একটি মানচিত্র, যাহা কোনো ভূখণ্ডের নহে, মানুষের। মানুষের জিন মানচিত্র। ২০০০ সালে প্রথম যখন মানুষের পূর্ণাঙ্গ জিন মানচিত্র উদ্ঘাটিত হয়, তখন যুক্তরাষ্ট্রের তত্কালীন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন উচ্ছ্বাস প্রকাশ করিয়া বলিয়াছিলেন, ‘আমরা এখন সেই ভাষা শিখিয়া ফেলিয়াছি, যেই ভাষা দিয়া ঈশ্বর আমাদের তৈরি করিয়াছেন।’ প্রায় ১০ বত্সরের নিবিড় গবেষণায় আরো ১৯ বত্সর পূর্বে বিজ্ঞানীরা উদ্ঘাটন করিয়াছিলেন এই মানবজিনোম নকশা। ধীরে ধীরে তাহার সুফল ক্রমশ ছড়াইয়া পড়িতেছে চিকিত্সা বিজ্ঞানেও।
মানুষের জিন-বিন্যাস লিপিবদ্ধ করিবার মধ্য দিয়া ক্যান্সারসহ অন্যান্য বংশগত রোগের কারণ-ধরন নির্ণয়ে সমপ্রতি বাংলাদেশেই প্রতিষ্ঠা হইয়াছে জিনোম সিকোয়েন্সিং ল্যাব। ইহা অত্যন্ত আশার কথা। আমরা নূতন রোশনাই দেখিতে চাই এই ধরনের গবেষণাগারের অন্দরে। প্রাপ্ত তথ্য বলিতেছে, এই ল্যাবে বিশেষ প্রযুক্তির মাধ্যমে মাত্র তিন দিনে ৪৮ জন মানুষের জিনের গঠন বৈশিষ্ট্য জানা যাইবে। এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হইল, বাংলাদেশের মানুষের জিনোমে নূতন ক্যান্সার মার্কারসহ অন্যান্য জেনেটিক রোগের মার্কার খুঁজিয়া বাহির করা। অজানা রোগ নির্ণয়ও এই প্রকল্পের উদ্দেশ্যগুলির মধ্যে একটি। ইহার পূর্বে পাট ও ইলিশের ভৌগোলিক নির্দেশক তথা জিআই স্বীকৃতি পাইতে বাংলাদেশ হইতে জিনোম সিকোয়েন্স করা হইয়াছিল বিদেশের ল্যাবে। জিনোম সিকোয়েন্স ল্যাব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এখন বাংলাদেশেই সেই প্রযুক্তি লইয়া আসা সম্ভব হইল।
আমরা জানি, পৃথিবীর জীবজগতের বিপুল বৈচিত্র্যের মধ্যেও একটি অনন্য ঐক্যের জায়গা রহিয়াছে। জীবন পরিচালনার সকল তথ্য বহন করিতেছে একই রকমের যৌগ ডিএনএ (ডিঅক্সিরাইবো নিউক্লিড এসিড)। আর জীবের এই অসাধারণ ঐক্যসাধনকারী ডিএনএ হইতেছে এক ধরনের পলিমার যৌগ যাহার গাঠনিক একক হইল—নিউক্লিওটাইড। মানুষের জিনোমে প্রায় ৩০০ কোটি বেস পেয়ার রহিয়াছে, যাহার মধ্যেই নিহিত মানব জীবনের নীলনকশা। জানা গিয়াছে, নূতন প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশের এই ‘জিনোম সিকোয়েন্সিং ল্যাব’ ব্যবহার করিয়া দেশের মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলি জিনোম সিকোয়েন্সিং হইতে রোগ অনুযায়ী চিকিত্সাধীন ব্যক্তিকে তাহার উপযোগী ওষুধ প্রয়োগ করিতে পারিবে। এমনকী অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োগও করা যাইবে অনেক বেশি নিখুঁতভাবে। আরো আশার কথা হইল, এই প্রযুক্তি শুরু হইবার পর চিকিত্সা খাতে সময় ও অর্থ—উভয়ই যেমন বাঁচিয়া যাইবে, তেমনি রোধ করা যাইবে জেনেটিক তথ্য পাচারও। হিউম্যান জিনোম সিকোয়েন্সিং-এর পাশাপাশি এই ল্যাবে ব্যাকটেরিয়ারও সিকোয়েন্সিং করা সম্ভব হইবে। তখন অ্যান্টিবায়োটিক চিকিত্সাও হইবে অনেক বেশি সুনির্দিষ্ট। অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার এবং অ্যান্টিবায়োটিকরোধী জীবাণুর দৌরাত্ম্যের লাগাম টানা সম্ভব হইবে অনেকটাই। কারণ, এখন রোগীর শরীরে গড়পরতা অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করা হয়। কিন্তু আলাদাভাবে জিনোম সিকোয়েন্স পাওয়া গেল তাহার জন্য যথাযথ ও সুনির্দিষ্ট অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করা সম্ভব হইবে। অর্থাত্ পার্সোনালাইজ মেডিসিন প্রয়োগ করা সহজতর হইবে।
বিজ্ঞানের এই বিস্ময়কর ‘জিনোম সিকোয়েন্সিং ল্যাব’ যেন আমরা সঠিক ব্যবস্থাপনায় যথাযথভাবে ব্যবহার করিতে পারি, তাহা নিশ্চিত করিতে হইবে।
