চাদর

আপডেট : ১৭ জানুয়ারি ২০১৯, ১৮:৩২

হাবুলের বাবা-মা মারা গেছে কয়েক বছর হলো। আপন বলতে এক চাচা আছেন। তার অবস্থাও ভালো নয়। নিজের সংসার চালাতেই হিমশিম খান। তাই হাবুলের খোঁজখবর রাখতে পারেন না। একরকম অনাদরেই কাটছে হাবুলের। যেখানে সেখানে ঘুমিয়ে রাত কাটায়। গরমে সমস্যা হয় না। শীত হলেই জ্বালা। এখন প্রচণ্ড শীত। সঙ্গে হালকা বাতাস। ঠাণ্ডা শিরশির করে গা বেয়ে ওঠে। সমস্ত গায়ে কাঁটা দেয়। কেন যে শীত আসে! হাবুলের মনে ক্ষোভ জাগে। একটু আগুনের ব্যবস্থা করতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু সে চেষ্টা করে পারে না হাবুল। বাইরে প্রচণ্ড বাতাস। দমকে দমকে ঢুকে পড়ছে শরীরের ভেতর। বাতাসের এই খেলা বুঝি গরিবের সাথে। ভাবতে ভাবতে ছেঁড়া চাদরে শরীর ঢাকে হাবুল। খড় বিছিয়ে নেয় নিজের ওপর। যদি একটু ঘুমানো যায়। মাথা-মুখ শরীর-সবকিছু এখন খড়ের স্তূপের নিচে। এবার ছেঁড়া চাদরের নিচে কিছুক্ষণ নিঃশ্বাস ফেললেই শরীরে ওম ধরে যাবে। শীতটা দেহের চামড়ায় কামড়ায়, মাংস কামড়ায়, হাড্ডি কামড়ায়। ছাড়ে না কিছুতেই। প্রথমে পা জড়িয়ে ধরে। ধীরস্রোতের মতো কনকন করে ওঠে আসে হাঁটুর ওপর। তারপর হাড় বেয়ে উঠে আসে শিরদাঁড়া পর্যন্ত। আর শরীর থরথর করে কাঁপিয়ে দেয়। চোয়াল কেঁপে ওঠে তাতে। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শীতও যেন পাল্লা দিয়ে বাড়বে—ভাবটা এমনই। অথচ শীত পার করতে হাবুলের সম্বল একটি মাত্র ছেঁড়া চাদর! তাও তো তিন বছর আগে দিয়েছিল সরকার বাড়ির বড় ছেলে আব্দুল আজিজের নাতি সোহান। সে চাদরটিও এখন ছিঁড়ে গেছে। তারা ঢাকায় থাকে। গাঁয়ে এলেই গরিবদের জামা-কাপড় দেয়। হাবুল শীতে কাঁপে আর ভাবে, যদি সরকার সাহেবের ছেলে এই শীতে বাড়িতে আসত। তা হলে হয়তো এবার সে একটা চাদর পেত। হাবুলের কাছে এখন একটা চাদর আস্ত একটা সূর্যের মতো। দিনে সূর্য উঠলে হয়তো একটু গরম লাগবে। শীতের কথা ভাবতে ভাবতে ছেঁড়া চাদর মুড়িয়ে, নাকে খড়ের গন্ধ নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে হাবুল। সকালে সোহানের ডাকে ঘুম ভাঙল হাবুলের। শীতের জোর অনেক বেশি ছিল গতরাতে। তাই দেরিতে ঘুম থেকে উঠল হাবুল। ঘুম ভেঙে চোখ কচলাতে কচলাতে চেয়ে দেখে—হাবুলের কাছে দাঁড়িয়ে আছে সোহান। হাতে দুটি চাদর ও একটি সোয়েটার। কারণ গত তিন বছর সোহান গ্রামে আসেনি। কিন্তু সে প্রতি বছরে নিজের জন্য যখন শীতের পোশাক কিনেছে। তখনই তার বাবাকে বলে হাবুলের জন্য শীতের কাপড় কিনেছে। সোহান দেখেছে তার বাবা অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়ান সবসময়। অসহায় মানুষদের পাশে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে—এটা সে শিখেছে তাঁর বাবার কাছে। সোহানের হাতে দুটি চাদর, একটি সোয়েটার দেখে হাবুলের চোখের ঘুম পালিয়ে গেছে। খুশির ঝিলিক চোখে মুখে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে না, গতকাল রাতে সে শীতের সাথে যুদ্ধ করে রাত পার করেছে। সোহান যখন শীতের কাপড়গুলো হাবুলের হাতে দিয়ে বল, এগুলো তোমার, তখন হাবুলের মনে হলো। সূর্য যেন তার শরীরে উষ্ণতা ঢেলে দিচ্ছে।