মোরেলার জন্য আমার মনে ছিল এক আশ্চর্য অনুভব। অনেক বছর আগে দুর্ঘটনাচক্রে আমাদের প্রথম দেখা। ওই প্রথম মুহূর্ত থেকে আত্মার ভেতর নিরন্তর পুড়তে শুরু করলাম আমি। এ ধরনের ঘটনার সাথে কোনো পূর্বপরিচয় ছিল না আমার। অবিরাম কষ্ট আর যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যেতে যেতে একপর্যায়ে আমার প্রত্যয় হলো, এ ধরনের অনুভূতির অর্থ উপলব্ধি কিংবা তার তীব্রতার মাত্রাকে নিয়ন্ত্রণ করা আমার কম্ম নয়। তবুও দেখা হলো আমাদের। ঈশ্বরের বেদিমূলে দুজনাকে গ্রন্থিবদ্ধ করার পবিত্র দায়িত্বটুকুও পালন করে গেল নিয়তি। তার সাথে কাম কিংবা প্রেম নিয়ে কোনো কথা বলিনি কখনো। যদিও আমাকে সুখী করার প্রতিজ্ঞায় নিজের চেনা গণ্ডি থেকে নিজেকে বিযুক্ত করে ফেলল সে। সর্বস্ব নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল আমাকে সুখী করার সংগ্রামে। এ ছিল এমন এক সুখ যার দিকে তাকালে বিস্ময়ে ভরে ওঠে মন, যার সাথে আমাদের সাক্ষাত্ ঘটে কেবল স্বপ্নে।
মোরেলার ছিল গভীর পাণ্ডিত্য। প্রচলিত মাপকাঠিতে তার প্রতিভা নিরূপণ করা দুঃসাধ্য। তার ইচ্ছাশক্তি ছিল ভয়াবহ ধরনের। দ্রুতই এটা উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছিলাম। এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমি তার শিষ্য বনে গেলাম। আমার সামনে সে হাজির করল আধ্যাত্মিক জগতের কিসসা বিষয়ক গণ্ডা গণ্ডা পুস্তক। আমাদের কাছে এসব রচনা ছিল প্রাথমিক যুগের সস্তামার্কা জার্মান সাহিত্যকর্মের নমুনা। আমার বোধগম্য হতো না কীভাবে এগুলো তার এমন প্রিয় হতে পারে। কীভাবে এসবের ভেতর ডুবে থাকত সে দিনরাত। এবং—সময়ের সাথে সাথে তারা যেভাবে আমার নিজস্ব সত্তার অংশ হয়ে উঠতে পারল, তার মূল কৃতিত্ব দিতে চাইলে দিতে হবে আমাদের অভ্যাস আর উদাহরণের সরল অথচ কার্যকর ক্ষমতাকে।
এসব ঘটনায়, যদি ভুল না বলে থাকি, আমার যুক্তিবোধের খুব বেশি করণীয় ছিল না। আমার বিশ্বাস নির্মাণে, যদি ভুলে না গিয়ে থাকি, আমার আদর্শের কোনো অবদান ছিল না। ওইসব আধ্যাত্মিক রচনা, আমি যা পড়েছিলাম, তাকে আবিষ্কার করলাম আমার কর্ম আর চিন্তার ভেতর। নতুন প্রেরণাতাড়িত আমি, অবশেষে নিজের অজান্তেই সমর্পিত হলাম আমার স্ত্রীর হাতে। অকম্প হূদয়ে ঢুকে পড়লাম তার পড়ার পৃথিবীতে। এবং তখনই—নিষিদ্ধ পাতাগুলোর ওপর ঝুঁকে থাকতে থাকতে অনুভব করলাম, একটা নিষিদ্ধ আগুন ধীরে ধীরে জ্বলে উঠতে শুরু করেছে আমার ভেতর। নিজের খোলা হাতটা আমার হাতের ওপর রাখত মোরেলা। এক মৃত দর্শনের ছাই উড়িয়ে দিয়ে খুঁজে আনত কতকগুলো নরম, অদ্ভুত ধ্বনি, যার আশ্চর্য অনুবাদ বৃথাই আত্মাহুতি দিত আমার স্মৃতির ভেতর।
সান্তা মারিয়া! তোমার দৃষ্টি ফেরাও—
পাপীর উপাচারের দিকে,
তার আকুল প্রার্থনা আর নিষ্পাপ প্রেমের দিকে
তোমার ওই সিংহাসন থেকে।
প্রত্যুষ—দুপুর আর ধূসর প্রদোষকালে
হে মারিয়া! তুমি শুনেছো আমার গান!
দুঃখ আর সুখে—পূণ্য আর পাপে—
আমার সঙ্গে থেকো, হে ঈশ্বরজননী!
যখন পালিয়েছিল আলোকিত দিন
আকাশে ছিল না টুকরো মেঘ—
আমার আত্মা, পাছে পালিয়ে না যায়,
আমাকে ডেকে নিয়েছিল তোমার আশীর্বাদ;
আর আজ, এই মুহূর্তে, যখন দুর্ভাগ্যের কালো ঝড়
গাঢ় অন্ধকারে ঢেকে দিচ্ছে আমার বর্তমান এবং
আমার অতীত, অতএব
উদ্ভাসিত হোক আমার আগামী দিন,
তোমাতে ফিরে যাবার মধুর স্বপন!
উল্লেখ নিষ্প্রয়োজন, মোরেলার সঙ্গে আমার যত কথা হতো তার প্রধান বিষয়বস্তু ছিল ওইসব বইয়ের মধ্যে থাকা যত দুর্বোধ্য গল্প। যারা শিক্ষিত, তাদের কাছে এর নাম ধর্মীয় নৈতিকতা, তারা সহজেই বুঝবেন এসব। আর যারা অশিক্ষিত, যতই চেষ্টা করেন, তারা শেষ অবধি রয়ে যাবেন বৃত্তের বাইরে—ফিকটের ‘বর্বর নাস্তিকতা’; কিংবা সংস্কারকৃত ‘প্যালিজেনেসিয়া অব পিথাগোরাস’; সর্বোপরি শিলিংয়ের টীকাসমৃদ্ধ আইডেন্টিটির বাণী। কথা হতো এগুলো নিয়েই। কল্পনা করতে ভালোবাসত মোরেলা। এই ছিল তার কাছে সর্বোচ্চ সুন্দর। আইডেন্টিটি বা আমাদের আত্মপরিচিতি, মি. লক যাকে যথার্থই মনে করেন আমাদের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবোধ, আমার মনে হয় তা ব্যাখ্যা করে দেয় প্রকৃত যুক্তিবাদী একটি প্রাণীর সুস্থ চিন্তাধারা। এবং যেহেতু চেতনা বলে এক বস্তু বর্তমান যা চিরকাল সঙ্গ দিয়ে যায় চিন্তাকে। এই হচ্ছে সেই উপাদান যা গঠন করে আমাদের। দান করে আমাদের প্রকৃতি-প্রকার। যাকে দেখে আমরা বলতে পারি, হ্যাঁ, এই হচ্ছি গিয়ে আমি। আর এভাবেই অন্য চিন্তাশীল প্রাণী থেকে আলাদা করি নিজেকে। প্রদান করি নিজেদের পরিচিতি। কিন্তু, ওই যে, পরিচয়ের ধারণা, ‘মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে যা শেষ হয়ে যায় কিংবা যায় না’, আমার কাছে তা, বরাবরই, এক গভীর আগ্রহের বিষয়বস্তু। বিষয়ের জটিল এবং প্রহেলিকাময় গতিপ্রকৃতি অবশ্য তার আদ্য কারণ নয়। বরং যে তীব্র উত্তেজনা আর অনন্য বৈশিষ্ট্য আরোপ করে মোরেলা তাদের উল্লেখ করত, সেটাই ছিল আমার আগ্রহের সূত্র।
কিন্তু ততদিনে সময় হয়েছে—বউয়ের কায়কারবার আমার কাছে বিবেচনা হতে লাগল এক সর্বগ্রাসী মায়াজাল। তখন আর আমার সহ্য হতো না তার শীর্ণ আঙুলের স্পর্শ। কিংবা তার সুরেলা কণ্ঠের মৃদুধ্বনি, কিংবা তার বিষণ্ন চোখদুটোর কোটরে জ্বলতে থাকা আলো। এর সবই সে বুঝত, কিন্তু এ নিয়ে কখনোই ঘ্যানঘ্যান করেনি আমার সাথে। আমার দুর্বলতা কিংবা দোষ সম্পর্কে সম্যক অবহিত মনে হতো তাকে। মলিন হাসি হেসে একে সে মেনে নিত নিয়তি হিসেবে। দিনের পর দিন আমার অনুভূতিশূন্য হয়ে ওঠার ঘটনাটিও তার নজর এড়াতে পারেনি। এবং এর অন্তর্নিহিত কার্যকারণও জানা ছিল তার। যদিও আমার নিজেরই তা জানা ছিল না তখনো। যদিও এসব নিয়ে আকারে-প্রকারেও আমাকে কিছু বলতে চেষ্টা করেনি সে। এদিকে ক্রমাগত স্বাস্থ্যহানি ঘটেই চলল তার। যেমন হয়ে থাকে, একসময় তার গালে স্থায়ী জায়গা করে নিল বাদামি দাগগুলো। কপালের ওপর প্রকট হয়ে উঠল নীল শিরা। ওর দিকে তাকিয়ে এক মুহূর্তে আমার হূদয় গলে যেত করুণায়, পরমুহূর্তে আমার চোখে পড়ত তার ঘৃণাভরা দৃষ্টির ঝলক। মুহূর্তে সীমাহীন গ্লানিতে ডুবে যেত আমার আত্মা। আমাকে দখল করত এমন এক অসহায়বোধ যেন আমি দাঁড়িয়ে আছি গহিন কোনো খাদের কিনারে, তাকিয়ে আছি তার অতল গহ্বরে।
তাহলে কি আমি বলব যে, ব্যাকুল আর তীব্র এক ইচ্ছা নিয়ে আমি আসলে অপেক্ষা করছিলাম মোরেলার মৃত্যুর? এবং আমি ঠিক সেটাই করছিলাম। কিন্তু ওই দুর্বল আত্মা এরপরও অনেকগুলো দিন, অনেকগুলো সপ্তাহ আর তিরিক্ষি ধরে যাওয়া অনেকগুলো মাস অচিন পাখি হয়ে হয়ে আটকে থাকল তার মাটির খাঁচায়। না পেরে আমার নিপীড়িত স্নায়ুকুল একপর্যায়ে বিদ্রোহ করে ক্ষমতা কেড়ে নিল মনের হাত থেকে। মোরেলার মরতে এই বিলম্বে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলাম আমি। দুরাচারী পাপাত্মার মতো অভিশাপ দিতে লাগলাম পার হয়ে যাওয়া প্রতিটি দিন, প্রতিটি ঘণ্টা, প্রতিটি মুহূর্তকে। মনে হচ্ছিল দিনের শেষ ছায়ায় মিলিয়ে যাবার লগ্ন যতই এগিয়ে আসছে ততই সময় যেন ইচ্ছে করেই ক্রমশ দীর্ঘ থেকে হয়ে উঠছে দীর্ঘতর।
অবশেষে এক শরত্ সন্ধ্যায় আমাকে তার বিছানার পাশে ডেকে নিল মোরেলা। স্বর্গের উদ্যানে তখন স্থির হয়ে আছে পবিত্র হাওয়া, মাটির ওপরে বিরাজমান এক গভীর কুয়াশা। পানির ওপর ভেসে বেড়াচ্ছে উজ্জ্বল আভা। বনে বনে অক্টোবরের সাজ। তার পাতায় পাতায় রঙিন ছায়া মেলে শুয়ে আছে রঙধনু।
‘এমন একটা দিন,’ বলল সে, ‘এমন একটা দিন—চাইলে বাঁচতে পারো কিংবা মরতে। এমন একটা দিন এই পৃথিবীর, কিংবা জীবনের সন্তানের—কিংবা হয়তো স্বর্গের কন্যা কিংবা মৃত্যুর মেয়েদের।’
ওর কপালে চুমো খেলাম আমি। কিন্তু বলেই চলল ও :
‘মরে যাচ্ছি আমি, কিন্তু আমার মৃত্যু নেই।’
‘মোরেলা!’
‘এমন দিন আমার কপালে আসেনি যেদিন তুমি ভালোবেসেছিলে। অথচ যাকে তুমি ঘৃণা করে গেছ এই জীবনে, তার মৃত্যুতে তাকে তুমি বাধ্য হবে ভালোবাসতে।’
‘মোরেলা!’
‘আবারো বলছি, আমি মারা যাচ্ছি। কিন্তু আমার ভেতরে সেই তৃষ্ণা—ভালোবাসার—আহ কী অল্পই না ভেবেছ তুমি আমার—এই মোরেলার কথা। আর যখন আমি থাকব না তখন থাকবে আমার সন্তান—তোমার আর আমার। মোরেলার। কিন্তু তোমার দিনগুলো হবে বড়ই দুঃখের দিন—সেই দুঃখ যা হয়ে থাকে সবচাইতে দীর্ঘস্থায়ী আর মর্মছোঁয়া, যেমন গাছের ভেতর সবচাইতে দীর্ঘজীবী সাইপ্রেস। কেননা অতিক্রান্ত হয়েছে তোমার সুখের যতদিন, আর আনন্দ তো পাইস্তাম-এর গোলাপের মতো জীবনে দুই বার আসে না। অতএব বুনো ফুল আর আঙুরলতার ভালোবাসা ছাড়াই আজীবন নিজের সাথে তুমি বয়ে বেড়াবে তোমার নিজের কফিন।’
‘মোরেলা!’ চেঁচিয়ে উঠলাম আমি, ‘মোরেলা! কীভাবে এসব বলতে পারছ তুমি?’ কিন্তু আমার উত্তর না করে বালিশের উল্টো দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিল সে। সামান্য কেঁপে উঠল তার শীর্ণ পেশি—এভাবেই মারা গেল সে। থেমে গেল তার যত কথা।
তবুও, সে যেমন বলেছিল, বেঁচে থাকল তার সন্তান। নিজের মৃত্যুপথে যাকে সে জন্ম দিয়ে গেছে। মায়ের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের আগে যে শুরু করেনি তার প্রশ্বাস। আর সবাইকে অবাক করে সে আকারে প্রকারে, হুবহু হয়ে উঠল, যে চলে গেছে আগেই, তার অনুলিপি। আর তাকে আমি ভালোবাসলাম এমন এক অসম্ভব হূদয় নিয়ে, যা আমি ভাবতেও পারিনি এই মর্ত্যবাসী কোনো প্রাণীর পক্ষে বাসা সম্ভব।
কিন্তু শিগগিরই বিষাদ আর হতাশার অন্ধকার ঘিরে ধরল তাকে। দুঃখের কালো মেঘ ভর করল তার আকাশে। যা বলছিলাম, শিশুটি বেড়ে উঠতে লাগল অদ্ভুত ধরনে। প্রকারে ও প্রজ্ঞায়। সত্যিই অদ্ভুত, তার দৈহিক প্রকৃতি, কিন্তু কী ভয়াবহ, ওহ! ভয়াবহ ছিল সেই চিন্তাগুলো যারা ভিড় করে আসত আমার ভাবনায় যখন আমি একাগ্রচিত্তে দেখতাম তার মানসিক বেড়ে ওঠা। কীভাবে তা হতে পারত অন্যরকম? শিশুর ভেতর কীভাবে আমি আবিষ্কার করলাম চলে যাওয়া এক নারীর ক্ষমতা আর চিন্তা? শৈশবের ওষ্ঠ থেকে ঝরে পড়া অভিজ্ঞান? আর কীভাবে সেই অভিজ্ঞতার আয়োজন আমি দেখি তার দুই চোখে? যখন, এই সবকিছু স্পষ্ট হয়ে গেল আমার কাছে, যখন আর লুকিয়ে রাখতে পারলাম না তাকে আমার আত্মার কাছ থেকে, কিংবা সেই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তাকে ছুড়ে ফেলতে ব্যর্থ হলাম—যারা নিজেরাই শঙ্কিত ছিল তাকে গ্রহণ করবে কি-না তা নিয়ে। সন্দেহ, আশঙ্কা এবং উত্তেজনা হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকে পড়ল আমার আত্মার ভেতর। আমার চিন্তা ফিরে গেল মোরেলার আশ্চর্য গল্প আর রোমাঞ্চকর সূত্রগুলোর কাছে। পৃথিবীর কাছ থেকে আমি আসলে ছিনিয়ে এনেছি এমন একটি প্রাণ, স্বয়ং নিয়তি যাকে করে তুলেছে আমার আরাধ্য। আর আমার আশ্রয়ের নিদারুণ নৈঃসঙ্গ্যের মাঝে আমার একমাত্র কর্তব্য হয়ে উঠছে আমার ভালোবাসার যাতে কোনো ক্ষতি না হয়, সেদিকে দিনরাত নজরদারি করা।
এভাবেই গড়িয়ে চলল দিন। আমার চোখের সামনে ধীরে ধীরে গঠন হলো তার পবিত্র আর নরম আর বাঙ্ময় মুখ। তার বেড়ে ওঠা দেখতে গিয়ে আমি আবিষ্কার করতে শুরু করলাম বিষাদের ছবি সেই মায়ের সঙ্গে এই শিশুর নিত্যনতুন মিল। ঘণ্টায় ঘণ্টায় গভীর হয়ে উঠল এসব সাদৃশ্য। হলো আরো পূর্ণাঙ্গ আরো প্রকট আর প্রহেলিকাময়। কেননা আমি ভাবতাম, ওর মায়ের হাসির সঙ্গে ওর নিজের হাসির মিল থাকতেই পারে, কিন্তু আমাকে যা চমকে দিত তা হচ্ছে তাদের মধ্যেকার অস্বাভাবিক সাদৃশ্য। মোরেলার মতোই চোখ পেয়েছে ও; কিন্তু যখন ওই চোখে মোরেলার অন্তর্ভেদী দৃষ্টি নিয়ে সে বিদ্ধ করত আমার আত্মা, তখন শিউরে উঠতাম আমি। তার উঁচু কপালের ভাঁজে, তার রেশমি চুলের গুচ্ছ আর তার শীর্ণ আঙুল, বিষণ্ন সংগীতের মতো তার মৃদু স্বর—এই সবকিছুর ভেতর আমি খুঁজে পেলাম আমার শঙ্কা আর চিন্তার খোরাক। এ ছিল এমন এক পোকার জন্যে যার মৃত্যু নেই কোনো।
এভাবেই পেরিয়ে গেল দু’বছর। পৃথিবীতে আমার মেয়েটি তখনো রয়ে গেল নামহীন। বাবার স্নেহ থেকে উত্সারিত আদরের যেসব সম্বোধন হতো ‘আমার বাছা’ কিংবা ‘সোনা আমার’ যদিও বিচ্ছিন্নতার কারণেই তার সঙ্গে এর বাইরে খুব বেশি আলাপ করা হয়ে উঠত না। মোরেলার মৃত্যুর সাথে সাথে মরে গিয়েছিল তার নাম। মেয়ের সাথে কথা বলার সময় কখনো ওর মায়ের প্রসঙ্গ আনিনি। তা আনাটাও ছিল অসম্ভব। সত্যিই, তার স্বল্পায়ু জীবনকালে বাইরের পৃথিবী সম্পর্কে উল্লেখযোগ্য কোনো ধারণালাভের সুযোগ হয়নি তার। ততটুকুই সে দেখেছে, তার ব্যক্তিগত পরিবেশ তাকে যতটুকু দেখিয়েছে। আমার মনে পড়ছে ব্যাপ্টাইজ করার অনুষ্ঠানের কথা। এক অস্থির আর উত্তেজনাকর পরিস্থিতি। ভয়ঙ্কর নিয়তির হাত থেকে আমার পরিত্রাণ। আমি ইতস্তত করছিলাম একটা নামের জন্যে। প্রাজ্ঞ আর সুন্দর, অতীত আর বর্তমান, স্বদেশ এবং বিদেশের অজস্র নাম উঠে এল আমার ঠোঁটে। নরম, সুখী আর ভালো ভালো যত নাম। কিন্তু কী সর্বনাশ! আমাকে তাড়িত করল সমাধিস্থ এক মৃতের স্মৃতিকে বিরক্ত করার কাজে। কোন শয়তানি বুদ্ধিতে আমি উচ্চারণ করলাম ওই নাম? যার কথা মনে করা মাত্র আমার কণ্ঠা থেকে হূদপিণ্ডের মাঝে ছলকে উঠল রক্তের বাণ? আমার আত্মার গহিন থেকে ডাক পাঠাল কোন সে দুরাচারী, যখন ওই আলোআঁধারি বারান্দায় রাত্রির মৌনতার মাঝে পবিত্র মানুষটির কানের কাছে মুখ রেখে আমি মৃদুকণ্ঠে উচ্চারণ করলাম—মোরেলা? কোনো অশুভ ইঙ্গিতে ভীষণভাবে খাবি খেল আমার বাচ্চার দেহ, আর মৃত্যু ছায়া মেলে দিলো তার ওপর। ভেজা চোখ দুটো পৃথিবীর থেকে ফিরিয়ে নিবদ্ধ করল স্বর্গের দিকে, প্রাগৈতিহাসিক সিন্দুকের কালো পাথরের ওপর আছড়ে পড়ল এক প্রত্যুত্তর—‘এই যে আমি!’
ঠাণ্ডা কিন্তু স্পষ্ট উচ্চারণে আমার শ্রবণ স্পর্শ করল ওই ধ্বনি। তারপর গলন্ত সীসার মতো হিসহিস করে ঢুকে পড়ল আমার মগজে। বছর—বহু বছর পার হয়ে যেতে পারে হয়তো, কিন্তু কখনোই চলে যাবে না ওই ঘটনার স্মৃতি। তাছাড়া পুষ্প আর আঙুর বিষয়ে অজ্ঞ না হয়েও আমার দিন আর রাত্রিগুলো আস্তে আস্তে দখল করে নিল হেমলক আর সাইপ্রেস। স্থান এবং কালিক ধারণা হারিয়ে ফেললাম আমি। স্বর্গের আকাশ থেকে অপসৃত হলো আমার ভাগ্যের তারকা। পৃথিবীটা ভরে গেল নিঃসীম অন্ধকারে। মানুষগুলো মনে হতো ইতিউতি ছায়ার মতন। ওদের দিকে তাকিয়ে শুধু একজনকেই দেখতে পেতাম আমি—মোরেলা। আকাশ থেকে বাতাসে ভর দিয়ে আমার কানে নেমে এল ওই ধ্বনি, বুকের মধ্যে সাগরের ঢেউগুলো গুঞ্জরিত করল ওই নাম—মোরেলা। কিন্তু মৃত্যু হলো তার। এবং নিজের হাতে আমি তাকে নামিয়ে দিলাম সমাধিতে। কিন্তু দ্বিতীয়াকে যেখানে রাখলাম সেখানে প্রথমাকে যে রেখে গিয়েছিলাম তার কোনো চিহ্নই চোখে পড়ল না আমার। কী এক ভাবনায় অযথাই তিক্ত আর বিষণ্ন একটা হাসি জেগে উঠল আমার বুকে।
