গত মঙ্গলবার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রবীন্দ্র ভবনের ছাদের একাংশ ধসিয়া পড়িলে গুরুতর আহত হয় ব্যাংকিং ও ইন্সুরেন্স বিভাগের এক শিক্ষার্থী। বর্তমানে তিনি ঢাকায় চিকিত্সাধীন। যে ভবনটির কিয়দংশ ধসিয়া পড়িয়াছে তাহা কোনো হল ভবন নহে, বরং একটি একাডেমিক ভবন যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পড়াশুনা করিয়া থাকেন। জানা মতে, এই ভবনটিসহ এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯টি একাডেমিক ও আবাসিক ভবনকে ইতোমধ্যেই ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করিয়াছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল দপ্তর। কিন্তু এই ঘোষণার পর তিনি আর তাহার পদে থাকিতে পারেন নাই। আবার ঝুঁকিপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও চারতলা বিশিষ্ট রবীন্দ্র ভবনের ছয়তলার সমপ্রসারণমূলক কাজ কিভাবে চলিতেছে তাহাও বোধগম্য নহে। আহত শিক্ষার্থীটি অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পাইলেও ইহার চাইতেও ঘটিতে পারিত বড় দুর্ঘটনা। এখন আহত ও দরিদ্র এই শিক্ষার্থীর চিকিত্সার ব্যয়ভার বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকেই বহন করিতে হইবে।
একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকটি ভবন ঝূঁকিপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও এই ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ না নেওয়াটা বিস্ময়কর। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নওয়াব আব্দুল লতিফ হল, মাদারবখশ হল, সৈয়দ আমির আলী ও শাহ মখদুম হল আছে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকায়। এই তালিকায় রবীন্দ্রভবনের পাশাপাশি আছে প্রথম বিজ্ঞান ভবন, প্রশাসন ভবন-১ এবং শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নির্মিত অনেক কোয়ার্টার। আমরা পত্র-পত্রিকায় প্রায়শ বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হইবার সংবাদ দেখিতে পাই এবং ইহাতে অনেক সময় কোমলমতি শিক্ষার্থীরা খোলা আকাশের নিচে ক্লাস করিতে বাধ্য হয়। এখন দেখি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও এমন অবস্থা তৈরি হইতে আর দেরি নাই। একটি ভবন পুরাপুরি ধসিয়া পড়িয়া ব্যাপক হতাহত না হওয়া পর্যন্ত হয়তো আমাদের টনক নড়িবে না। শুধু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় নহে, অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েও অনেক ঝুঁকিপূর্ণ ভবন রহিয়াছে। ১৯৮৫ সালের ১৫ অক্টোবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের টিভি রুম ধসিয়া পড়িলে নিহত হন ৩৯ জন, আহত হন ৩০০ জন। কিন্তু তাহার পরও আমরা এই ট্রাজিডি হইতে শিক্ষাগ্রহণ করি নাই। প্রশ্ন হইল, অতি পুরাতন ও জরাজীর্ণ ভবনে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা কেন পড়াশুনা বা বসবাস করিবেন? বাংলাদেশ আজ যখন একটি উন্নত দেশে পরিণত হইবার স্বপ্ন দেখিতেছে, তখন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ভবনের সংস্কার ও প্রয়োজনীয় স্থাপনা নির্মাণে এই অবহেলা কেন?
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ভবন বত্সরের পর বত্সর ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকিতে পারে না। ইহার দায়-দায়িত্ব ভাইস চ্যান্সেলর তথা উপাচার্যকেই গ্রহণ করিতে হইবে। এমনকি এই ব্যাপারে চ্যান্সেলর তথা মাননীয় রাষ্ট্রপতি কী করিতে পারেন তাহাও ভাবিয়া দেখা প্রয়োজন। তিনি সামপ্রতিককালে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি দূর করিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষার ব্যাপারে উদ্যোগী ভূমিকা পালন করিয়াছেন যাহা সাধুবাদযোগ্য; যদিও দুঃখজনকভাবে এখনো তাহা বাস্তবায়িত হয় নাই। অনুরূপভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ঝুঁকিপূর্ণ ভবন, শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম ইত্যাদি ব্যাপারেও তাঁহার সরব ভূমিকা প্রত্যাশিত। রাষ্ট্রপতি হিসাবে তাঁহার ক্ষমতার সীমাবদ্ধতার ব্যাপারে আমরা সচেতন, তবে ইহাও সত্য যে, রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসাবে দেশবাসী তাঁহার নিকট এইটুকু প্রত্যাশা করিতেই পারেন। একই সঙ্গে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কেও নিজেদের দায়িত্ব-কর্তব্য নূতন করিয়া নির্ধারণ করিতে হইবে।
