সকালবেলায় যিশু যখন চোখ খুলল, শুঁড়িখানা একেবারে শূন্য। সূর্য বেশ কিছুক্ষণ আগে উঠেছে, দেয়ালের ওপরের অংশে আলো পড়েছে।
নোংরা পাত্র মাছির ঝাঁক কাছে টানছে, মাটির বহু ভাঁড় এদিক ওদিক ছড়িয়ে আছে।
যিশু উঠতে চেষ্টা করল, কিন্তু শরীরের জোড়ায় জোড়ায় ব্যথা অনুভব করল। গতরাতের মাদকতার ঘোর থেকেই এ অবস্থা হয়েছে। ভরপেট মদ পান করার পর এমন গভীর ঘুম আসে যে পৃথিবীকে পাত্তা দেবার কথাও মনে আসে না। নিজের সাথে লড়াই করে সে উঠে বসল। গতরাতে যে কুকুরটাকে পুরি খাইয়েছিল, এতক্ষণ ধরে তাদের দুজনের মাঝখানে ঘুমিয়ে।
যিশু কুকুরটাকে লাথি মেরে চেঁচিয়ে বলল, ভাগ এখান থেকে। আধেক খোলা চোখে কুকুরটা তার দিকে তাকায়, যখন দেখতে পেলো আরো একটি লাথি এগিয়ে আসছে, তখন আলস্যভরে লেজ দোলাতে শুরু করল। গতরাতের ভোজ কুকুরটাকে তাদের অনুগত করে তুলেছে।
সে মাধোর কাঁধ ধরে টান দেয়, ‘মাধো উঠে পড়, সকাল হয়ে গেছে।’
মাধো গা মুচড়ে গিঁটলাগা কাঁধ টানটান করে বলল, ‘হোক সকাল।’
কিন্তু যিশু আবার ঘাড়ে শক্ত হাত চেপে বলল, ‘সকাল হয়ে গেছে।’
‘তাতে নতুন কী হয়েছে? আমাকে ঘুমোতে দে।’
‘তাড়াতাড়ি উঠ। গ্রামের লোক আমাদের এখানে দেখলে জুতোপেটা করবে। আমরা কেনো বাজারে এসেছি—এটা কি তোর মনে নেই?’
মাধো এমনভাবে গা ঝাড়া দিয়ে উঠে বসে যেন বিদ্যুতের তারে তার স্পর্শ লেগেছে। হাতদুটো পেছনে ধরে রেখে তাতে মাথা ঠেকায়, কিছুক্ষণ এ অবস্থায় থেকে ঘোর কাটায় এবং শেষ পর্যন্ত দাঁড়িয়ে যায়, বলে, ‘এখন কী হবে?’
‘বুধিয়ার ব্যাপারে চিন্তা না করার জন্য আমি তোকে গতকালই বলেছি, সে ভালো কাফন পাবে, কিন্তু এই গ্রামের মানুষগুলো...’
ময়লা কুড়ানো সুইপার তাদের কাছাকাছি এসে পড়েছে। ঝাট দেওয়া ধুলো যখন ওপরের দিকে উঠছে, তারা উঠে দাঁড়ায়। মদের দোকান থেকে বেরিয়ে এসে কুকুরটা তাদের পেছন পেছন আসে।
সূর্য আরো একগজ ওপরে উঠেছে, তবে এর ভালো দিকটা হচ্ছে এখনো রোদ তেমন কড়া নয়। বাজার তখন বন্ধই, কেবল দু-তিনটি দোকান খুলেছে। দুজনেই দুশ্চিন্তার আঁধারে ডুবে আস্তে আস্তে এগোচ্ছে। তারা কেমন করে ফিরে যাবে? গ্রামের মানুষেরা অবশ্যই তাদের জন্য অপেক্ষা করছে। গত সন্ধ্যায় তারা গ্রাম থেকে এসেছে আর ফিরে যাচ্ছে আজ সকালে, তাও আবার খালি হাতে। বুধিয়া মারা গেছে—তাও দু’রাত একদিন পেরিয়ে গেছে। এতক্ষণে শরীরে নিশ্চয়ই পচন ধরেছে।
মাধোর বিষণ্ন চেহারা দেখে যিশু তাকে সান্ত্বনা দিতে চেষ্টা করে, ‘মন খারাপ করে কি কোনো লাভ আছে? যা-ই করো মরামানুষ তো আর ফিরে আসে না।’
কিন্তু মাধোর কল্পনা অন্য কোনোখানে—বুধিয়া তাকে যে আনন্দ দিয়েছে সে সম্পর্কে যিশুর কোনো ধারণাই নেই। ঠিকমতো খাবার পায়নি তবুও কঠোর পরিশ্রম করে গেছে, তবুও কী সুন্দর গোল এবং মাংসল তার শরীর। কামড় দাও, ধাক্কা দাও, আঁচড় কাটো। কোনোটাতেই তার প্রতিবাদ নেই, দেহ ও আত্মায় এতটাই নিবেদিত ছিল মেয়েটি। কিন্তু এখন তো সব শেষ হয়ে গেছে।
বুধিয়ার মৃত্যুতে তাদের নাম সমাজের কাছে কলঙ্কিত হয়ে গেছে। তারা অপদার্থ হিসেবে পরিচিত হচ্ছে। গ্রামের কেউ কেউ অবশ্য এটাকে খুনই বলছে। কেউ এখন এমন ছেলের কাছে তাদের মেয়ে বিয়ে দেবে না, এটা মাধোর মনে হলো এবং নিজেকেই অভিশাপ দিলো—ব্যাটা তুই আহাম্মক, কখনো মেয়েটাকে যত্ন করার কথা ভাবিসনি। মাধো কান্নায় ভেঙে পড়ে। তাকে কাঁদতে দেখে যিশুও কান্না জুড়ে দেয়, কিন্তু কুকুরও যখন তাদের সাথে কান্নায় যোগ দেয়, দুজনেই থামতে বাধ্য হয়।
‘ভাগ এখান থেকে।’ যিশু চেঁচায়, মাটির দলা তুলে কুকুরের ওপর ছুড়ে মারে। ‘জারজটা আমাদের পেছনে লেগে আছে।’
কুকুরও নিশ্চুপ হয়ে গেল, কিন্তু তার মুখ আকাশের দিকে উঁচু করে রাখা।
মাধো একটা বড় দলা খুঁজতে খুঁজতে বিড়বিড় করে বলল, ‘এই বদমায়েশটা আবার চেঁচাতে শুরু করবে।’
যিশু বলল, ‘ডাকতে দে। রোদ কড়া হয়ে উঠছে, এখনো এক মাইল হাঁটতে হবে। এটা তো একটা জন্তু ছাড়া কিছু নয়, গতরাতের একটু খাবার আর তাতেই আমাদের ক্রীতদাস হয়ে গেছে।’
হাঁটতে হাঁটতে মাধো কাঁদতে থাকে—কীরে বাবা, এক খাবারেই জন্তুটা দাস হয়ে গেল কিন্তু আমরা...
কিন্তু কুকুরটার কারণে যিশু মাধোর সাথে কাজে যোগ দিতে দ্বিধান্বিত ছিল। সে মুখ ফেরায়, দেখে কুকুরটা তাদের দিকে তাকিয়ে চলে যাচ্ছে। এখন যেহেতু যিশু নিজেও কাঁদছে না এবং নিরুত্সাহিত মাধো নিজে থেকেই কান্না থামিয়ে দেয়।
যিশু মাধোর দিকে ফিরে বলল, ‘ভেবে দেখ, গ্রামের লোকজনকে কী বলব।’ তাদের আচরণে পরিবর্তন দেখে কুকুর সটকে পড়েছে।
‘আমরা বলব আমাদের পকেট মার হয়েছিল।’
যিশু দীর্ঘশ্বাস ফেলল, ‘কিন্তু পকেট কোথায়? গতবার মালিক যখন আমাদের এই কুর্তা দেন তখনই তো তা পুরনো, এই শীত পর্যন্ত টিকবে না।
মাধো চোখ ঘুরিয়ে নিজেকে এবং যিশুকে দেখে নিল। তাদের পরনে কেবল ধুতি, কাদামাটি লেগে নোংরা হয়ে তাদের গায়ের রঙের সাথে মিশে গেছে।
‘আমরা বলব কাপড়ের গিট থেকে টাকা কোথাও পড়ে গেছে, আমরা সারারাত ধরে অনেক খুঁজেছি।’
নির্বিকারভাবে যিশু বলল, ‘আমরা যা ইচ্ছে তা-ই বলতে পারি, কিন্তু কেউ আমাদের বিশ্বাস করবে না। দু-চারটা লাথি খেলে তেমন কিছু আসবে যাবে না, আমরা এখন এসবে অভ্যস্ত হয়ে গেছি।’
রাতের খাবার ততক্ষণে হজম হয়ে গেছে, ক্ষুধার যন্ত্রণা তীব্র হতে শুরু করেছে। কিন্তু এখন চারদিকে রয়ে গেছে কেবল অন্ধকার।
বুধিয়া এখন বাড়িতে নেই, নেই অন্য কেউ। গ্রামবাসী তেমন সদয় হবে—এটাও তারা আশা করতে পারে না। মাঠ শূন্য। মাঠের আলু তোলা হয়ে গেছে। চটের ব্যাগে সেই আলু নিরাপদেই আছে। গ্রামে পৌঁছার খানিকটা আগে যিশুর চোখে পড়ে একটা শুকনো গাছ। নিজের মাথায় চাটি মেরে বলল, ‘আমরা কী আহাম্মক। কাফনের জন্য সারাক্ষণ কাঁদছি, কিন্তু আসলে যা দরকার তা হচ্ছে আগুন। আমরা তো লাশটার গতি করার ব্যাপারটা মোটেও ভাবছি না। আমাদের কি খড়ির প্রয়োজন নেই?’
মাধো সপ্রশংস দৃষ্টিতে তার বাবার দিকে তাকায়—বড়দের মগজ অবশ্যই ভালো, ‘কাফন না হোক, আমরা তো খড়ি নিয়ে গ্রামে ফিরতে পারি। একেবারে কোনোকিছু না নেওয়ার চেয়ে কিছু একটা নিয়ে যাওয়া বরং ভালো।’ যিশু এই উপসংহারে পৌঁছাল।
যেহেতু তাদের হাতে কুড়াল নেই, খড়ি জোগাড় করতে অনেক বেশি সময় লাগল, অনেক বেশি পরিশ্রম হলো। তারা দুজনেই দু’ আটি করে খড়ি জোগাড় করতে সমর্থ হলো। যখন তারা গ্রামের সীমানায় পৌঁছায়, একটি ভাবনা তাদের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। গ্রামের লোকজন যদি বুধিয়ার লাশটার দেখভাল না করে থাকে, লাশটা সেখানেই পড়ে থাকার কথা। লাথি ও ঘুষি নিয়ে তারা তেমন উদ্বিগ্ন নয়, বিনিময়ে যদি বুধিয়ার একটি সুন্দর শেষকৃত্য হয়, সেটাই হবে উত্তম। এতে বরং তাদেরই লাভ হবে।
তারা যখন গ্রামে ঢুকল, দেখল, তাদের বাড়ির দরজার সামনে অনেক মানুষের ভিড়, তাতে তাদের অস্বস্তি বেড়ে গেল। এটা তাদের কাছে স্পষ্ট হলো—বুধিয়ার লাশ এখানো ওখানেই পড়ে আছে, গলতে শুরু করেছে। এখন তারা কেমন করে এই মানুষগুলোর মোকাবেলা করবে?
ধরা যাক, প্রত্যেকে তাদের একটা করে লাথি মারার সিদ্ধান্ত নিল, তাহলে? এটা যেমনই হোক, ক্ষুধা চরমে উঠেছে।
পরাস্ত স্বরে যিশু বলল, ‘আমি যাচ্ছি না। আমি বুড়ো মানুষ, আরো একটা লাশের জন্য কাফন জোগাড়ের বোঝা আমি তোর ওপর চাপাতে চাচ্ছি না।’
আতঙ্কিত কণ্ঠে মাধো বলল, ‘আমি একা যাব না; কিন্তু এতগুলো মানুষ আমাদের দরজার সামনে জড়ো হয়েছে কেন?’
যিশু জোরাজুরি করল যেন মাধোই যায়। কারণ মৃত মেয়েমানুষটি তো তারই স্ত্রী, আর যা ঘটার তো ঘটেই গেছে। অন্তত এখন মুদ্দারের সাথে তার বিশ্বাসঘাতকতা করা ঠিক হবে না।
কিন্তু মাধো বলল, সে তো তার সকল আনন্দ ও দুঃখ সমান ভাগ করে নিয়েছে, কাজেই গেলে দুজনই যাবে, নতুবা মোটেও কেউ যাবে না।
এর মধ্যে কেউ একজন তাদের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করল এবং সব মাথা তাদের দিকে ঘুরল। তারা পরস্পরকে বলল, ‘দৌড়াও।’
কিন্তু তারা অনুভব করল তাদের পা মাটির সাথে আটকে গেছে। তারা উল্টোদিকে ফিরল, কিন্তু দৌড়াতে পারল না।
দু-তিন জন মানুষ এখন তাদের দিকে দৌড়ে আসছে।
যিশু বিলাপ শুরু করল, ‘এখন আমাদের মেরে ফেলবে’।
মাধোও ঠিক একই কাজ করল।
মানুষ যখন তাদের কাছাকাছি চলে এল, তারা দেখতে পেলো, তাদের চোখের সামনে হলুদ ও নীল বৃত্ত নাচতে শুরু করেছে। তারপর অন্ধকারের একটি ঢেউ চারদিক প্লাবিত করল। তাদের তখন আর জ্ঞান নেই।
আর একবার যখন তাদের চোখ খুলল, তাদের কানে ঢুকল কে যেন বলছে, ‘দেখুন স্যার ওদের দিকে, এটা বুধিয়ার স্বামী আর অন্যটা শ্বশুর। তারা এতই গরিব যে অসুস্থ বুধিয়ার জন্য ওষুধও কিনতে পারেনি। এমনকি কাফন কেনার পয়সাও তাদের নেই। দেখুন স্যার, দাহ করার জন্য যে কাঠখড়ি সেটাও তারা নিজেরা জোগাড় করে এনেছে।’
একটি গভীর কণ্ঠ তখন শোনা গেল, ‘মুখিয়াবাবু, আপনি ঠিকই বলেছেন। কেবল আইন তৈরি করে আমরা ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে পারি না, সমাজ পরিবর্তন করতে পারি না। স্বাধীনতার পর ৪৭ বছর পেরিয়ে গেছে তবুও পিছিয়ে পড়া মানুষের পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। আজকের ঘটনাটি আমার মনে গভীর যন্ত্রণা সৃষ্টি করেছে। বিনা ঔষধে আমাদের একটি বোনের মৃত্যু হয়েছে, উদরপুর্তি করার মতো খাবারও তার বাড়িতে ছিল না। শরীরে কোনো কাপড়ও না। আমি কসম করে বলছি, যদি এবারের নির্বাচনে ভোট দিয়ে আমাদের জিতিয়ে দেন তাহলে সামাজিক ন্যায়বিচার আমি বইয়ের পাতা থেকে তুলে এনে বাস্তবে তা দেখিয়ে দেবো। আমি আমার দলের পক্ষ থেকে এই মানুষগুলোর জন্য আমি দশ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করছি।’
তখন আরো জোর হাততালি পড়ল। মাধো, যিশু ও তাদের ছোট্ট কুটিরের ছবি তুলতে ফটোগ্রাফাররা ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
[উর্দু কথাসাহিত্যিক শাফিক আহমেদ শাফাক। তিনি বিহারের শ্রীশঙ্কব কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন। তিনি একজন খ্যাতিমান অনুবাদকও। তাঁর উপন্যাস তিনটি, গল্পগ্রন্থ একটি। গল্পটি অ্যাম্বারিয়েন আলকদরের ইংরেজি অনুবাদ থেকে বাংলায় ভাষান্তরিত।]
