শাহীন সরদার
এমন কিছু কবিতা,গল্প-উপন্যাস, ছড়া কিংবা গান আছে যা হূদয়কে খুব গভীর থেকে স্পর্শ করে, সে স্পর্শ মনকে দোলা দেয়—দু চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে।
কবি নাসির আহমেদ আমার প্রিয় কবিদের একজন, যিনি শুধু কবি নন, একজন গীতিকার, নাট্যকার, শিশু-সাহিত্যিক, সাংবাদিক কলামিস্ট হিসেবেও স্বনামখ্যাত।
সাহিত্যে, সংগীতে, নাটকে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বাংলা একাডেমি পুরস্কার, বিষ্ণুদে পুরস্কার, বাচসাস পুরস্কারসহ বহু সম্মাননা-স্বীকৃতিতে ভূষিত তিনি।
পূর্ব অন্তরঙ্গতার সূত্রে তাঁর বাসায় আমার যাতায়াত ছিল। সম্ভবত ২০০০ সালের মার্চের শেষদিকের কথা। শিশু-কিশোরদের জন্য কিছু বই কিনতে হবে সারগাম ললিতকলা একাডেমির পুরস্কারের জন্য। একদিন নাসির ভাইয়ের বাসায় গেলাম। বললাম, দাদা, আমাদের একাডেমির শিশু-কিশোরদের মাঝে পুরস্কার বিতরণের জন্য কিছু ভালো বই কিনতে হবে। তিনি বিখ্যাত লেখকদের কিছু বইয়ের নাম দিলেন এবং বললেন—এবারের একুশে বইমেলায় আমার দুটো ছড়ার বই বেরিয়েছে। এই বলে ‘রক্তে রাঙা বাংলা আমার’ বইটি উল্টেপাল্টে দুটি ছড়া আমাকে পড়ে শোনালেন। স্বাধীনতার ওপর একটি ছড়া শুনতে শুনতে ছড়ার শেষ দুটি চরণ আমার মনকে এমনভাবে নাড়া দিল—আমি আর চোখের জল ধরে রাখতে পারলাম না। অতঃপর নাসির ভাইকে বললাম, এই ছড়ার বই আমার ২৫ কপি দরকার। তিনি ঠিকানা দিলেন। ঠিকানা নিয়ে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে ২৫ কপি বই সংগ্রহ করি এবং প্রথম দ্বিতীয় তৃতীয় পুরস্কারপ্রাপ্তদের এই বইটি বিতরণ করি।
ছড়াটি প্রথম যেদিন শুনি সেদিনই মনে মনে স্থির করে ফেলি—এই ছড়াটি আমি সুর করব। যদিও জানি আমার পক্ষে এটা বড়ো দুঃসাহসিক কাজ। কারণ আশির দশকের শুরু থেকে কবি নাসির আহমেদের লেখা বহু গান সুর করেছেন এদেশের বরেণ্য সংগীত ব্যক্তিত্বগণ। যাঁদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য—সমর দাস, আবদুল আহাদ, খন্দকার নুরুল আলম, অজিত রায়, সুবল দাস, দেবু ভট্টাচার্য আবু জাফর, মনসুর আহমেদ, ওমর ফারুক, ওস্তাদ কাদের জামেরি, বশীর আহমেদ, মীর কাশিম খান, ধীরআলী মিয়া, প্রণব দাস, শেখ সাদী খান, মাকসুদ জামিল মিন্টুসহ অনেকেই।
একবার জাপান প্রবাসী (যিনি জাপান বেতারের বাংলা বিভাগের অনুষ্ঠান উপস্থাপক) এক মহিলা আমার এক ছাত্রীর কণ্ঠে গোটা বিশেক গান শুনলেন। এসব গানের মধ্যে রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলসংগীত, অতুলপ্রসাদের গান এবং সলিল চৌধুরীর লেখা গানও শুনেছেন। সবশেষে কবি নাসির আহমেদের লেখা আমার সুর করা গানটি যখন আমার ছাত্রী গাইছিল—তিনি তন্ময় হয়ে শুনলেন। গান শুনে তিনি ছলোছলো চোখে বললেন, এ গান তো আগে কখনো শুনিনি! কার লেখা, কার সুর?
ছাত্রী তখন বলল—লিখেছেন কবি নাসির আহমেদ আর আমার ওস্তাদজি সুর করেছেন ।
তিনি বললেন, দেশকে নিয়ে লেখা চমত্কার একটি গান। তোমার ওস্তাদজিকে আমার অভিনন্দন জানিয়ে দিও গানটির সুর করার জন্য।
সেদিন থেকে ভাবলাম—ছড়াটি ভালো সুর করতে পেরেছি কি না জানি না, তবে এটুকু সত্য যে ছড়াটি আমাকে এবং আমার মতো অনেকের হূদয় স্পর্শ করেছে, যে স্পর্শ থেকে জল, জল থেকে সুর, সুর থেকে শ্রোতা—এই অনুভূতিটুকু আমার আমৃত্যু মনে থাকবে।
জন্মদিনে কবি নাসির আহমেদকে আমার শ্রদ্ধাঞ্জলি। সুরারোপিত ছড়াটির শিরোনাম : আমার কাকুর প্রিয় কবি। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর/প্রিয় ছিলেন আমার ছোটকাকুর/বুকে সদাই বাজতো সুরের বাঁশি/সোনার বাংলা তোমায় ভালবাসি/কবির মতো নিমগ্ন খুব থাকেন/মনের পটে দেশের ছবি আঁকেন
হঠাত্ এদেশের পাল্টে গেল হাওয়া/কাকু ভুলে গেলেন নাওয়া-খাওয়া মিছিল-মিটিং নিয়ে ঘোরাঘুরি/পাখির মতন কেবল ওড়াউড়ি/হঠাত্ শুনে মা ডেকে কন : ও মা!/তোর কাকু কই? বাইরে গুলি-বোমা/ দেশটা জুড়ে যুদ্ধ হলো শুরু/বুকটা ভয়ে কাঁপছে দুরু দুরু/সেই যে কাকু হঠাত্ করে হাওয়া/দিন-মাস যায়, যায় না তো খোঁজ পাওয়া/যুদ্ধে সবুজ দেশটা পুড়ে খাক/শোকে যেন বাতাসও নির্বাক/দলবেঁধে সব দেশ ছেড়ে যায় ওপার/নেই ভেদাভেদ ধনী-গরিব লোপার/উদ্বাস্তুর তাঁবুর ভেতর থাকি/মনে তবু কাকুর ছবি আঁকি/ফেলে যাওয়া মেঘনা নদীর তীরে/যুদ্ধশেষে সবাই এলাম ফিরে/হয়নি ফেরা শুধু আমার কাকুর/তার ছবিটার
পাশেই রাখি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কবি নাসির আহমেদ, ৫ ডিসেম্বর ১৯৫২
