রাজধানীর গুলিস্তানের ফুলবাড়িয়া মার্কেটে নকশাবহির্ভূত অবৈধ দোকান উচ্ছেদ অভিযান শুরু করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। গতকাল মঙ্গলবার সকালে ডিএসসিসির ভ্রাম্যমাণ আদালত পূর্বঘোষিত অভিযান শুরু করতে গেলে মার্কেটের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন ব্যবসায়ীরা। পরে বেলা ১টার দিকে মার্কেটের নগর প্লাজার সামনের ফুটপাতে থাকা দোকান ভাঙা শুরু করে ডিএসসিসি। এতে উত্তেজিত হয়ে ইটপাটকেল ছুড়তে থাকেন ব্যবসায়ীরা। এ সময় উভয় পক্ষে ধাওয়া-পালটা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরে কয়েক রাউন্ড টিয়ার শেল ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে পুলিশ। এ সময় সিটি করপোরেশনের দুই কর্মী আহত হন। এরপর পর্যায়ক্রমে অভিযান চলতে থাকে। মার্কেটটির অবৈধ ৯১১টি দোকানের মধ্যে ৩০০টি দোকান উচ্ছেদ করা হয়। উচ্ছেদ কার্যক্রম চলে বিকাল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত। আজ বুধবার সকাল ১১টা থেকে আবার উচ্ছেদ অভিযান শুরু হবে বলে জানিয়েছেন ডিএসসিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা আবু নাসের।
সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, ডিএসসিসির মালিকানাধীন এ মার্কেটটির এ বি ও সি ব্লকে (সিটি প্লাজা, নগর প্লাজা ও জাকের প্লাজা) নকশার বাইরে গিয়ে লিফট, সিঁড়ি, টয়লেটের জায়গা দখল করে ৯১১টি দোকান গড়ে তোলা হয়েছে। এর মধ্যে সিটি প্লাজায় ৩০৮টি, নগর প্লাজায় ২৯২টি ও জাকের প্লাজায় ৩১১টি অবৈধ দোকান গড়ে তোলা হয়। নতুন মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস দায়িত্ব নেওয়ার পর এই বিপণিবিতানের নকশাবহির্ভূত দোকান এবং এর সার্বিক পরিস্থিতি জানতে একটি কমিটি গঠন করেন। করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলীকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের এই কমিটি বিপণিবিতানে নকশাবহির্ভূত ঐ দোকানগুলো চিহ্নিত করে এবং সেগুলো উচ্ছেদের সুপারিশ করে। কমিটির সুপারিশে সম্মতি দিয়ে নকশাবহির্ভূত দোকানগুলো উচ্ছেদের নির্দেশনা দেন মেয়র। এরপর শুরু হয় অভিযান। তবে দোকানিদের দাবি, সাবেক মেয়রের সময় নকশাবহির্ভূত এসব দোকান বৈধ করতে তারা লাখ লাখ টাকা দিয়েছেন। এখন কোনো ধরনের নোটিশ ছাড়াই দোকান উচ্ছেদ করার জন্য এসেছেন সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ফুলবাড়িয়ার এই মার্কেটটিতে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ছিল ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সভাপতি দেলোয়ার হোসেন দেলুর। অভিযোগ রয়েছে, তিনি করপোরেশনের অনুমতি ব্যতীত অবৈধভাবে ঐ দোকানগুলো নির্মাণ করে বিক্রি করেন। এরপর বৈধতা দেওয়ার কথা বলে বছর বছর লাখ লাখ টাকা তোলেন। এ কাজে তাকে সহায়তা করেছেন ডিএসসিসির রাজস্ব বিভাগের একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা। বিভিন্ন সময়ে নগর ভবনের শীর্ষ পদে থাকা ব্যক্তিদের নানাভাবে ম্যানেজ করেই ফুলবাড়িয়া মার্কেটে নিজের সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন তিনি। গত বছর ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানকালে দেলোয়ার হোসেন দেলুর আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতারা গ্রেফতার হওয়ার পর মার্কেটে তার নিয়ন্ত্রণ কমে যায়। এ ব্যাপারে জানতে ইত্তেফাকের পক্ষ থেকে দেলোয়ার হোসেন দেলুর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে একটি সূত্র জানায়, তিনি বর্তমানে মালয়েশিয়ায় রয়েছেন।
সিটি প্লাজার ভুক্তভোগী দোকানদার মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘১০ লাখ টাকা দিয়ে দুই হাতের এক শাটারের একটি দোকান কিনেছি। পরে এই দোকান স্থায়ী করে দেওয়ার কথা বলে দেলু আরো ১০ লাখ টাকা নেন। কিন্তু এখন দোকান উচ্ছেদ করা হচ্ছে। করোনার থাবায় দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা মন্দা। এখন উচ্ছেদ করে দিলে পরিবার নিয়ে আমাকে রাস্তায় থাকতে হবে।’
আরেক দোকানদার রাফসান আহমেদ বলেন, ‘১৫ লাখ টাকা দিয়ে অস্থায়ীভাবে আমি দোকান নিয়েছি। এখন কেন ভাঙচুর হবে?’ কাকে টাকা দিয়েছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এককভাবে কেউ টাকা নেয়নি, এখানে মার্কেটের ব্যবসায়ী নেতারা আছেন, সিটি করপোরেশনের লোকজন আছে। আমি প্রায় সাত বছর আগে দোকান নিয়েছি।’
সিটি প্লাজা মার্কেট মালিক সমিতির যুগ্ম সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘আমরা অন্তত শীতের মৌসুমটা ব্যবসা করার সুযোগ চেয়েছিলাম। করোনায় এমনিতেই দীর্ঘদিন সবার ব্যবসা বন্ধ ছিল। অল্প কিছুদিন সময় পেলেও সবার উপকার হতো।’
এ বিষয়ে সিটি করপোরেশনের প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা রাসেল সাবরিন বলেন, নকশার বাইরে গিয়ে দোকানগুলো গড়ে তোলা হয়েছে। অবৈধ দোকান উচ্ছেদের আগে আমরা নোটিশ দিয়েছি। পর্যায়ক্রমে সব দোকান উচ্ছেদ করা হবে বলে তিনি জানান।
আরও পড়ুন: ঈশ্বরদীর রেলওয়ে স্কুল থেকে নাজিমউদ্দিনের নাম মুছে দিলো ছাত্রলীগ
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস বলেন, ‘যারা অবৈধভাবে জায়গা দখল করে দোকান তুলেছে তারা কাকে টাকা দিয়েছে সেটি আমাদের দেখার বিষয় নয়। যাদের অনুমোদন আছে তারাই এখানে ভালোভাবে ব্যবসা করবে। আমরা সেটি নিশ্চিত করব। পর্যায়ক্রমে আমরা সিটি করপোরেশনের সব মার্কেট থেকে অবৈধভাবে গড়ে তোলা সব দোকান উচ্ছেদ করব।’
১৬ হকার গ্রেফতার : এদিকে রাজধানীর বাদামতলী এলাকায় ফুটপাত দখল করে ব্যবসার অভিযোগে ১৬ হকারকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) লালবাগ ট্রাফিক বিভাগ। গতকাল বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ শহিদুল ইসলামের নেতৃত্বে এ অভিযান চালানো হয়। বাদামতলীসহ অন্যান্য এলাকার যানজট নিরসনে এমন অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার।
পুলিশ জানায়, ফুটপাত দখল করে বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করায় পথচারীরা সেখান দিয়ে স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারেন না। এসব হকারের কারণে পথচারী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাস্তায় নেমে চলাচল করেন। এতে যানবাহন চলাচল ব্যাহত হয়, অনেক সময় দুর্ঘটনাও ঘটে থাকে।
ইত্তেফাক এসি
