বিনয় মজুমদারের কবিতা

আত্মমুখী বোধের আধার

আপডেট : ১০ ডিসেম্বর ২০২০, ২০:৩৪

রবীন্দ্রনাথ-জীবনানন্দ পরবর্তী আধুনিক বাংলা কবিতার উজ্জ্বল কবি বিনয় মজুমদার। কবিতায় গণিত ও বিজ্ঞানের যুক্তি উপস্থাপন এবং নিজস্ব কাব্যভাষা বিনির্মাণ করে বোদ্ধাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন পঞ্চাশের এই কবি। তিরিশের প্রধান কবি জীবনানন্দ দাশ উত্থাপিত ‘হূদয়ে কল্পনা ও কল্পনার ভিতরে অভিজ্ঞতা ও চিন্তার সারবত্তা রয়েছে’ বক্তব্যটি বিনয় মজুমদারের কাব্যজীবনে শতভাগ সত্য বলে ধরে নেওয়া যায়। কবিতায় ভাষা প্রয়োগে বিনয় মজুমদারের যে মৌন ভঙ্গিমা—তা জীবনানন্দের কাব্যভাষাকে সমর্থন করে, তবুও বিনয়কে চিনতে বেগ পেতে হয় না মূলত তাঁর নিজস্ব শৈলীর কারণে। বিনয়ের কবিতাগুলো যেন স্বগতোক্তি কিংবা আত্মকথন, শান্তরস সিক্ত, তীব্র ব্যঞ্জনাধর্মী এবং গভীর অর্থ সঞ্চারী! এ বৈশিষ্ট্যের কবিতা আত্মমুখী বা ইনট্রোভার্ট কবিতা বলে স্বীকৃত। বিনয়ের ‘আর যদি নাই আসো’ কবিতা থেকে পাঠ নেওয়া যেতে পারে—

‘আর যদি নাই আসো, ফুটন্ত জলের নভোচারী

বাষ্পের সহিত যদি বাতাসের মতো না-ই মেশো,

সেও এক অভিজ্ঞতা; অগণন কুসুমের দেশে

নীল বা নীলাভবর্ণ গোলাপের অভাবের মতো

তোমার অভাব বুঝি; কে জানে হয়তো অবশেষে

বিগলিত হতে পারো; আশ্চর্য দর্শনবহু আছে

নিজের চুলের মৃদু ঘ্রাণের মতন তোমাকেও

হয়তো পাইনা আমি, পূর্ণিমার তিথিতেও দেখি

অস্ফুট লজ্জায় ম্লান ক্ষীণ চন্দ্রকলা উঠে থাকে,

গ্রহণ হবার ফলে, এরূপ দর্শন বহু আছে।’

কবিতাটির দর্শন উদ্ধারে একবার পাঠ করে ছেড়ে দিলে চলে না। কেননা, অন্যান্য কবির মতো বিনয়ের কবিতার বোধ আপাতসরল পথ অতিক্রম করে না। তাঁর কবিতা পাঠে নতুন চিন্তার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ ঘটে বিধায় তাঁর কবিতা গভীর পাঠ অভিনিবেশ দাবি করে। বাংলা কবিতার গতানুগতিক যে ভাষায় পাঠক অভ্যস্ত, বিনয়ের কবিতা তার ব্যতিক্রম। তিনি ভাষাকে ঘষে মেজে গণিতের সূত্রে দাঁড় করিয়েছেন। ফলে বিনয়ের কাব্যভাষা হয়ে উঠেছে স্বতন্ত্র। ‘আর যদি নাই আসো’ কবিতায় তিনি নিজের সঙ্গে নিজেই কথা বলেছেন এবং একটি সূত্র অনুযায়ী একটি আপাতসিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন বলে মনে হওয়া অযৌক্তিক নয়। ‘ফুটন্ত জলের নভোচারী’ যদি না ফিরে আসে, বাষ্পের সঙ্গে যদি বাতাসের মতো না-ই মেশে—ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কবির অভিজ্ঞতা তাঁর অন্তর্বয়ান কবিতাটির মূলসুর। বিনয় মজুমদারের কবিতায় বাক্য গঠন ও পোয়েটিক টার্মিনোলজির ব্যবহার থেকেও স্পষ্ট হয় তাঁর স্বতন্ত্র সত্তা। যেমন, কবিতায় ‘কী প্রকার’, ‘প্রকৃত প্রস্তাব’ জাতীয় শব্দবন্ধ সহজেই বিনয় মজুমদারকে অন্যান্য কবি থেকে পৃথক করে।

বিনয় মজুমদারের বহুল পঠিত কবিতাগ্রন্থ ‘ফিরে এসো চাকা’, গ্রন্থের প্রথম কবিতা ‘একটি উজ্জ্বল মাছ’। বিনয় মজুমদার যে ‘আত্মমুখী কবি’ তা এ কবিতাটির মধ্যেও উপস্থিত। কবিতাটির পাঠ নেওয়া যাক—

‘একটি উজ্জ্বল মাছ একবার উড়ে

দৃশ্যত সুনীল কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে স্বচ্ছ জলে

পুনরায় ডুবে গেলো— এই স্মিত দৃশ্য দেখে নিয়ে

বেদনার গাঢ় রসে আপক্ব রক্তিম হ’লো ফল।’

কবিতাটির একটি দৃশ্য : একটি উজ্জ্বল মাছ, উড়ে আবার ডুবে গেল। মাছটি উড়ল, সম্ভবত জলের তল থেকেই উড়ল, এবং জলেই আবার ডুবে গেল। কেমন সে জল? ‘দৃশ্যত সুনীল, কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে স্বচ্ছ জলে’। আসলে আপাতভাবে যে সমুদ্র নীল, তার জল, প্রকৃতপক্ষে, স্বচ্ছ। আলোর বর্ণালির নীল রঙের তরঙ্গ দৈর্ঘ্য কম হওয়ায় অন্যান্য রঙের তুলনায় জলে কম শোষিত হয়। গভীর ও শান্ত সমুদ্র তুলনামূলকভাবে বেশি নীল। এই নীলাভ রং আসলে ইলিউশন, আসলে ভ্রান্তি, প্রকৃত স্বচ্ছতার খোঁজ যেন বিনয়ের এই পঙিক্ততে। এর পরের অংশ পড়লে মনে হয় কিছু রহস্যের আভাস রয়েছে এ কবিতায় : ‘এই স্মিত দৃশ্য দেখে নিয়ে/ বেদনার গাঢ় রসে আপক্ব রক্তিম হ’লো ফল।’ প্রশ্ন জাগে, কোন সে স্মিত দৃশ্য? মাছটির জলে ডুবে যাওয়ার দৃশ্য। কিন্তু, স্মিত শব্দের অর্থ তো ঈষত্ হাস্যময়। একটি মাছের নিছক জলে ডুবে যাওয়ার দৃশ্যে বেদনার গাঢ় রসে ডুবে যাওয়ার মতো কী এমন আছে? মূলত, কবিতাটিতে ‘মাছটির বিপন্নতা ও মরালটির বিপন্নতা আলগোছে দেখলে একই ধরনের স্মিত ও লঘু দৃশ্য। কিন্তু, এর মধ্যেই আছে বেদনার মূল সুরটি। প্রকৃতির মধ্যেই যেন রয়েছে এই নিরন্তর অনিশ্চয়তা, সম্ভাব্য মৃত্যু, আর অবিরাম পলায়ন।’ কবিতাটিতে বিনয় যে চিত্র এঁকেছেন তাতে বিপন্ন চিত্তের সন্ধান মেলে। কবিতাটির মাঝেও লুকিয়ে আছে বিপন্নতা আর আসন্ন মৃত্যুর কথকতা।  

তাঁর ‘ফিরে এসো, চাকা-৫৫’ সংখ্যক কবিতাটির পাঠোদ্ধার করা যেতে পারে—

‘হূদয়, নিঃশব্দে বাজো; তারকা, কুসুম, অঙ্গুরীয়—

এদের কখনো আরো সরব সংগীত শোনাবো না।

বধির স্বস্থানে আছে; অথবা নিজের রূপে ভুলে

প্রেমিকের তৃষ্ণা দ্যাখে, পৃথিবীর বিপণিতে থেকে।’

কবিতাটিতে যৌথ চলনের অভিঘাতে সৃষ্ট বিচ্ছিন্নতাবোধে বিপর্যস্ত কবিমনের উপস্থিতি বুঝতে পারা যায়। বর্ণনায় মনে হওয়া অযৌক্তিক নয় যে, কবি তীব্র হতাশায় নিক্ষিপ্ত হয়েছেন। অথচ তাঁর কাব্যভাষ্যে বিষয়টি অবস্তুগত রূপেই ধরা পড়ে। কেননা, হূদয় বস্তুগত হলেও তার অনুভূতি অবস্তুগত। ফলে কবিতার সুর হয়ে উঠেছে তন্ময় ব্যক্তিগত, কিংবা মন্ময় বস্তুগত। বিনয় মজুমদারও কবিতার মাধ্যমে হূদয়কে সসম্ভ্রমে বুঝিয়েছেন, ‘নিঃশব্দে বাজো; তারকা, কুসুম, অঙ্গুরীয়—/ এদের কখনো আরো সরব সংগীত শোনাবো না’—কবির এ অভিব্যক্তি দারুণ মর্মপীড়া এবং অভিমানের পরিশীলিত বয়ান বলেই প্রতীয়মান হয়।

‘যে অন্তর্দাহ একজন কবিকে চিন্তার গভীরে নিয়ে যায়, তা টি এস এলিয়ট পাঠে যেমন পাওয়া যায়, তেমনি ফুটে ওঠে জীবনানন্দ দাশের কবিতায়ও। আবার একই প্রণোদনা স্পষ্টতর হয় বিশ শতকের পঞ্চাশ দশকের বিনয় মজুমদারের কবিতায়’ (বিনয় মজুমদারের কবিতা : প্রেম বিরহের ডিসকোর্স, বীরেন মুখার্জী)। বিনয়ের কবিতার গভীর পাঠে বোঝা যায়, তিনি ‘বিরহের জীবন’কে একটি সমীকরণে মেলাতে চেষ্টা করেছেন। বাস্তব আর বিরহকে মুুখোমুখি দাঁড় করিয়ে প্রেমের সত্যদর্শন খোঁজার চেষ্টা করেছেন। তাঁর কবিতার গভীর পাঠে একধরনের মনোবৈকল্যও ধরা পড়ে। জীবনের শেষভাগে রচিত কবিতায় তাঁকে কামোন্মাদ হতে দেখা যায়। তবে নারীবাদী চিন্তায় তাঁর জাগতিক সংকল্প প্রকাশিত হয় বিচ্ছেদের প্রজ্ঞারূপে। জৈবিক মিথুন-সত্তায় আক্রান্ত বিনয় মজুমদার না পাওয়ার তীব্রতর বেদনা শব্দমাধুর্যে উপস্থাপন করেন ঠিকই, কিন্তু তা অত্যন্ত নিচুস্বরে। আসলে কবিতা কোনো তুচ্ছ অলংকরণ নয়। কবিতা ভাবের উত্কর্ষতার ভেতরে গভীরভাবে প্রবেশ করার মতো একটি বিষয়, যা আমরা অতিক্রম করি অস্থির আবেগ থেকে ধ্যানের প্রশান্তির মধ্য দিয়ে। মূলত বিনয় মজুমদারের অদ্ভুত সংবেদনশীলতা তাঁর কবিতার রাজ্য জুড়ে স্পষ্ট। কবিতায় তিনি খুব নিচুস্বরে জীবনের আপক্ব বেদনার কথা তুলে ধরেছেন বললেও অত্যুক্তি হয় না।