাটকে সমান জনপ্রিয়। তিনি বাংলাদেশের বিজ্ঞাপনী সংস্থা এশিয়াটিক থ্রিসিক্সটি’র কর্ণধার ছিলেন। তার সহধর্মিনী সারা যাকেরও একজন অভিনেত্রী। ২৭ নভেম্বর ভোর ৬টা ৪০ মিনিটে হেরে গেলেন করোনা ভাইরাসের কাছে, চলে গেলেন না ফেরার দেশে। তবে এই চলে যাওয়া বা প্রস্থানের আগে তিনি রেখে গেছেন অসংখ্য কর্ম ও সৃষ্টি।
ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে গত কয়েক বছর জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন। মাঝখানে সুস্থ হয়ে ওঠেছেন। এরপর আবার যুক্ত হয়েছেন মঞ্চনাটকের সঙ্গে। ব্যবসায়ী হিসেবে সফল, এই সত্তরোর্ধ্ব বয়সে আবার কেন মঞ্চে আসা?—এমন প্রশ্নের উত্তরে আলী যাকের বলেছিলেন, ‘ব্যবসা তো পেটের খিদে মেটায়, বুকের খিদে মেটাতে হবে না?’ সেই খিদে মেটানোর চেষ্টায় তিনি সব সময় মানুষের সংস্পর্শে থাকতে চেয়েছেন কখনো অভিনয়, কখনো অফিসের বস, কখনো পরিবারের অভিভাবক হিসেবে।
আলী যাকের ১৯৪৪ সালের ৬ নভেম্বর তত্কালীন চট্টগ্রাম জেলার ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহকুমার (বর্তমানে জেলা) রতনপুর ইউনিয়নে জন্মগ্রহণ করেন (সূত্র:উইকিপিডিয়া)। বাবা মোহাম্মদ তাহের ছিলেন চট্টগ্রামের সদর স্ট্রিটে এসডিও (তত্কালীন মহকুমা প্রশাসক)। মাহমুদ তাহের ও রেজিয়া তাহেরের চার সন্তানের মধ্যে যাকের ছিলেন তৃতীয়। বাবা বেঙ্গল সিভিল সার্ভিসের চাকরির সুবাদে এক শহর থেকে আরেক শহরে ঘুরছিল তাদের পরিবার। যাকের যখন কিছুটা বুঝতে পারেন তখন তাদের বাসা ছিল ফেনীতে। ফেনীর পর তাদের পরিবার স্থায়ী হয়েছিল খুলনায়। তিনি বলতেন, ‘খুলনায় গিয়েই প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা মজবুত হয়েছিল আমার।’ খুলনা ছেড়ে একসময় যেতে হয়েছিল কুষ্টিয়ায়। তারপরের গন্তব্য ঢাকা। ঢাকায় প্রথমে অভয় দাস লেনে, তারপর গেন্ডারিয়ায়। গেন্ডারিয়ায় একটি বাড়ি কেনা হয় সাড়ে ষোলো হাজার টাকায়। বাবার প্রভিডেন্ট ফান্ডে হাত পড়েছিল বাড়ি কেনার সময়। ১৯৫৫ সালে বাবা সরকারি চাকরি ছেড়ে পরামর্শক হিসেবে কাজ শুরু করেন বাওয়ানি জুট মিলস ও বাওয়ানি টেক্সটাইলসে। ১৯৬১ সালে তিনি হার্ট অ্যাটাকে মারা যান।
আলী যাকের ১৯৬০ সালে সেন্ট গ্রেগরিজ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। পরবর্তী সময়ে ঢাকার নটর ডেম কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। এ সময় তিনি ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত হন। তখন পর্যন্ত নাটকের ‘ন’-ও জানেন না তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মিলে একটা সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা করেছিল। সেখানে যে ক’টি বিভাগে অংশ নিয়েছিলেন আলী যাকের, তার সব ক’টিতেই তিনি প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন। আর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় মাকে চিকিত্সার জন্য কলকাতা নিয়ে গেলে সেখানে শম্ভু মিত্র আর উত্পল দত্তের বেশ ক’টি নাটক দেখেছিলেন তিনি। পরবর্তী জীবনে এই নাটক দেখার অভিজ্ঞতাই কাজে লেগেছিল তার।
মা চলে যান ১৯৬৪ সালে, দিদি ১৯৬৫ সালে। অনার্স শেষ হওয়ার পর যাকের গেলেন করাচি। তারপর ১৯৬৯ সালে দেশে ফিরে এশিয়াটিকে চাকরি শুরু করেন। সারা দেশ তখন উত্তাল। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে গেলেন। প্রশিক্ষণ নিলেন। কলকাতায় দেখা হলো চলচ্চিত্র পরিচালক ও সাংবাদিক আলমগীর কবিরের সঙ্গে। তিনি বললেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে ময়দানের যুদ্ধের মতোই জরুরি হলো প্রচারযুদ্ধ। বিশ্ববাসীকে বোঝাতে হবে আমরা ন্যায়যুদ্ধ করছি। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র একটা ইংরেজি সার্ভিস শুরু করছে, লেগে যাও।’ সেখানেই ছিলেন যাকের, প্রচারণা চালিয়েছেন; হয়েছেন শব্দসংগ্রামী।
১৯৭২ সালে আলী যাকের আরণ্যক নাট্যদলের হয়ে মামুনুর রশীদের নির্দেশনায় মুনীর চৌধুরীর ‘কবর’ নাটকটিতে প্রথম অভিনয় করেন; যার প্রথম প্রদর্শনী হয়েছিল ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউশনে। ১৯৭২ সালের জুন মাসের দিকে আতাউর রহমান ও জিয়া হায়দারের আহ্বানে নাগরিক নাট্যসম্প্রদায়ে যোগ দেন। তখন থেকে নাগরিকই তার ঠিকানা। ‘বাকি ইতিহাস’, ‘সত্ মানুষের খোঁজে’, ‘দেওয়ান গাজীর কিস্্সা’, ‘কোপেনিকের ক্যাপটেন’, ‘গ্যালিলিও’, ‘ম্যাকবেথ’সহ অনেক আলোচিত মঞ্চ নাটকের অভিনেতা ও নির্দেশক তিনি। ১৯৭৩ সালে নাগরিক নাট্যসম্প্রদায়ে তিনি প্রথম নির্দেশনা দেন বাদল সরকারের ‘বাকি ইতিহাস’ নাটকে, যা ছিল বাংলাদেশে প্রথম দর্শনীর বিনিময়ে নাট্য প্রদর্শনীর যাত্রা। ‘গ্যালিলিও’ নামে অনুবাদ নাটকে নামচরিত্র ‘গ্যালিলিও’ হিসেবে অভিনয়ের জন্য আলী যাকেরকে ‘বাংলার গ্যালিলিও’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। মঞ্চে যখন আলী যাকের বিদ্রোহী নূরলদীন, রোমহর্ষে জেগে ওঠতেন দর্শক। এরকম নানা চরিত্রে অভিনেতা আলী যাকের প্রতিবার ছিলেন নতুন। যারা মঞ্চে যাকেরের অভিনয় দেখেছেন, তারা নিঃসন্দেহে স্বীকার করবেন—নূরলদিন, দেয়ান গাজী আর গ্যালিলিও চরিত্রে তার অসাধারণ অভিনয়ের কথা। এই তিনটি চরিত্রই আলী যাকেরের প্রিয় চরিত্র। মঞ্চের পাশাপাশি টেলিভিশন নাটকে অভিনয় করেও তিনি পেয়েছেন জনপ্রিয়তা। ‘আজ রবিবার’, ‘বহুব্রীহি’, ‘তথাপি’, ‘পাথর’, ‘দেয়াল’সহ বহু নাটকে অভিনয় করে জনপ্রিয়তা পেয়েছেন যাকের। বেতারে ৫০টির বেশি নাটক করেছেন তিনি। অভিনয় করেছেন বেশ কিছু চলচ্চিত্রে। আলী যাকের ২০১০ সালের ডিসেম্বরে বাংলাভিশনের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক অনুষ্ঠান ‘ভালোবাসার বাংলাদেশ’ উপস্থাপনা করেন; টেলিভিশনের জন্য মৌলিক নাটক লিখেছেন। নানা বিষয়ে দৈনিক পত্রিকায় নিয়মিত লেখালেখিও করেছেন। প্রকাশিত বই—‘সেই অরুণোদয় থেকে’, ‘নির্মল জ্যোতির জয়’। শখ করে ফটোগ্রাফিও করেন তিনি।
আলী যাকের দায়িত্ব পালন করেছেন নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের সভাপতি হিসেবে। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের অন্যতম ট্রাস্টি ছিলেন। যুক্তরাজ্যের রয়্যাল ফটোগ্রাফিক সোসাইটির ছিলেন পূর্ণ সদস্য। শিল্পকলায় অবদানের জন্য ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান একুশে পদকে ভূষিত করে। এছাড়াও তিনি পেয়েছেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কার, বঙ্গবন্ধু পুরস্কার, মুনীর চৌধুরী পদক, নরেন বিশ্বাস পদকসহ অনেক পুরস্কার ও সম্মাননা। মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার ২০১৮-তে আজীবন সম্মাননা লাভ করেছেন আলী যাকের।
নাগরিক নাট্যসম্প্রদায়ের জন্য বিশ্বখ্যাত বিদেশী নাটকের বাংলা রূপান্তর আর নাটক নির্দেশনা—এসব কাজে প্রায় সবসময়ই আলী যাকের ব্যস্ত থাকতেন। আলী যাকের-সারা যাকের দম্পতির দুই সন্তান—পুত্র অভিনেতা ইরেশ যাকের ও কন্যা শ্রিয়া সর্বজয়া।
