ছেলেবেলা থেকে শুনে এসেছি যে, সব তীর্থ বার বার গঙ্গাসাগর একবার। আর এই মেলায় কয়েক শ বছর ধরে মকরসংক্রান্তির দিন সাগরে সারা ভারত থেকে পুণ্যার্থীরা আসে এবং পুণ্যস্নানের সময় গোটা ভারতের তামাম সাধু-সন্ন্যাসীরা এসে হাজির হয়। এখানে কপিলমুনির একটি মন্দির আছে। সাধু-সন্ন্যাসীদের বিশ্বাস মকরসংক্রান্তিতে এখানে পুজো দিলে স্বয়ং ঈশ্বরের কাছে পৌঁছানো যায়। অবিভক্ত বাংলায় ছিল এই মকরসংক্রান্তির দিন পিঠে-পার্বণের উত্সব। স্বয়ং বঙ্কিমচন্দ্র লিখেছেন— এই দুর্গম পথ অতিক্রম করতে সেই সময়ে সাগরে পৌঁছতে পথের মধ্যেই অনেক পুণ্যার্থী মারা যেতেন। এবারের সাগর মেলায় সারা ভারতের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রায় ২৫ লক্ষ লোক এসেছিল। এবারে পুণ্যস্নানের সময় নিয়ে বিভ্রান্তি চরমে উঠেছিল। আগে যেতে হতো নৌকায়, তারপর স্পিড বোট বা লঞ্চ এলো। ৪০-৪৫ বছর আগে আমরা যখন জুনিয়র রিপোর্টার ছিলাম তখন রিপোর্টার ও ফোটোগ্রাফাররা সেখানে রিপোর্ট করতে যেতেন। আমার মনে আছে, কলকাতার অফিসে কয়েকজন রিপোর্টার ছিল। তাদের কাজ ছিল কত লোক মারা গেল কত লোক সাঁতার কেটে মন্দিরে পৌঁছাতে পারল তার রিপোর্ট করা। এবারে সাগর মেলায় এই রেকর্ড পরিমাণ ভিড়ের আর একটা কারণ হলো সারা দেশে আর তিন মাস পরে নির্বাচন। অনেক ভি.ভি.আই.পিরাও আসেন কপিলমুনির মন্দিরে পুজো দিতে।
কে এই কপিলমুনি? হিন্দু ধর্মের বিভিন্ন বইয়ে পাওয়া যায় যে, স্বয়ং কপিলমুনিই নাকি গঙ্গাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে এসেছিলেন সমুদ্রের সঙ্গে গঙ্গাকে যুক্ত করার জন্য। কলকাতা থেকে ১৩০ মাইল দূরে এই কপিলমুনির আশ্রম অবস্থিত, যেখানে গঙ্গা ও সাগরের মিলন হয়েছে। বরাবরের মতো এবারেও পুণ্যস্নানে অংশ নিয়েছিলেন মমতা মন্ত্রিসভার একগুচ্ছ মন্ত্রী।
কয়েক বছর আগে মোরারজি দেশাই যখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তখন তিনিও গঙ্গাসাগরে এসে কপিলমুনির আশ্রমে পুজো দিয়েছিলেন। এবার একই সময় পড়েছিল প্রয়াগে কুম্ভ মেলা। এই কুম্ভমেলায় যোগ দিয়েছেন মোদী সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী এবং উত্তর প্রদেশের গেরুয়া সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী। এসেছিলেন কিছু আমলাও। পুণ্য করতে এসে গঙ্গাসাগরে হূদরোগে মারা গেছেন ৪ জন আর অসুস্থ হয়েছেন ৪০ জন।
এবার মেলায় অর্থাত্ গঙ্গাসাগরের পুণ্যক্ষেত্রে দেখা গেল মিনি ভারতকে, মহামানবের মিলনস্থল হয়ে উঠেছিল সাগরতট। ভাষা, ধর্ম, বর্ণ, জাত-পাত, ধনী-দরিদ্র, উঁচু-নীচু, সাধক ও সাধুর—কোনো ভেদাভেদই লক্ষ করা গেল না। সাগরতট হয়ে উঠেছিল এক চলচ্ছবি। কেউ বার বার ডুব দিয়ে মন্ত্র পড়ছেন, কেউ বালির ওপর দ্লী কাটছেন, কেউ-বা নেচে নেচে কীর্তন করছেন, শুধু তাই নয় পরকালের জন্য পুণ্য সঞ্চয় করার তাগিদে কেউ কেউ সাধু-সন্ত এমনকি গরুর পায়ে প্রণাম করে প্রণামী দিতে ব্যস্ত হয়েছেন।
এবারে সাগরে পুণ্যস্নান নিয়ে সাধু-সন্তদের মধ্যে বিভ্রান্তি দেখা গিয়েছিল। কী সেই বিভ্রান্তি? বিভ্রান্তি হলো পুণ্যস্নানের সময় এবং দিন নিয়ে। কারো মতে, পুণ্য স্নান ১৪ জানুয়ারি, আবার কারো মতে ১৫ জানুয়ারি। তবে ১৫ জানুয়ারি ১২টার আগে এই পুণ্যস্নানের সময় শেষ হচ্ছে সে বিষয়ে সবাই মোটামুটি একমত ছিল। সাগরবেলার ঝাউবনের সারি ধরে এগোনোর সময় দেখা মিলল বিভিন্ন রাজ্য থেকে আসা নানা মানুষের সঙ্গে। হরিয়ানার ঝিন্দের এক বাসিন্দা ২০-২৫ জনের দল নিয়ে এসেছেন সাগর স্নান করতে। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, শুক্রবার অনেক রাতে তারা এসেছেন। থাকার জায়গা না পাওয়ায় ৪ নম্বর ঘাটের কাছে একটি ঝুপড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন তারা। মকর-সংক্রান্তির স্নান কবে সে বিষয় এরাও বিভ্রান্ত। এরা নানা জনের কথা শুনে বেশ বিভ্রান্তিতে পড়েছেন। ১নং ঘাটের কাছে দেখা গেল অনেকেই স্নান করে কপিলমুনির আশ্রমের দিকে চলেছেন পুজো দিতে। কপিলমুনির মন্দিরের বর্তমান অধ্যক্ষ জ্ঞানদাস মোহন্ত। তার কপালে তিলক, পরনে সাদা ধুতি, হাতে আধুনিক যুগের বৈদ্যুতিন যন্ত্র—ওয়াকিটকি। তিনি খুব ধৈর্য নিয়ে নানা জায়গা থেকে আসা ফোনের উত্তর দিচ্ছেন। শুধু তাই নয়, মন্দিরের ভেতরে এক পাশের খোলা জায়গায় যেখানে অতিথি হয়েছেন নানা জায়গা থেকে আসা সাধু, সন্ন্যাসী ও স্নানার্থী, তারা ঠিকমতো প্রসাদ পাচ্ছেন কিনা তারও তদারকি করছেন।
এবার ছিল দুইদিন স্নান। ১৪ জানুয়ারি সন্ধ্যে ৬টা ৯ মিনিট থেকে মকর-সংক্রান্তির স্নান শুরু হয়েছিল এবং চলেছিল ১৫ জানুয়ারি মঙ্গলবার সন্ধ্যে ৬টা ৯ মিনিট পর্যন্ত। জেলা শাসকের মেলা অফিস থেকে একটু গেলেই ভারত সেবাশ্রমের সংঘের আশ্রম। সেখানে ঢোকার মুখে একটি কাগজে লিখে সাঁটানো আছে পুণ্যস্নানের সময়। সেখানে ছিলেন ভারত সেবাশ্রমের সম্পাদক স্বামী জিতাত্মানন্দ মহারাজ ও জব্বলপুর থেকে আসা মহারাজ স্বামী ভূদেবানন্দ। স্নানের সময় নিয়ে পুণ্যার্থীদের মধ্যে যাতে কোনো বিভ্রান্তি না হয় সে জন্য তারা সতর্ক ছিলেন, স্বামীজির কথায়—মেলায় আসা লাখ লাখ মানুষের সেবায় ব্যস্ত ছিলেন তারা। তাই শুরুর দিনে গুরুর মূর্তির স্নানের সঙ্গে সঙ্গে সংঘের সন্ন্যাসী থেকে কয়েকশ সেবাকর্মী ও ভক্তদেরও সাগরে ডুব দিয়ে শুদ্ধ হতে হয়। মকরের স্নানের সময় ছিল প্রাচীন পঞ্জিকামতে মঙ্গলবার ১৫ জানুয়ারি ভোর থেকে দুপুর ১১টা ৪৭ মিনিট পর্যন্ত। আর মোক্ষ লাভের স্নানের সময় হলো পৌনে ৮টা থেকে সোয়া ৯টা পর্যন্ত। বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত মতে, ১৪ জানুয়ারি সকাল ১১টা ৪৫ মিনিটের পর স্নান শুরু, এদিকে জেলা প্রশাসনের অফিস থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল ১৫ জানুয়ারি সকাল ১১টা ৪৭ মিনিট থেকে সন্ধ্যে ৭টা ৪৪ মিনিট পর্যন্ত স্নান চলবে, এভাবেই এবার সাগর মেলায় পুণ্যস্নানের সময় নিয়ে মেলা জুড়ে নানা প্রশ্ন চারদিকে উচ্চারিত হচ্ছিল।
এখন আর বঙ্কিমযুগ নেই। মেলায় যাবার পথে বাঘ বা সাপের আক্রমণে মানুষ মরে না। তাই কোনো নবকুমারেরও প্রয়োজন নেই। তার বদলে এসেছে আধুনিক যন্ত্র মোবাইল। এখন একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক যুগ, মেলা প্রাঙ্গণে সাধু সন্ন্যাসী থেকে শুরু করে ভক্তদের হাতেও মোবাইল ফোন। সব জায়গায় বসানো হয়েছে সিসি টিভি, পুণ্যস্নানে ওপরে ঘুরছে হেলিকপ্টার ও ড্রোন, স্নান শেষে অনেকেই মনে করছেন, তার স্নান সার্থক হয়েছে। কপিলমুনি তাদের আশা পূর্ণ করবেন। তবে তাদের কী আশা তা তারা কেউ প্রকাশ্যে বলেননি। পুণ্যস্নানে এ দৃশ্যও দেখা গেল স্ত্রী যখন সাগরে পুণ্যলাভের জন্য ডুব দিচ্ছে, তখন স্বামী মোবাইল ফোনে সেলফি তুলছে এবং সেটা গোটা দুনিয়ায় পোস্ট করছে। সব মিলিয়ে কোলকাতা থেকে ১৩০ মাইল দূরে পুণ্যার্থীদের খুব একটা অসুবিধা হয়নি। কারণ সরকারি ব্যবস্থা ছিল সুষ্ঠু।
কোলকাতা থেকে ৭০০ মাইল দূরে ছিল অর্ধকুম্ভ মেলা, সেখানেও এক অপূর্ব রূপ। ভোর চারটে, পুণ্যভূমির সে এক ব্রাহ্মমুহূর্ত, কয়েকশ মাইকে চলছে তখন বৈদিক মন্ত্র উচ্চারণ। মাঝে মাঝে জল থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখার কথাও ঘোষণা করা হচ্ছে। আকাশে টহল দিচ্ছে নিরাপত্তা কর্মীদের হেলিকপ্টার। তীব্র শীতকে অবজ্ঞা করে হাঁটুজলে দাঁড়িয়ে পুণ্যার্থীরা পুণ্যলাভের মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষায় রত। মাইকেই ঘোষণা করা হলো সঠিক সময়। সঙ্গে সঙ্গে শীতে কম্পিতকণ্ঠে লক্ষ লক্ষ মানুষ ধ্বনি তুলল, “হর হর মহাদেব”। গঙ্গা, যমুনা ও পুরাকালের নদী সরস্বতীর সঙ্গমস্থলে ডুব দিলেন পুণ্যার্থীরা। তাদের চোখে-মুখে এক পরম প্রাপ্তির প্রত্যাশা।
n লেখক: ভারতীয় প্রবীণ সাংবাদিক
