আবর্ত

আপডেট : ১০ ডিসেম্বর ২০২০, ২০:৩৬

দুপুর না গড়াতেই সূর্যের গায়েপড়া মাখামাখি। কিছুক্ষণ আগেও নারকেল পাতার ঝিরঝির ছিল। এখন কেমন দম ধরে আছে। দেখতে দেখতে অবিশ্বাস্যরকম তোলপাড় করে তাণ্ডব শুরু। লরিবাজারের দোকানপাটগুলো সামনের দরজা-ঝাঁপ গুটিয়ে নিয়েছে। রাউত উকিলের উঁচু বারান্দায় মংলার বাবা কুঁচকানো শরীরটা আরো গুটিশুটি খাইয়ে বসে জুতো সেলাইয়ের বোর দিয়ে পুরনো শুকতলির সাথে টায়ার সোলটাতে ঘাই তোলে। সোলের তলায় বেরোনো বোরের কাটা দিকটায় মোমলাগানো সুতো গুঁজে বোরটাকে ওপরের দিকে তুলে আনে।

মংলার বাবা নিজের হাড়জিরজিরে শরীরটার দিকে তাকায়। কত হবে? বড়োজোর পঞ্চাশ-পঞ্চান্ন! একমুখ শাদা দাড়ির ভেতরে সেঁধিয়ে যাওয়া গাল আর জবুথবু শরীরে চোখ রাখলে ভাবাও যায় না—শ্মশান এখনো বুড়োটাকে দেখেনি! হেবরাজেবরা খদ্দরের চার পকেটঅলা জামাটার খয়েরি রং ঝলসে গেছে। বাতাসের ঝাপটায় শীতশীত ভাব। শীর্ণ কালো দুই হাঁটু ঠকঠকিয়ে কাঁপে। পোয়াতির তলপেটের মতো ড্রেনের বাড়ন্ত চেহারা দেখতে থাকে মাংলার বাবা। দেখতে থাকে মনের সুখে।

রাউতবাবুর বারান্দার ভিত ঘেঁষেই চলা ড্রেনের ওপর কয়েকটা তক্তা পেতে প্রতিদিন তার সংসার। চারকোনা কাঠের বাক্সে পুরনো চামড়ার টুকরো-টাকরা আর টুকিটাকিতে ভর্তি। তক্তার ওপর ছেঁড়া-ময়লা চট। তার ওপর হাতুড়ি-বাটালি, সাঁড়াশি, তিনপেয়ে লৌহদণ্ড, কালির কৌটো, ছড়ানো-ছিটানো পেরেক, বোর, দু-তিনটে ব্রাশ, প্লাস্টিকের কাটা জগ... নিজের ব্যবহারের টায়ারের চটিটা...

নর্দমা ছাপিয়ে রাস্তাও জলমগ্ন হতে শুরু করেছে। মংলার বাবা মটমট করে হাঁটুর ভাঁজ ভেঙে উঠে দাঁড়ায়। একলাফে রাস্তায় নামে। সকালের পাতা তক্তা, এটা-ওটা ভেসে যেতে শুরু করেছে। চটিটা ফেরায় তো কাঠের টুকরোটা ভেসে যায়। কোনোরকমে সামলে নিয়ে এগুলো বারান্দায় তুলে মটমট শব্দে হাঁটুর ওপর দু’হাতে ভর দিয়ে বসে। শাদা লোমে ছাওয়া হাঁটুর ওপর পর্যন্ত বেরিয়ে থাকা শীর্ণ পায়ে মাটাম দিয়ে চুলকাতে থাকে। কখনো বাঁ হাতে ঘাড়ের পেছনে থপাস করে অনাবশ্যক চড় বসায়। হাতের আঙুলে চুলকে নেয়।

মংলার বাবার বাঁদিক ঘেঁষেই বসে বড়ো ছেলে রামা। মহল্লার ছেলেছোকরারা নাম দিয়েছে রামরাম। অনাথবাবুর বিটলে ছেলে রাঙ্গা বলে—‘রামরামকে কত ছিলুম গাঁজা দিবেন...? রাতভর চুক্তি করে কল্কেভরে গাঁজা দিলেও মন ভরে না।’ তাই নাম দেওয়া হয়েছে রামরাম। দু’দিন হলো মংলার সত্ভাই রামরাম উধাও।

ব্রহ্মপুত্রের কূল ঘেঁষে বিপিন পার্কের বাঁ দিকের খালি জায়গায় অবাঙালি বস্তিতে টিনের টুকরো-টাকরা, ধারি-চাটাই পলিথিনে ছাওয়া ঝুপড়িতে থাকে মংলারা। একটাতে সোমত্ত বোন যুমনি। অন্যটায় বাকিরা।

ঠুনকো ব্রহ্মপুত্র পেট ফুলে তীর ছুঁয়েছে। বানে বুঝি এইবার দুনিয়াডারে তলাইয়া লইয়া যাইব...! নদীর নিশ্চলতা দেখছিল যুমনি। গুমোট রাতটাতে কেমন আতঙ্কের ছায়া! শিউরে ওঠার মতো একঝলক বাতাস। যৌবনের ঋদ্ধি হারিয়ে বসা ব্রহ্মপুত্রের হঠাত্ এমন প্রমত্তরূপে ফিরে যাওয়া শরীরটাকেই যেন আঁচলে সামলাতে ব্যস্ত যুমনি। কালো হলে কী, ধার কম না...! বনিবনা সুবিধে না হলে ফিরেও তাকায় না।

রাঙ্গা ক’দিন পিছু নিয়েছিল। অন্ধকারে পেলেই পকেট থেকে চিরুনি বের করে চুলে অনাবশ্যক চালিয়ে বলত—ও যুমনি, হামি তোরে হাছাহাছাই পেয়ার করে। তরে ঘরে লিয়া যাইবার চায়...।

মুখ ঝামটায় যুমনি—হ, বহুত দ্যাখা আছে... তোরা উঁচা জাত আছিস, আমরা নিচা আছি। তোগোর লগে হামাগোর কোনোদিন মিল খাইবে না...

ঝুপড়ির নিচে ধ্রুপদ অন্ধকার। হঠাত্ কাঁধে শক্তপোক্ত হাত! চমকে ওঠে—‘ক্যাঠা?’

‘হামি রামা’

যুমনি ভয়ে আড়ষ্ট। বাতাস থুম ধরে আছে। পরপর দুবার ঝলকানি দিল আকাশ! গাছগুলো শোঁ শোঁ আওয়াজে দু’ধারে নুয়ে পড়ছে। প্রকৃতির শীত্কারে ঢাকা পড়ে যায় যুমনির চিত্কার...

টলতে টলতে ঝুপড়িতে ফিরবে রামরাম। কোমরে হাত দিয়ে দাঁডায় মংলা। দুম করে একটা ঘুষি এসে জবাব দেয় রামরামের নাকে। পটাপট আরো কয়েকটা তলপেটে। রামরাম তলপেট ধরে বসে পড়ে। তারপর উঠে দাঁড়ায়। কোমর থেকে বের করা চকচকে দু’ধারা ছোরাটা অন্ধকারেও ঝলসে ওঠে।

মংলার গুরুতর কিছু হয়নি। সেলাইয়ের ঘাঁ শুকায়নি। ঘরে শুয়ে আছে ক’দিন। আর, রামরাম? সে রাতেই গা ঢাকা দিয়েছে। কোথাও খোঁজ নেই। সীতারামের গাঁজার আসরে চুক্তি করে কেউ আর সারারাত কল্কে ধরে বসে থাকে না। যুমনি দু’দিন ধরে ঝুপড়িতে ফুলে ফুলে কাঁদছে। এরকম একটা ঘটনা এক ফুঁত্কারে জীবনটাকে নিভিয়ে দিল যেন। 

বৃষ্টিটা ঝিরঝির করে ধরে আসতে শুরু করে। তবুও রাস্তায়, নর্দমায়—জলের উচ্চতার তেমন তারতম্য নেই। মংলার বাবা হাঁটুর ভাঁজ ভেঙে উঠে দাঁড়ায়। একটা মশাকে লক্ষ করে তার কালো শীর্ণ পায়ে থপাস করে একটা থাপ্পড় বসায়। জায়গাটা চুলকায়। চেহারায় মেঘের গুমোট। মাটাম দিয়ে ঘাড় চুলকাতে চুলকাতে বিড়বিড় করে ওঠে—দুনিয়াডারে যদি বানের পানি ভাসায়া লয়্যা যাইত...

মংলার বাবা ভাবতে পারছে না—বৃষ্টি থামবে ঠিক। জলের স্বভাব থিতু হবে। রাউতবাবুর বারান্দার নিচে ড্রেনের মশা-মাছির সাথে তাকে আবার সংসার সাজাতে হবে। যুমনিটাও কেঁদেকেটে একদিন ঠিক হয়ে যাবে। আকাশে আবার তেতিয়ে রোদ উঠলে একদিন রামরামও ফিরে আসবে ঠিক। অভ্যাসবশে গাঁজার ছিলুম শেষ করে শূন্য কল্কেতে দম দিয়ে ঝিমুবে। ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে মংলাও চিনু ডাক্তারের ফার্মেসির কোণে এসে বসবে একরত্তি  সংসার সাজিয়ে। আবার বিপিননাথের গালাগাল শুনবে বায়না নিয়ে ঘোরানোর জন্য। নিরঞ্জনের মনিহারি দোকানে খদ্দেরের ভিড় জমবে। অনাথবাবুর চেম্বার থেকে বেরিয়ে অকালে বেঢপরকম বেড়ে ওঠা ঠিকা ঝিয়ের মেয়েটা নিরঞ্জনের দোকান থেকে সদাইপাতি নিয়ে পান খেয়ে ঠোঁট রাঙিয়ে ফিরবে। চিনু ডাক্তারের ভেজানো দরজার সামনে গুটিশুটি মেরে থাকা কুকুরটা তাড়া খেয়ে ‘কেউ...’ করে উঠবে।

আবার জেগে উঠবে লরিবাজারের এই এলাকাটা।