শত শত বছর ধরে বনে আপনা থেকেই জন্মায় বৃক্ষ, পুষ্টিকর নানান শাকসবজি ও ফলমূল। জীবজন্তুর অবাধ বিচরণক্ষেত্র বন। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী মোট বনভূমির পরিমাণ প্রায় ১৮ শতাংশ। দক্ষিণাঞ্চলের সমুদ্র উপকূলবর্তী সুন্দরবন, চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলের বনভূমি, ময়মনসিংহ, গাজীপুর ও টাঙ্গাইল জেলা এবং রংপুর ও দিনাজপুরের কিছু অঞ্চল। সুন্দরবন বাদ দিলে বন বলতে যা বোঝায় তা সামান্যই। ওয়ার্ল্ড রিসোর্সেস ইনস্টিটিউটের মতে, এর পরিমাণ মাত্র ৫ শতাংশ।
জনসংখ্যার চাপে বনভূমি ক্রমশই হ্রাস পাচ্ছে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে বনজ সম্পদ। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বনভূমির পরিমাণ নেমে আসায় এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়ছে আবহাওয়ায়। বাতাস দূষিত হচ্ছে, ক্ষয় হচ্ছে মাটি। পর্যাপ্ত বনভূমি না থাকায় অনাবৃষ্টি দেখা দিচ্ছে। যার ফলে নেমে যাচ্ছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ১৯৮৯ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত দেশে বনভূমি ধ্বংস করা হয়েছে মোট ৪ লাখ ১৬ হাজার ২৫৬ একর, যার মধ্যে ১ লাখ ৫৮ হাজার ৩১ হেক্টর বনভূমি বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং ২ লাখ ৬৮ হাজার ২৫৬ একর বনভূমি শিকার হয়েছে জবর দখলের। ক্রমবর্ধমান এবং অনিয়ন্ত্রিতভাবে বনভূমি ধ্বংসের কারণে এরই মধ্যে বন্যপ্রাণীর ৩৯টি প্রজাতি বাংলাদেশ থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে এবং রয়েল বেঙ্গল টাইগারসহ আরো প্রায় ৩০ প্রজাতির অস্তিত্ব মারাত্মক সংকটে রয়েছে, যা ক্রমে বনকেন্দ্রিক জীবনচক্র ও বাস্তুসংস্থানের জন্য অশনি সংকেত।
বনভূমি ধ্বংসের পাশাপাশি পরিবেশ আইন, ১৯৯৫ লঙ্ঘন করে নির্বিচারে শিল্পায়ন ও বিভিন্ন শিল্প বিশেষ করে ডায়িং কারখানা ও ট্যানারিগুলোর শিল্পবর্জ্য নদ-নদী, খাল-বিলসহ প্রাকৃতিক উন্মুক্ত জলাধারগুলোয় নিক্ষেপণের মাধ্যমে প্রাকৃতিক জলাধার বা জলজ জীববৈচিত্র্য ব্যাপকভাবে নষ্ট করা হচ্ছে। বন ও জলজ বাস্তুসংস্থানের ওপর অভিঘাতের সঙ্গে সাম্প্রতিক কয়েক দশকে বাংলাদেশে বায়ুদূষণ মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। পাশাপাশি কীটনাশকসহ অজৈব সারের যথেচ্ছ ব্যবহারে মাটির উর্বরাশক্তি রক্ষাকারী প্রাকৃতিক অনুজীবসহ শস্য ও সবজির ওপর নির্ভরশীল খাদ্যশৃঙ্খলের বিভিন্ন পাখি ও প্রাণী আশঙ্কাজনক হারে মরার কারণে মানুষের জীবন ও টেকসই জীবিকার ওপর হুমকি ক্রমাগত বেড়েই চলেছে।
জাতীয় অর্থনীতি ও পরিবেশের ভারসাম্য টিকিয়ে রাখতে দেশের বনজ সম্পদ সংরক্ষণ, সম্প্রসারণ ও বনজ সম্পদের উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি। আর বাংলাদেশে রয়েছে বনায়নের বিপুল সম্ভাবনা। এ সম্ভাবনাকে সুষ্ঠুভাবে কাজে লাগাতে হবে। এজন্যে করণীয়—১. দেশীয় অর্থকরী বৃক্ষ রোপণ, ২. বিনামূল্যে বীজ ও চারা সরবরাহ, ৩. নদীর কিনারা ও সড়কের দুপাশে গাছ লাগানো, ৪. বনভূমির গাছকাটা রোধ, ৫. অপরিণত গাছ কাটা বন্ধ করা বিশেষভাবে জরুরি।
সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বনায়নের জন্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির আওতায় সচেতনতা বাড়াতে জনগণকে দেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন মেয়াদে প্রশিক্ষণ। বিতরণ করা হচ্ছে চারা। তবে দেশীয় প্রজাতির গাছ নিশ্চিহ্ন করে সেখানে রাবার, সেগুন, আকাশিয়া প্রভৃতির শিল্প-বন তৈরি করা হচ্ছে। বিদেশি প্রজাতির গাছের সঙ্গে ক্ষতিকর অনেক কীটপতঙ্গ আসে। এ ধরনের গাছ মাটি থেকে পানি শোষণ করে নেয় বলে আশেপাশের জমিতে পানির পরিমাণ কমে যায়।
প্রাণীর অস্তিত্ব ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গাছপালার বিকল্প নেই। গাছ প্রস্বেদন প্রক্রিয়া ও বাষ্পীভবনের মাধ্যমে আবহাওয়া বিশুদ্ধ রাখে। তাই প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বনায়ন খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
ময়মনসিংহ
