নগরবাড়ী-আরিচা রুটে ফেরি চলাচল

আপডেট : ০৬ ডিসেম্বর ২০২০, ২১:৪৪

যমুনা নদীর নগরবাড়ী-আরিচা রুটে অর্ধযুগেরও অধিক সময় ধরিয়া ফেরি চলাচল বন্ধ রহিয়াছে। অর্ধযুগ বলিলেও ভুল হইবে। আসলে ২০০৭ সাল হইতে বন্ধ রহিয়াছে ফেরি চলাচল। সেই হিসাবে এক যুগেরও অধিক সময় ধরিয়া ফেরি চলাচল বন্ধ থাকিবার কারণে উত্তর-দক্ষিণাঞ্চলের কয়েক জেলার মানুষ চরম ভোগান্তি পোহাইতেছেন। তাহারা ফেরির অভাবে ছোট লঞ্চ, শ্যালো নৌকা এবং স্পিডবোটে চলাচল করিতেছেন। ইহাতে তাহারা জীবনের ঝুঁকি লইয়া নদী পারাপার হইতেছেন। আবার আর্থিক ক্ষতিরও সম্মুখীন হইতেছেন। অথচ নগরবাড়ী-আরিচা রুট একসময় একটি ব্যস্ত নৌ-রুট ছিল। নগরবাড়ী ঘাটকে বলা হইত উত্তরবঙ্গের সিংহদ্বার। ১৯৬৪ সালে প্রথম ফেরি চলাচলের পর কয়েক দশক ধরিয়া উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলার সকল ধরনের যানবাহন ও হাজার হাজার যাত্রী এই রুটেই রাজধানীতে যাতায়াত করিত। সেই সময় যানবাহন ও মানুষের পদচারণায় মুখরিত থাকিত নগরবাড়ী ও আরিচা ঘাট; কিন্তু আজ সেই সকল স্মৃতিমাত্র। যদিও নগরবাড়ী-আরিচা রুটে নূতন করিয়া ফেরি চলাচল করিলে বঙ্গবন্ধু বহুমুখী যমুনা সেতুর উপর হইতে যানবাহনের চাপ যেমন কমিবে, তেমনি কয়েকটি জেলার মানুষ দ্রুততম সময়ে রাজধানী ঢাকায় যাতায়াত করিতে পারিবেন। তাই বিষয়টি বিআইডব্লিউটিসির গভীরভাবে ভাবিয়া দেখা এবং এই সংক্রান্ত প্রতিবন্ধকতা দূর করা একান্ত প্রয়োজন।

এইখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ১৯৯৮ সালের জুন মাসে বঙ্গবন্ধু বহুমুখী যমুনা সেতু চালু হইবার পর স্বাভাবিক কারণে নগরবাড়ী-আরিচা নৌ-রুটের গুরুত্ব হ্রাস পায়। আগে এই নৌ-রুটের চাহিদা এতটাই অধিক ছিল যে, ফেরিঘাটের দুই পাড়ে যানজট প্রায়শ লাগিয়া থাকিত। সেতু নির্মিত হইবার পর উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলার এই নৌ-রুট ব্যবহার করিবার আর কোনো প্রাসঙ্গিকতা থাকিল না; কিন্তু নগরবাড়ীর আশপাশ অঞ্চলের মানুষ যানজটমুক্ত হইয়া ফেরি ব্যবহার করিয়া দ্রুত ঢাকায় আসা-যাওয়া করিতে লাগিলেন। যেমন—পাবনা হইতে যমুনা সেতু দিয়া ঢাকায় আসিতে যেখানে পাঁচ ঘণ্টা বা ক্ষেত্রবিশেষে তাহারও অধিক সময় লাগে, সেখানে এই নৌ-রুট ব্যবহার করিয়া ঢাকায় আসিতে সময় লাগে আড়াই হইতে সাড়ে তিন ঘণ্টা; কিন্তু ২০০৭ সালে বন্যা ও ফেরি স্বল্পতার কারণ দেখাইয়া নগরবাড়ী-আরিচা রুটে ফেরি চলাচল বন্ধ করিয়া দেয় বিআইডব্লিউটিসি। ইহাতে এখানকার এলাকাবাসী বিক্ষুব্ধ হন। তাহাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২০১২ সাল হইতে ২০১৫ সাল পর্যন্ত তিন বার ফেরি চালু করা হয়। কোনোবারই তাহা এক সপ্তাহের অধিক স্থায়ী হয় নাই। অর্থাত্ বলিতে গেলে ২০০৭ সাল হইতেই এখানে ফেরি চলাচল বন্ধ রহিয়াছে।

দীর্ঘদিন ধরিয়া নগরবাড়ী-আরিচা রুটে ফেরি চলাচল বন্ধ থাকায় পাবনা, নাটোর, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কুষ্টিয়াসহ উত্তর-দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি জেলার মানুষ বিপাকে পড়িয়াছেন। তাহারা অতিরিক্ত ভাড়া দিয়া ও সময় নষ্ট করিয়া রাজধানীতে যাতায়াত করিতেছেন। এইজন্য এতদঞ্চলের জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী ও পরিবহনমালিকসহ সর্বস্তরের মানুষের প্রাণের দাবি— অবিলম্বে নগরবাড়ী-আরিচা রুটে আবারও ফেরি চালু করা হউক। পাবনার নগরবাড়ী কাজীরহাট ঘাটে বিআইডব্লিউটিসির দুইটি পন্টুন অলস পড়িয়া রহিয়াছে। বিআইডব্লিউটিসির ঘাট ট্রাফিক ইন্সপেক্টরের মতে, এখানে ফেরি চালু করিতে কোনো অসুবিধা নাই। তবে আমাদের মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, ফেরি চলাচলের জন্য আরিচাতে নাব্য সংকট দূর করিতে হইবে। বর্তমান সরকার সমগ্র দেশে নদী খনন ও ড্রেজিংয়ের ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করিয়াছে। অতএব, এখানে জরুরি ভিত্তিতে ড্রেজিং কার্যক্রম বাস্তবায়ন করিয়া এবং ঘাট ও পন্টুন প্রস্তুত করিয়া নৌ-রুটটিকে ফেরি চলাচলের উপযোগী করা আবশ্যক। আমরা জানি, ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী যখন এই নগরবাড়ী ঘাট দিয়া পাবনায় প্রবেশ করে, তখন তাহারা প্রথম মুক্তিযোদ্ধা-জনতার প্রতিরোধের মুখে পড়ে। এমন একটি ঐতিহ্যবাহী নৌ-রুটে ফেরি চলাচল বত্সরের পর বত্সর বন্ধ থাকিবে, তাহা মানিয়া লওয়া যায় না।