হলি আর্টিজান হামালার পর সরাসরি উগ্রবাদী সহিংস কর্মকাণ্ড না হলেও অনলাইন র্যাডিকালাইজেশন দেখা যাচ্ছে ব্যাপক হারে এবং ক্রমবর্ধমান হারে এর স্বাভাবিককরণও চলছে। ইসলামী চরমপন্থী গোষ্ঠীর একটি নেটওয়ার্ক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম জুড়ে ঘৃণ্য বক্তব্য এবং ভুল তথ্য ছড়িয়ে দিচ্ছে। বাংলাদেশ পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের ৮০ শতাংশেরও বেশি লোক অনলাইনে চরমপন্থী মতবাদ ছড়ানোর জন্য গ্রেপ্তার হয়েছে। আর এদের মধ্যে ৬০ শতাংশই বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষিত।
অনলাইনে গুজব এবং ভুল তথ্য ছড়ানোর মাধ্যমে পুরো বাংলাদেশ জুড়ে চরমপন্থাকে আবারও নতুন করে জাগিয়ে তুলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকে। এই প্রবাহ ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে, অন্তত এর পক্ষে উদ্বেগজনক লক্ষণগুলো তাই বলছে। নভেম্বরের গোড়ার দিকে ফ্রান্সের সমর্থনে এবং সামাজিক মিডিয়ায় ইসলামকে অপমান করার অভিযোগে বাংলাদেশি হিন্দুদের বাড়িঘর ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। এর আগের মাসে লালমনিরহাটে কুরআন অবমাননার অভিযোগে এক গ্রন্থাগারিককে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। বাংলাদেশ পিস অবজারভেটরির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালের প্রথম নয় মাসে হামলা, পুলিশি অভিযান এবং গ্রেপ্তারের সংখ্যা ছিল অনেক বেশি। বাংলাদেশি সাইবার স্পেসে চরমপন্থী বিষয়বস্তু এখন আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এবং এর অধিকাংশই এমনভাবে সাজানো হয়, বক্তব্যগুলো এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যাতে করে সরকার এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর সনাক্তকরণ এড়ানো যায়। উদাহরণ হিসেবে ইউটিউবে জসিমউদ্দিন রহমানির ভিডিওগুলোর কথা বলা যায়, যেগুলোর ভিউ প্রতিদিন বাড়ছেই। আনোয়ার আল-আওলাকীর বক্তৃতাগুলো নিয়মিতভাবে বাংলায় অনুবাদ হচ্ছে এবং টেলিগ্রাম আর ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ছে। ইসলামিক স্টেটের মতো চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর ওয়েবসাইট ও ইউটিউব চ্যানেল নিয়মিতভাবে সরিয়ে দেওয়া হলেও বিভিন্ন দেশ বা অঞ্চলের স্থানীয় ভাষায় প্রচার করা কন্টেন্টগুলো কিন্তু থেকে যাচ্ছে। এইসমস্ত উগ্রপন্থী প্রচারে বিশেষায়িত ওয়েবসাইট, আলোচনার ফোরাম, সোশ্যাল মিডিয়া চ্যানেল এবং এমনকি সত্য-যাচাইকারী সাইটও আছে যেখানে প্রচারকারীরা নিজেদের মনগড়া তথ্য যুক্ত করে উগ্রবাদিতা ছড়ায়।
কৌশলে তৈরি ভিডিও এবং ভাইরাল কন্টেন্টগুলোর মাধ্যমে অল্প বয়স্ক শ্রোতাদের উগ্রপন্থার প্রতি আগ্রহী করে তুলছে একিউআইএস। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সহিংস উগ্রবাদী বিষয়বস্তু শেয়ার করছে একে অন্যের সঙ্গে। এইসমস্ত ভিডিওর বিষয়বস্তু হচ্ছে—সশস্ত্র জিহাদের সমর্থন, সন্ত্রাসী দলগুলোর মহিমা প্রচার, উদারপন্থী নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হামলার আহ্বান এবং সংখ্যালঘুদের নিন্দা করা। সেকডেভ-এর গবেষণা অনুসারে, ফেসবুকে সহিংস উগ্রবাদী পেজগুলোর প্রতিটি পোস্টে অংশগ্রহণের পরিমাণ এক বছরে বেড়েছে ২৫০ শতাংশ পর্যন্ত। ২০১৯ সালের এপ্রিল থেকে জুন মাসে এরকম একেকটি পোস্টে সংযুক্ত হয়েছে গড়ে ৯৯ জন, সেখানে ২০২০ এই সময়ের মধ্যে যুক্ত হয়েছেন ৩৪৭ জন। একিউআইএসের পক্ষে সমর্থনকারী ইসলামী ব্লগারদের সংখ্যা বাড়া এর অন্যতম কারণ।
এদিকে কোভিড-১৯ মহামারির কালে সুবিধাবাদী উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো আরও বৃহত্তর দর্শকদের কাছে পৌঁছে গেছে। ২০২০ সালের গোড়ার দিকে এই প্রাদুর্ভাবের সূত্রপাত হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশে ইন্টারনেটের ব্যবহার বেড়েছে ৫০ শতাংশেরও বেশি। আরও বেশি সংখ্যক মানুষের ইন্টারনেটের সঙ্গে সংযুক্ত হবার বিষয়টিকে কাজে লাগিয়েছে উগ্রবাদী দলগুলো। ২০২০ সালের মে মাসে, কোভিড-১৯ সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ইউটিউবে একিউআইএস মাত্র সাতটি চ্যানেলের নতুন সাবস্ক্রিপশন বেড়েছে ১ লাখেরও বেশি। মহামারি মোকাবেলায় সরকারের মনোযোগ থাকায় এই সুযোগে অনলাইন র্যাডিকালাইজেশনের মাত্রা বেড়েছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এভাবে উগ্রবাদ ছড়িয়ে পড়া ও অস্ত্রায়নের বিষয়টি হালকাভাবে নিচ্ছে না দেশীয় ও আন্তর্জাতিক কর্তৃপক্ষরাও। ২০১৬ সালের হলি আর্টিজান হামলার অল্প সময়ের মধ্যেই, অনলাইন ও অফলাইনে সহিংস উগ্রবাদ মোকাবেলায় জাতিসংঘের সঙ্গে যুক্ত হয় বাংলাদেশ। উদাহরণস্বরূপ, এই চ্যালেঞ্জের পরিধি এবং মাত্রা অধ্যয়নের জন্য বাংলাদেশ পিস অবজারভেটরি এবং কক্সবাজার বিশ্লেষণ ও গবেষণা ইউনিটের মতো বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে কাজ করছে দেশটি। এছাড়া তরুণ সমাজকে এই লড়াইয়ে যুক্ত করতে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সহায়তায় বিভিন্ন কর্মসূচিও চালু করেছে।
বাংলাদেশের সাইবারস্পেসে চরমপন্থী বিষয়বস্তু হ্রাস করতে এই প্রচেষ্টাগুলো সহায়ক হবে এমন লক্ষণ দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। গত কয়েক মাসে, কোভিড-১৯ সম্পর্কিত ভুয়া ও ভুল তথ্য প্রচার হ্রাস পেয়েছে। একিউআইএসের ইউটিউব চ্যানেলে এখনও ৬ লাখেরও বেশি সাবস্ক্রাইবার থাকলেও বেশ কয়েকটি উগ্রপন্থী চ্যানেল ইতোমধ্যে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। সেকডেভ-এর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত ইসলামিক স্টেটের সাথে সম্পর্কিত ৯০টিরও বেশি বাংলা চ্যানেল ইউটিউব থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। এক্ষেত্রে ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোও এগিয়ে আসছে। বাংলা ভাষায় ভুয়া খবর ও ভুল তথ্য যাচাই করে চিহ্নিত করতে ‘ভুল তথ্য’ ট্যাগ যুক্ত করার কথা জানিয়েছে সংস্থাটি। ফেসবুকে কোভিড-১৯ সংক্রান্ত নানা ভুয়া তথ্য চিহ্নিত করেছে সেকডেভ যার ৭০%ই সরিয়ে ফেলা হয়েছে।
ইন্টারনেট আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারের মাত্রা বেড়েই চলেছে। এর সঙ্গে তাল রেখে ভুয়া তথ্য সরানোর কাজটি রীতিমতো কঠিন। কেননা মুহূর্তের মধ্যে একটা তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু সেটা যাচাই করে সরানোর কাজটি সময়সাপেক্ষ। দীর্ঘমেয়াদে সহিংস চরমপন্থার বিরুদ্ধে লড়াই করার একমাত্র উপায় হল ডিজিটাল জগতের বাসিন্দাদের শিক্ষা, সচেতনতা বৃদ্ধি। মত প্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে নিরাপদ সাইবার স্পেস তৈরির ক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। আর এজন্য সর্বস্তরে সার্বক্ষনিক আলোচনার কোন বিকল্প নেই।
রবার্ট মুগাহ, ফরেন পলিসি অবলম্বনে
মোজাহেদুল ইসলাম
