পা কিস্তানের ২৪ বছরের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা দেখা যাবে, পুরো সময়টা বাঙালির বৈষম্যের এবং শোষণের শোষণের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। বাঙালিরা পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ থাকলেও যে স্বৈরতন্ত্রের শিকার আমরা হয়েছিলাম, সে ২৪ বছরে দুঃশাসনের ইতিহাস আমরা সকলেই জ্ঞাত আছি; আমরাই ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারি যে কীভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়েও সংখ্যালঘু দ্বারা শোষণের শিকার হতে হয়।
২৪ বছরের যে শোষণের ইতিহাস আমাদেরকে প্রমাণ করে যে, কী করে স্বৈরশাসন সে সময়ে অস্ত্রের বলে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছিল। আমাদের যে প্রাকৃতিক সম্পদ ছিল সেটাকে তারা আ্ত্তসাত্ করেছিল এবং এ অসহ্য শোষণের বিরুদ্ধে বাঙালি জাতি আন্দোলন করে অনেক প্রাণের বিনিময়ে একাত্তরে স্বাধীনতা অর্জন করেছিল।
ছাত্রসমাজের অবদান এবং যেসব আন্দোলন তারা করেছিল, সেটাও একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিল জাতীয়তাবাদী চেতনাকে জাগানোর জন্য। ‘জাগো জাগো বাঙালি জাগো’ রণধ্বনি মুখে মুখে থাকত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে। সেই প্রজন্মকে, বলা যায়, মুক্তিযুদ্ধের প্রথম কাতারের সৈনিকে পরিণত করেছিল। এবং সেই আন্দোলনের মধ্যদিয়ে যে জাতীয়তাবাদী চেতনা গড়ে উঠেছিল, সেটি একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতা আন্দোলনে ঐতিহাসিক অবদান রাখার জন্য একটি বিজয়ী শক্তিতে পরিণত করেছিল।
অবশেষে যে মূল্য দিতে হয়েছিল আমাদেরকে সেই লাখো লাখো শহিদদেরকে আমরা শ্রদ্ধা জানাই। ওরা নারী-পুরুষ এবং তরুণ সমাজ কাউকে রেহাই দেয়নি। মহিলাদের ওপরে অত্যাচার সত্তর-একাত্তরে সীমাহীন শোষণের প্রমাণ। তাই আজকে আমরা এ স্বাধীনতার আন্দোলন এবং যুদ্ধকে স্মরণ করি। আমাদের বিশেষ করে যারা অত্যাচার-শোষণের শিকার হয়েছিলেন তাদের কথা স্মরণ করি। তারা জাতিকে তাদের জীবন দিয়ে ঋণী করেছেন। তাদের সেই জীবনের বিনিময়ে যে স্বাধীনতা আমরা পেয়েছি, সে স্বাধীনতাকে সব মানুষের জন্য সত্যিকার অর্থে মুক্তি অর্জনে ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখেছে। আজকে তাই দলমত নির্বিশেষে আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সেই সমাজ এবং শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেখানে সব মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত থাকবে। যেখানে মানুষে মানুষের মধ্যে বৈষম্য থাকবে না। যেখানে আ্ত্তবিকাশের সমান সুযোগ নিশ্চিত করা যাবে। গ্রাম শহরের মধ্যে দরিদ্র এবং ধনীর মধ্যে যে বৈষম্য বিরাজ করছে সেগুলো থেকে মুক্ত হওয়ার সেই কাজ একটি পবিত্র দায়িত্ব হিসেবে শহিদরা আমাদের ওপর অর্পিত করেছেন। তাই প্রত্যেক স্বাধীনতা দিবসে বিজয়ের আনন্দের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের স্মরণ করা উচিত যে, ঋণ শহিদরা আমাদের জন্য রেখে গেছেন, সেটিকে আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে অর্থপূর্ণভাবে যেন অর্জন করার ব্যাপারে লেগে থাকতে পারি।
সত্যিকার অর্থে গণতন্ত্র এবং শোষণমুক্ত অর্থনীতি ও সমাজ হলো স্বাধীনতার লক্ষ্য এবং স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ। সেটাকে সামনে রেখে আমাদের সম্মিলিতভাবে, আপসহীনভাবে কাজ করে যেতে হবে। তাহলেই আমাদের মুক্তি সংগ্রামের স্বার্থকতা অব্যাহত হবে। সে লক্ষ্য অর্জন না হওয়া পর্যন্ত আমরা স্বাধীনতার সুফল পাবো না।
লেখক : আইন বিশেষজ্ঞ ও রাজনীতিক
