ধৈর্য একটি আলোকবর্তিকা

আপডেট : ১০ ডিসেম্বর ২০২০, ২০:২৩

সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নার মিশ্রণে আমাদের জীবনতরি বয়ে চলে। পাওয়া না পাওয়ার সমীকরণ চলতেই থাকে জীবন জুড়ে। কারো চাওয়া মাত্রই কাঙ্ক্ষিত বস্তুটি অর্জিত হয়ে যায়। কারো একটি জীবন পেরিয়ে যায় না পাওয়ার বেদনাকে সঙ্গী করে। এভাবেই জীবনরবি একসময় ডুবে যায় শত স্বপ্ন বুকে নিয়ে। এই যে পাওয়া না পাওয়ার সমীকরণ, এই যে অধরা স্বপ্নের করুণ পরিণতি এ ক্ষেত্রে কালজয়ী জীবনাদর্শ ইসলাম কি বলে? 

শত চেষ্টার পরেও যখন কাঙ্ক্ষিত বস্তুটি না মেলে, হতাশারা যখন মিছিল করে এসে হূদয় জমিনকে দুমড়ে মুচড়ে দেয় স্বভাবধর্ম ইসলাম তখন আহত হূদয়ে সান্ত্বনার প্রলেপ মাখিয়ে দেয়। প্রচণ্ড দাবদাহে এক পশলা বৃষ্টি উপহার দেয়। এই যে বিপদ-আপদ একের পর এক আসতে থাকে, কখনো ভয়, কখনো ক্ষুধা, কখনো বা নানাবিধ সংকটে আমাদের জীবন বিষিয়ে ওঠে। এগুলো কেন আসে? কেন আল্লাহতায়ালা আমাদের ওপর বিপদ চাপিয়ে দেন?

মানবজাতির মুক্তির লক্ষ্যে নাযিল হওয়া ঐশিগ্রন্থ পবিত্র কুরআন মজিদে এর সঠিক দিক নির্দেশনা রয়েছে। বিপদ আপদে একজন মুমিনের দৃষ্টিভঙ্গী কেমন হবে—এ বিষয়ে রয়েছে কালজয়ী পথপ্রদর্শন। ইরশাদ হয়েছে ‘আর আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব (কখনো) কিছুটা ভয়-ভীতি দ্বারা, (কখনো) ক্ষুধা দ্বারা এবং (কখনো) জান-মাল ও ফল-ফসলের ক্ষয়ক্ষতি দ্বারা। সুসংবাদ শোনাও তাদেরকে, যারা (এরূপ অবস্থায়) সবরের পরিচয় দেয়। যারা তাদের কোনো বিপদ দেখা দিলে বলে ওঠে, ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। অর্থাত্ আমরা সকলে আল্লাহরই এবং আমাদেরকে তার কাছেই ফিরে যেতে হবে’। (সুরাতুল বাক্বারা : ১৫৫- ১৫৬) এ দুটো আয়াত থেকে আমরা পরিষ্কার বুঝতে পারি—জীবনজুড়ে বিপদাপদের আগমন এটা একজন মুমিনের প্রতি আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে পরীক্ষা। এসব প্রতিকূল পরিবেশে একজন মমিন সব সময় ধৈর্যের পরিচয় দেবে। আর সবর হচ্ছে ‘দুঃখ বেদনা সত্ত্বেও আল্লাহতায়ালার প্রতি কোনো অভিযোগ না তোলা; বরং আল্লাহতায়ালার ফায়সালার প্রতি বুদ্ধিগতভাবে সন্তুষ্ট থাকা’।

আমাদের জীবনে দুঃখ কষ্ট একের পর এক আসতেই থাকবে। এতে বিচলিত হওয়া যাবে না। হতোদ্যম হয়ে হাল ছেড়ে দেওয়া যাবে না। বরং পাহাড়সম ধৈর্য ও দৃঢ়তার পরিচয় দিতে হবে। ইস্পাত কঠিন মনোবল নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে হবে।

ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনগন! সবর অবলম্বন কর, (ইসলামের শত্রুদের সঙ্গে) মোকাবিলার সময় অবিচলতা প্রদর্শন কর এবং সীমান্ত রক্ষায় স্থিত থাক। আর আল্লাহকে ভয় করে চল, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার। (সুরা আল ইমরান : ২০০)

দৃপ্ত কণ্ঠে কুরআন ঘোষণা দিয়েছে, যারা ঈমান এনে তাকওয়ার পথে অটল অবিচল থেকে সবরের পরিচয় দিয়েছে বিজয়মালা তাদের গলায়ই শোভা পেয়েছে। চূড়ান্ত সফলতা তাদের কপালে চুম্বন করেছে। তারা নেতৃত্বের আসনে সমাসিন হয়েছেন।

ইরশাদ হয়েছে, ‘আর আমি তাদের মধ্যে কিছু লোককে, যখন তারা সবর করল, এমন নেতা বানিয়ে দিলাম, যারা আমার নির্দেশ অনুসারে মানুষকে পথপ্রদর্শন করত এবং তারা আমার আয়াতসমূহে গভীর বিশ্বাস রাখত। (সুরা সাজদা : ২৪) এ আয়াতে আল্লাহতায়ালা সবর তথা ধৈর্যকে নেতৃত্ব লাভের উপায় বলে সাব্যস্ত করেছেন। যারা জীবন জুড়ে সবরের পরিচয় দেয় সফলতা ও নেতৃত্ব তাদের কাছে টেনে নেয়। এটাই আল্লাহ তায়ালার শাশ্বত নিয়ম। যেখানেই তাকওয়া ও সবরের সম্মিলন সেখানেই সফলতার স্ফুরণ।

ইরশাদ হয়েছে, ‘প্রকৃতপক্ষে যে ব্যক্তি তাকওয়া অবলম্ব্বন করে ও ধৈর্য ধারণ করে, আল্লাহ এরূপ সত্কর্মশীলদের প্রতিদান নষ্ট করেন না। (সুরা ইউসুফ : ৯০) ধৈর্য যেমন পার্থিব জীবনে সুফল বয়ে আনে আখেরাতেও এর সুফল বিস্তৃত। সীমাহীন সওয়াব ও নেকির পাহাড় অর্জিত হয় এই সওয়াবের মাধ্যমে। ইরশাদ হয়েছে, ‘যারা ধৈর্য ধারণ করে তাদেরকে তাদের সওয়াব দেওয়া হবে অপরিমিত। (সুরা যুমার :১০) তাইতো হযরত হারেস ইবনে আসেম আশআরি রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন—‘ধৈর্য হচ্ছে একটি আলোকবর্তিকা’। (সহিহ মুসলিম :১/২০৩) এ ছাড়া বিপদাপদের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা মুমিনের গোনাহ মিটিয়ে দেন। তার মর্যাদা সুউচ্চ করেন। হযরত আবু সাঈদ ও আবু হুরাইরা (রা) যৌথভাবে হাদিসটি রেওয়ায়েত করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন—মুসলমানের যত দুঃখ কষ্ট, অসুস্থতা, দুশ্চিন্তা, পেরেশানি, বিপদাপদ আসুক না কেন এমনকি পায়ে যদি সামান্য কোনো কাঁটাও বিদ্ধ হয় এতেও আল্লাহ তার গোনাহ মিটিয়ে দেন। (সহিহ বুখারি :১/৫৬৭৭ সহিহ মুসলিম: ৪/১৯৯৪)

সুবহানাল্লাহ! একজন মুসলমানের জন্যে এটা কত সান্ত্বনার!  কত প্রশান্তির! সামান্য দুঃখ কষ্টও বৃথা যায় না। এতেও আল্লাহতায়ালা মুমিনের গোনাহ মাফ করে দেন। সুতরাং একজন মুমিন কোনো অবস্থায়ই হতোদ্যম হতে পারে না।

lলেখক :মুহাদ্দিস,  তারাব সিরাজুল উলুম আরাবিয়া মাদরাসা ঢাকা।

খতিব, নোয়াপাড়া বাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, রূপগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ