ঘরের কাজের মূল্যায়ন ও গৃহস্থালির কাজ নিয়ে বৈষম্যমূলক ধারনার অবসানে অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের আয়োজনে চ্যানেল ২৪-এর পর্দায় আয়োজিত হলো বিশেষ টকশো- 'ভিন্নরূপে পুরুষ-রান্না উৎসব ২০২০'-এর তৃতীয় ও শেষ পর্ব। নাভিদ মাহবুবের সঞ্চালনায় তিনদিন ব্যাপী টকশোর তৃতীয় ও শেষ পর্বে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক ও সংসদ সদস্য নাইমুর রহমান দুর্জয় এবং অ্যাকশনএইড ইন্টারন্যাশনালের পাওয়ার প্রজেক্ট-এর সাউথ এশিয়া কো-অর্ডিনেটর মো. হেলাল উদ্দিন।
অনুষ্ঠানে নাইমুর রহমান দুর্জয় বলেন, আমাদের মা-খালারা বা পরিবারের নারীরা হাসিমুখে প্রতিনিয়ত আমাদের খুশি রাখতে ঘরের কাজ করে থাকেন, প্রতিনিয়ত তাদের এই একই ধরণের কাজ করাকে আমার কাছে কষ্টসাধ্য মনে হয়। আমরা যদি ঘরের কাজকে নারীর বাধ্যবাধকতা থেকে বাইরে আনতে পারি, নারীদেরকে যদি বাইরের কাজে সম্পৃক্ত করতে পারি এবং একই সাথে একটি পলিসির মাধ্যমে তাদের এই ঘরের কাজকে, সেক্রিফাইসকে যদি অর্থনৈতিকভাবে বা সামাজিকভাবে মূল্যায়ন করা যায়, তাহলে তাদের কিছুটা হলেও সম্মানিত করা যাবে এবং এই সম্মানটা তাদের প্রাপ্য। এ সময় তিনি নিজের সম্পর্কে বলেন, ব্যক্তিগতভাবে ব্যস্ত থাকায় যদিও ঘরের কাজে খুব একটা সময় দেয়া সম্ভব হয় না, তবে অবসর সময়ে পরিবারের জন্য মাঝে মধ্যে রান্না করেন। ঘরের কাজ যে শুধু নারীর কাজ আমাদেরকে এই মন-মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
হেলাল উদ্দিন বলেন, নাইমুর রহমান দুর্জয়ের মতো জনপ্রিয় ব্যক্তিদের মাধ্যমে আমরা ভিন্নরূপে পুরুষ কর্মসূচিকে তুলে ধরতে চাইছি। আমরা এই কাজটি ২০১২ সালে শুরু করি দিনাজপুর, লালমনিরহাট এবং গাইবান্ধায়, আমরা প্রায় ৬ হাজার নারীদের সাথে কাজ করেছি এবং তারা বলেছেন যে, যখন তাদের স্বামীরা তাদেরকে ঘরের কাজে সহযোগিতা করেছেন তখন তাদের মধ্যে পারস্পরিক শেয়ারিংটা বেড়ে গেছে, আন্তরিকতা বেড়েছে এবং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যে দ্বন্দ্ব সেটা কমেছে। এই ব্যাপারটাই আমাদের লক্ষ্য ছিলো তারা যেনো একটি সুস্থ পরিবেশে থাকে এবং সেই পরিবেশে তাদের সন্তানরা বেড়ে উঠতে পারে।
তিনি আরো বলেন, পুরুষরা ব্যস্ততার কারণে ঘরের কাজে সময় দিতে পারছেন না, কিন্তু যারা করছেন তাদেরকে কিভাবে সকলের সামনে তুলে ধরবো সে চেষ্টা আমরা করেছি। সেখানে আমরা নিত্য নতুন পদ্ধতির কথা চিন্তা করি, তার মধ্যে একটা হলো, যেসমস্ত পুরুষ নিয়মিত ঘরের কাজ করেন তাদেরকে নিয়ে কোন কম্পিটিশন করতে পারি কিনা যাতে তারা রোল মডেল হিসেবে সবার সামনে উপস্থিত হতে পারেন এবং এটা সফল হয়েছে।
নাইমুর রহমান দুর্জয়কে সমর্থন জানিয়ে হেলাল উদ্দিন আরো বলেন, ব্যাপারটিকে পলিসি লেভেলে নিয়ে গিয়ে নারীদের কাজের মূল্যায়ন এবং তাদেরকে সম্মানিতকরণ এবং কাজের ভার লাঘব করে তাদের জন্য অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক কাজে অংশ গ্রহণের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। এছাড়াও জনাব হেলাল উদ্দিন ৮ম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় ঘরের কাজের মূল্যায়ন প্রসঙ্গে জনাব নাইমুর রহমান দুর্জয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
উল্লেখ্য, একজন নারী দৈনিক ৮ঘন্টা গৃহস্থালির কাজে ব্যয় করেন, যার আনুমানিক বার্ষিক মূল্য জিডিপি'র প্রায় ৭৭ শতাংশের সমপরিমাণ। অর্থনীতিতে নারীর এ অবদান বরাবরই রয়ে যাচ্ছে হিসেবের বাইরে। যা যুক্ত হলে জাতীয় উৎপাদনে নারীর অবদান ২৫ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়াবে ৪০ শতাংশে। আমাদের সমাজের প্রচলিত ধারণা হলো, ঘরের কাজ একান্ত নারীদেরই এবং তাদেরকেই করতে হবে। বিদ্যমান পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার বিপরীতে কোন কোন পুরুষ নিয়মিতভাবে গৃহস্থালির সেবামূলক কাজ করে যাচ্ছেন। পুরুষদের এই ভিন্নরূপ সমাজের সামনে তুলে ধরে তাদেরকে রোল মডেল হিসেবে উপস্থাপন করে অন্য পুরুষদের উৎসাহিত করা, গৃহস্থালির কাজের স্বীকৃতি প্রদান ও কাজসমূহ ভাগ করে নেয়া এবং নারীদের উপর এ কাজের বৈষম্যমূলক চাপ কমিয়ে আনার উদ্দেশ্যে অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ ২০১৭ সাল থেকে প্রতিবছর গাইবান্ধা ও লালমনিরহাটে এবং ২০১৯ সাল থেকে দিনাজপুর জেলার উপজেলা পর্যায়ে পুরুষদের রান্নার উৎসব আয়োজন করে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় এ বছর আয়োজন করা হচ্ছে 'ভিন্নরূপে পুরুষ- রান্না উৎসব ২০২০'।
আজকের টকশোতে দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে অনুষ্ঠিত “ভিন্নরূপে পুরুষ-রান্না উৎসব ২০২০”-এর সম্প্রচার করা হয়। দিনাজপুরের রান্না উৎসবে প্রথম স্থান অধিকার করেন মো. আজাদ আলী, দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন শ্রী সঞ্জয় কুমার এবং তৃতীয় স্থান অধিকার করেন জনাব মো. আনসার আলী।
ইত্তেফাক/জেডএইচডি
