ভোর দেখার স্বপ্ন

আপডেট : ১৭ জানুয়ারি ২০১৯, ২১:৪৯

একটি ভালো স্কুলে ছেলে-মেয়েকে পড়ানোর জন্য মধ্যবিত্ত পরিবারের দুশ্চিন্তার শেষ নেই। আমি ব্যক্তিগতভাবে নিজের দর্পণে এটা দেখতে পাই, সেই আয়নায় দেখি আরো শত-সহস্র মা-বাবার উদ্বিগ্ন মুখ। যেমন, কদিন আগে আমার ছেলে ঢাকার একটি নামকরা স্কুলে ভর্তি পরীক্ষা দেয়। স্কুলটি আমার আর ওর বাবার হাসপাতালের কাছে। পরিবেশ অসাধারণ সুন্দর। মর্নিং শিফটের স্কুল।

আর সকল বাবা-মায়ের মতো আমারও মনে হয়েছে—আহা, আমার বাচ্চাটা যদি এখানে চান্স পায় কতই না ভালো হয়! তার আগের স্কুলটাও দারুণ ভালো, আপডেটেড, বাচ্চা একটু দেরি করে স্কুলে গেলেও সাথে সাথে এসএমএস। পরীক্ষা, ক্লাস, রুটিন—সব ডিজিটাল উপায়ে জানিয়ে দেয়। টিচাররাও অসাধারণ। শুধুমাত্র ডে শিফটের জন্য আমার একটু কষ্ট স্কুলটা ঘিরে। স্কুল শুরুই হয় বারো কি সাড়ে বারোটায়। যে বাচ্চার স্কুল মধ্য দুপুরে, সে বাচ্চা কেনো ভোরে ঘুম থেকে উঠবে? কোনোদিন ছেলে আগে জেগে গেলে বলে, মা চলো সকাল দেখি। আহা, মা-ছেলের সকাল দেখা! সে যে কী অপার্থিব আনন্দ! আর ভোরের অপার্থিব আলোয় যদি মন রাঙানো না গেল, সে আলোর কবিতাই বা লিখবে কী, গানই বা গাইবে কী? কিংবা ছবিইবা কী আঁঁকবে? খুব আক্ষেপ আমার, আমার বাচ্চা ভোর দেখে না, সকালের মায়া দেখে না, সূর্যের লাল আলো গায়ে মাখে না, নাগরিক সুখের শহরে পথ ভুলে ঢুকে পড়া দোয়েলের গান শোনে না।

কুটুস ওই মর্নিং শিফটের স্কুলে ভর্তি পরীক্ষা দিলো। পরেরদিন বুদ্ধিজীবী দিবস, সে গেল বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে, বিজয় দিবসের ছুটিতে নানাবাড়ি। গ্রামের বাড়ি তার ভালো লাগে। এমনিতেই বার্ষিক পরীক্ষার পর অ্যাডমিশন টেস্টের জন্য বাড়তি পড়তে হয়েছে। আমার পেঙ্গুইন থাকুক কয়েকদিন গ্রামে। গাড়িতে ফিরতে ফিরতে আমাদের মন খারাপ হয়। খালি খালি লাগে।

গত দুই তিনদিন নেট দেখা হয়নি। ছেলের বাবা নেট খুলতেই দেখে ছেলে রিটেনে চান্স পেয়েছে! কিন্তু ভাইভা ওইদিন দুপুর একটা থেকে দুটোর মধ্যে! এখন সময় দেড়টা, ছেলে তো নানাবাড়ি, মুন্সিগঞ্জ। হায় হায়, এখন উপায়? স্কুলে দুজন টিচারের সাথে কথা হলো। ওই গতানুগতিক যা বলে আরকি, পরীক্ষা তো হয়ে গেছে, আগে আসবেন না? শেষ চেষ্টা হিসেবে প্রিন্সিপালের রুম। ওই একই কথা। তারপর কি মনে হতে যেন বললেন, আমরা ক্লাশ ফাইভের ভাইভা নেব তিনটা থেকে চারটা পর্যন্ত। এরমধ্যে যদি বাচ্চা আনতে পারেন, তাহলে ওর ভাইভাটা কনসিডার করে নিতে পারি।

এই একটা কথায় দমটা ফিরে এলো যেন। পরক্ষণেই মনে হলো, যেতেই তো লাগবে দেড় ঘণ্টা! গাড়ি ছুটছে, ছুটছে। শক্ত হয়ে বসে আছি, মনে মনে দোয়া পড়ছি, পুরনো অনেক কথা মনে পড়ে যাচ্ছে...।  পৃথিবীর আজব নিয়মে প্রাণের টুকরো বাচ্চাকেও পড়াশোনার কম্পিটিশনে পাঠাতে হয়, পাঠাই। গুটিগুটি হাতে লেখা শেখে, অঙ্ক কষে, প্রনাউন্সিয়েশন ঠিক রেখে ইংরেজি পড়ে। দিগদারির কী শেষ আছে? পড়াশোনাটা খেলাচ্ছলে একটু করে, তাতেই ধন্য হয়ে যাই। বাকিটা পরেই করুক। জানি একসময় ঠিকই করে নেবে। ইচ্ছে হলে ছবি আঁঁকে, গান গায়, সাইকেল চালায়। তারপরও কখনো কখনো ভোরের আলোর জন্য মন কেমন করে। সময়ে অসময়ে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে পড়ে অনিচ্ছায়। ইশ, বাচ্চাটাকে একটা মর্নিং শিফট স্কুলে দিতে পারতাম! একসাথে মা ছেলে মিলে সকাল দেখতাম! যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভার পার হলাম উড়ে উড়ে। কাঁচপুর ব্রিজের গোড়ায় কিছুটা জ্যাম, নতুন ব্রিজের কাজ চলছে। তারপর মদনপুর।

আমার বাচ্চাটা মাত্রই খেতে বসেছিল, খাওয়া রেখেই চলে আসতে হচ্ছে। স্কুলে যখন ফিরে আসি তখন চারটে বাজতে তিন মিনিট বাকি। উফফ! আল্লাহ! কুটকুটের ভাইভা খুবই ভালো হয়েছে। ফটাফট ম্যাথেমেটিকস বানান লিখল, ত্রিভুজ কাকে বলে বলল, বৃত্ত এঁকে দেখাল এবং বৃত্তের মধ্য বিন্দুকে কি বলে, সেটাও বলে দিল। আরোও কত কি! টিচার ভেরিগুড বলে আদর করে দিল।

বাসায় ফিরতে ফিরতে ভাবছিলাম, দেশ আসলেই এগিয়ে গিয়েছে। যোগাযোগ ব্যাবস্থার উন্নতি, ডিজিটাল ব্যবস্থার সুস্থ প্রয়োগ মানুষের জীনবকে সহজ করে দিয়েছে। মানুষ এখন অসম্ভবকে সম্ভব করতে স্বপ্ন দেখে। আসলে স্বপ্ন দেখতে হয়। হোক সেটা ভোর দেখার স্বপ্ন কিংবা হিমালয় জয়ের, স্বপ্ন! পেঙ্গুইনের মায়ের স্বপ্ন সত্যি হয়েছে। আরো এমন হাজার হাজার পেঙ্গুইন মায়ের স্বপ্ন সফলে বর্তমান সরকারের ছোঁয়া লেগে থাকুক।

লেখক : চিকিত্সক, স্ত্রী ও প্রসূতিবিদ্যা বিশেষজ্ঞ