g রেজাউল হক কৌশিক
ব্যাংক ব্যবসায় মূলভিত্তি আস্থা। সেবা দিয়ে আস্থা অর্জন করা ব্যাংকের অন্যতম উদ্দেশ্য থাকে। তবে নিয়মমাফিক সবকিছু চলে না। ব্যাংকের বিভিন্ন সেবা নিতে যেয়ে গ্রাহকরা নানারকম বিড়ম্বনায় পড়েন। হয়রানির শিকার হওয়ার ঘটনাও কম নয়। ব্যাংকগুলোর এমন আচরণ দিন দিন বাড়ছে। ব্যাংকের গ্রাহকরা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে তাদের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ করেন। তবে অনেক ক্ষেত্রেই সেসব অভিযোগ আমলে নেয় না ব্যাংকগুলো। আর প্রতিকার না পেয়ে তখন বাংলাদেশ ব্যাংকের শরণাপন্ন হন তারা। পরে অবশ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপে বেশিরভাগই সমাধান হয়।
অভিযোগ নিষ্পত্তি হওয়া বা না হওয়ার চেয়ে বড় বিষয় হলো সেবা নিশ্চিত হওয়া। গ্রাহকদের চাহিদানুযায়ী সেবা নিশ্চিত হলে অভিযোগের সংখ্যাও কমে যাবে। তবে গ্রাহকদের দিক থেকেও সচেতন হওয়ার বিকল্প নেই। ব্যাংকের গাফিলতির কারণে যেমন গ্রাহকরা ক্ষতিগ্রস্ত হন তেমনি আবার নিজেদের অসচেতনতার কারণেও ঘটে থাকে। বিশেষ করে, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং সেবায় নিজের পাসওয়ার্ড অন্যের সঙ্গে শেয়ার করলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংক গ্রাহকদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য এমন একটি সেবা চালু করলেও অনেক গ্রাহক এখনো এ বিষয়ে জানেন না। তারা বাংলাদেশ ব্যাংকে অভিযোগ করতে ভয় পান। এমনটা ভাবেন যে, সংশ্লিষ্ট ব্যাংক অনেক বেশি প্রভাবশালী এবং ওই ব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভালো সম্পর্ক আছে বিবেচনায় ব্যাংকের পক্ষে রায় যাবে। এমন বদ্ধমূল ধারণা থেকে অভিযোগও তোলেন না তারা। আবার টাকার পরিমাণ কম হলে নিজের ক্ষতি শিকার করে বিষয়টি চেপে যান।
পরবর্তীতে বাংলাদেশ ব্যাংকে হাজিরা দেওয়া বা বিষয়টি ঝামেলাপূর্ণ মনে করে অনেকে ছেড়ে দেন। একটি সমস্যা সমাধানে আর সময় ব্যয় করতে চান না গ্রাহকরা। তবে বিষয় হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের সঙ্গে কথা বলে সমাধান না হলে বাংলাদেশ ব্যাংকে অভিযোগ করাও একজন ভালো গ্রাহকের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে গ্রাহকরা যাতে ব্যাংকিং সমস্যা বা অভিযোগ জানাতে আগ্রহী হন সে বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা থাকতে পারে। গ্রাহকের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা কর্মকর্তাকে জরিমানা করা যেতে পারে। আর সেই জরিমানাকৃত অর্থের একটি অংশ গ্রাহককে দেওয়া যেতে পারে। রাষ্ট্রীয় একটি প্রতিষ্ঠানে এমন উদাহরণও আছে। এছাড়া এ বিষয়টির ব্যাপক প্রচারের ব্যবস্থাও করতে হবে বাংলাদেশ ব্যাংককে।
ব্যাংকিং সেবা হবে গ্রাহকবান্ধব। তবে সেটা না হয়ে গ্রাহকরা যে হয়রানির শিকার হচ্ছেন তা আসলেই দুঃখজনক। গ্রাহক হয়রানি বন্ধে অফিসার ও ডেস্কের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের ওপর জোর দিতে হবে। আধুনিক ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে গ্রাহক হয়রানি না করে তাদেরকে নতুন নতুন নানা সুবিধা দিয়ে সন্তুষ্ট না রাখতে পারলে ব্যাংকিং ব্যবস্থা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। ব্যাংকারদের সামাজিক মর্যাদা ও গ্রহণযোগ্যতাও কমে যাবে।
জানা গেছে, ব্যাংক ও ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকদের সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১১ সালের ১ এপ্রিল গ্রাহক স্বার্থসংরক্ষণ কেন্দ্র (সিআইপিসি) গঠন করে। পরিধি বাড়তে থাকায় পরে একে ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি অ্যান্ড কাস্টমার সার্ভিসেস (এফআইসিএসডি) নামে পূর্ণাঙ্গ বিভাগে রূপ দেওয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, সচেতনতা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে বাড়ছে অভিযোগ। ব্যাংকের সেবা পেতে কোনো ধরনের হয়রানি বা প্রতারণার শিকার হলেই গ্রাহকরা বাংলাদেশ ব্যাংকের এফআইসিএসডি বিভাগে অভিযোগ করছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে দেখা গেছে, সেবার বদলে উল্টো হয়রানির শিকার হওয়া গ্রাহকরা ব্যাংলাদেশ ব্যাংকে অভিযোগ করেছেন। ২০১৮ সালে ৫ হাজার ৭৩১ জন গ্রাহক বিভিন্ন প্রকার হয়রানির শিকার হয়ে এফআইসিএসডিতে অভিযোগ করেছেন। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে- চেক জালিয়াতি, অতিরিক্ত সার্ভিস চার্জ কর্তন, মিথ্যা তথ্য দিয়ে ব্যাংক থেকে অর্থ উত্তোলন, স্থায়ী আমানতের (এফডিআর) অর্থ ফেরত না দেওয়া, স্বীকৃত বিলের মূল্য পরিশোধ না হওয়া, ডেবিট ক্রেডিট কার্ড, রেমিট্যান্স, মোবাইল ব্যাংকিং, ঋণ ও অগ্রিম, নোটস ও কয়েনস, ব্যাংক গ্যারান্টি প্রভৃতি। গ্রাহক সেবা নিয়ে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংকে অভিযোগ এসেছিল তিন হাজার ৫২১টি।
২০১৮ সালে আসা অভিযোগের মধ্যে সাধারণ ব্যাংকিং সংক্রান্ত এক হাজার ৯৭২টি। ঋণ এবং অগ্রিম সংক্রান্ত ৭১৩টি, কার্ড সংক্রান্ত ৫০২টি, সার্ভিস সংক্রান্ত ৩৮১টি, রেমিট্যান্স সংক্রান্ত ৭৮টি, ফি ও চার্জ সংক্রান্ত ৯৮টি, চেক জালিয়াতি সংক্রান্ত ৩৬টি এবং মোবাইল ব্যাংকিং সংক্রান্ত ১০১টি। গতবছর আসা অভিযোগের মধ্যে ২ হাজার ৪০৪টি লিখিত অভিযোগ আসে। এছাড়া টেলিফোনে আসা অভিযোগ ছিল ৩ হাজার ৫৮টি এবং অনলাইনে প্রাপ্ত অভিযোগ ২৩৩টি। প্রাপ্ত অভিযোগের ৯৯ শতাংশই নিষ্পত্তি হয়েছে।
ছবি: ইন্টারনেট
