আগামী অক্টোবর মাসে অনুষ্ঠিতব্য আওয়ামী লীগের ২১তম জাতীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে গঠিত নতুন কমিটিতে দলীয় পদ পাচ্ছেন না মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী-উপমন্ত্রীরা। জাতীয় নির্বাচনে বিশাল বিজয়কে সুসংহত, সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে গতি আনা এবং সরকার ও দলের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার লক্ষ্যে এ পরিকল্পনা করা হয়েছে। দলীয় একটি সূত্র ইত্তেফাককে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
আওয়ামী লীগের নীতি নির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগামী দিনের বাংলাদেশের রাজনীতি ঘিরে আওয়ামী লীগকে শক্তিশালী সংগঠন হিসেবে তৈরি করতে চান আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। এ লক্ষ্যে দলীয় কাজ আর সরকারের কাজ যতটুকু সম্ভব আলাদা করার পরিকল্পনা আছে আওয়ামী লীগের। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ৭ জানুয়ারি গঠিত মন্ত্রিসভা নতুন আঙ্গিকে সাজানো হয়েছে। দলের অনেক সিনিয়র নেতা বাদ পড়েছেন। জাতীয় কাউন্সিলেও নেতৃত্বে বড় পরিবর্তন আনা হবে। যারা মন্ত্রিসভায় থাকবেন তাদের দলের গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হতে পারে।
গত ৮ জানুয়ারি গণভবনে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদ, উপদেষ্টা পরিষদ ও নবনির্বাচিত মন্ত্রিসভার সদস্যদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়কালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘নতুনদের মন্ত্রী বানিয়েছি—এরমানে এই নয় যে, পুরনোরা ব্যর্থ ছিলেন। পুরনোরা সফল ছিলেন বলেই দেশ আজ অনেক দূর এগিয়েছে। নতুনদের বানিয়েছি ভবিষ্যত্ প্রজন্মকে প্রস্তুত করার জন্য।’
দলের দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র জানায়, টানা ১০ বছর ক্ষমতায় থাকার কারণে অনেক এলাকায় উপদলীয় কোন্দল-রেষারেষিতে আওয়ামী লীগ সাংগঠনিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সরকারের কাজে দলের হস্তক্ষেপ বেড়েছে। ফলে দিবসভিত্তিক কর্মসূচির বাইরে সাংগঠনিক তত্পরতা কম। এ জন্য আগামী সম্মেলনের আগে দল ও সরকারের মধ্যে স্পষ্ট ব্যবধান রেখা টানতে চাচ্ছেন নীতিনির্ধারকেরা।
আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলীয় ফোরামের একাধিক আলোচনায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অসাধারণ আত্মত্যাগের ইতিহাস থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ত্যাগের কথা তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মানুষ দল ছাড়ে মন্ত্রিত্বের লোভে। আর জাতির পিতা মন্ত্রিত্ব ছেড়েছিলেন দলকে সংগঠিত করার জন্য। বাংলাদেশের পদ লোভী রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রেক্ষাপটে বিরল এই কাজটি বাস্তবিকই করেছিলেন বঙ্গবন্ধু।’ আজ থেকে ছয় দশক আগে ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হয়ে যুক্তফ্রন্ট সরকারের কৃষি ও বন মন্ত্রী হন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এরপর ১৯৫৬ সালে কোয়ালিশন সরকারের মন্ত্রিসভায় শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান তিনি। কিন্তু সংগঠনকে সুসংগঠিত করার উদ্দেশ্যে ১৯৫৭ সালের ৩০ মে বঙ্গবন্ধু মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদটিকে ধরে রেখে মন্ত্রিত্ব ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেন বঙ্গবন্ধু। আওয়ামী লীগের তিনজন সিনিয়র নেতা জানান, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের এটা চেতনার জায়গা ছিল যে, দল এবং সরকারি কাজ আলাদা হবে। দল ও সরকারি কাজ আলাদা হলে বেশ কয়েকটি লাভ হয়। এতে দল সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে, সরকারের ভুলত্রুটিগুলো ধরতে পারে। সরকারি কাজে যদি কোনো অনিয়ম বা অন্যায় করে সেটাও চিহ্নিত করতে পারে দল। আর সবচেয়ে বড় লাভ যেটি হয় সেটি হলো, সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক সংগঠনটিও শক্তিশালী হয়। আর সংগঠন না থাকলে আপনি যত বড় মন্ত্রী বা রাজনীতিবিদই হন না কেন, আপনার কোনো ক্ষমতা থাকে না। শুধু ক্ষমতাই নয়, রাজনীতিতে কোনো অস্তিত্বই থাকে না। এ কারণেই সংগঠনের স্বার্থে বঙ্গবন্ধু মন্ত্রিত্ব ত্যাগ করেছিলেন। দলের প্রতি তীব্র ভালোবাসা, দলের মঙ্গল কামনাই ছিল বঙ্গবন্ধুর এই সিদ্ধান্তের কারণ।
কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক ভাবে বিভিন্ন টানাপড়েনের জন্য পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ এই ঐতিহ্য বজায় রাখতে পারেননি। ২০১৪ সালে টানা দ্বিতীয়বারের মতো সরকার গঠন করার পর, বিশেষ করে আওয়ামী লীগের ২০তম জাতীয় সম্মেলনের পর থেকেই আওয়ামী লীগ কিছুটা হলেও দল ও সরকারকে আলাদা রাখার প্রক্রিয়াটি আবার বাস্তবায়ন করা শুরু করেছে। বর্তমান মন্ত্রিসভার দিকে লক্ষ্য করলে বোঝা যায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যাদের মন্ত্রিত্ব দিয়েছেন, দলের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের মতো হাতে গোণা কয়েকজন বাদে কেউই মন্ত্রিত্ব পাননি। সংগঠনটি শক্তিশালী হবে এমন প্রত্যাশা থেকেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের ৪ জন কেন্দ্রীয় নেতা দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক, আব্দুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক আফম বাহাউদ্দিন নাছিম, বিএম মোজাম্মেল হককে এমপি পদে মনোনয়নও দেননি।
আওয়ামী লীগের একজন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জানান, আমরা যদি পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের দিকে তাকাই তাহলে দেখবো, পশ্চিম বাংলায় দীর্ঘদিন বামফ্রন্ট ক্ষমতায় ছিল এবং দল ও সরকারকে আলাদা রাখার কৌশলটা তারা সফলতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করেছিল। যারা মন্ত্রিত্বে থাকতেন তারা দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে, বিশেষ করে কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে থাকতে পারতেন না। এছাড়া ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপির দিকে তাকালেও আমরা দেখি, বিজেপির সভাপতি অমিত শাহ কোনো ধরনের মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নেই। অন্যদিকে বিজেপির কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে নেই ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তবে আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের একটি অংশ মনে করছেন, ‘দলকে সরকার থেকে আলাদা করলে সুফল বয়ে আনবে না। দলের কারণেই তো সরকার ক্ষমতায়।’
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ঐক্যবদ্ধ ছিল বলেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ এ মহাবিজয় অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। আওয়ামী লীগের এই মহাবিজয়ে দলের দায়িত্বও অনেক বেড়ে গেছে। সরকারে যাতে দল হারিয়ে না যায়। দল যেন সরকারকে পরিচালনা করে। এজন্য দল থেকে সরকারকে যতটা সম্ভব আলাদা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ যত ঐক্যবদ্ধই থাকুক না কেন, সংগঠন হিসেবে আমাদের কিছু দুর্বলতা রয়েছে। রাজধানীতে যেমন রয়েছে সারাদেশেও তেমনি রয়েছে। নির্বাচনে বিজয়কে সুসংহত করতে হলে সাংগঠনিক এই দুর্বলতা দূর করতে হবে। দলকে সংগঠিত করার মাধ্যমেই আমরা আমাদের বিজয়কে সুসংহত করতে চাই। আওয়ামী লীগের এই সাংগঠনিক দুর্বলতা দূর করতে সমর্থ হলে বঙ্গবন্ধুর এই দল কখনো পরাজিত হবে না। দলের মধ্যে যে দুর্বলতা রয়েছে তা অতিক্রমযোগ্য।
২০১৬ সালের ২২ ও ২৩ অক্টোবর আওয়ামী লীগের ২০তম জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
