১ ৬ই ডিসেম্বর ২০২০। আমাদের মহান বিজয়ের আরো একটি বছর। কতগুলো বছর আমরা পার করে ফেললাম! বিজয়ের এই মাহেন্দ্রক্ষণে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। স্মরণ করছি জাতীয় চার নেতাসহ স্বাধীনতা যুদ্ধের সব শহিদ ও বীর সৈনিকদের। সময়ের পরিক্রমায় বাংলাদেশের যাত্রাকাল ৪৯-এ পা দিয়েছে। স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ শৈশব, কৈশোর এবং যৌবনও অতিক্রম করেছে। এই সময়ে অনেক অনেক দিক থেকে আমাদের অগ্রগতি শুধু সন্তোষজনকই নয়, বিস্ময়করও বটে। অথচ এ সময়ে আমরা একটি মজবুত রাষ্ট্রীয় কাঠামো গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছি, এমনটি বলা চলে না। কিন্তু এমনটি প্রত্যাশিত ছিল না। যদিও আমাদের যাত্রালগ্নে জাতি হিসেবে আমাদের ভবিষ্যত্ ও সম্ভাবনা নিয়ে কম কথা হয়নি। সব শঙ্কাকে পাশ কাটিয়ে বাংলাদেশ আজ বিশ্বের কাছে বহু ক্ষেত্রেই মডেল। দেশের বড়বড় স্বপ্নগুলো যখন একের পর এক অর্জিত হতে দেখছি, তখন আমার কেবলই এক স্বপ্নদ্রষ্টার কথা বারবার বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে ওঠে। তিনি শেখ কামাল। তার ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য পাওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে আমার জানা আছে, কী ভয়ানক দেশপ্রেম, দেশের কল্যান ও সমৃদ্ধি তাকে তাড়িয়ে বেড়াতো!
১৯৭১ সালে আমরা বাঙালিরা ও বাংলাদেশের নাগরিকেরা স্বাধীন স্বার্বভৌম বাংলাদেশ গঠন করতে সক্ষম হলাম। অনেক সংগ্রাম, আন্দোলন, সশস্ত্র যুদ্ধ আর রক্তের বিনিময়ে আমাদের এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। ১৯৪৭-এর ভারত বিভক্তির পর, কৃত্রিম রাষ্ট্র পাকিস্তানের জন্মের পর থেকেই বাঙালির সংগ্রাম আর আন্দোলনের সূচনা। বলা যায়, তারও আগ থেকেই স্বাধীন বাংলা রাষ্ট্রের চেতনা বাঙালির মনোজগতে স্থান করে নিয়েছিল। ১৯৪৬ সালে সোহরাওয়ার্দী-আবুল হাশিম-শরত্ বোস পরিকল্পিত United Socialist Bengal প্রস্তাবনার মধ্য দিয়ে এ চেতনার ভ্রুণ জন্ম নেয়। United socialist Bengal বাস্তবতা অর্জনে ব্যর্থ হলেও এর চেতনা প্রতিটি সংগ্রামশীল মানুষের অন্তরে সুপ্ত হয়ে থাকে। ঘুণে খাওয়া, পোকায় খাওয়া কৃত্রিম পাকিস্তান রাষ্ট্রের একত্রে একটি জাতি রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার কোনো সুযোগই ছিল না। এই প্রসঙ্গে আমরা ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের এক সময়কার সভাপতি ও স্বাধীন ভারত প্রজাতন্ত্রের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী মাওলানা আযাদের আ্ত্তজৈবনিক গ্রন্থ INDIA WINS FREEDOM থেকে উদ্ধৃত করতে চাই। তিনি বলেছেন, ‘No one can hope that east and west Pakistan will compose all their differences and form one nation’ (পাকিস্তানের পূর্ব ও পশ্চিম অংশদ্বয় সব পার্থক্য মিটিয়ে এক জাতিতে পরিণত হবে—এমনটি আশা করা বাতুলতা মাত্র)।
মাওলানার বিশ্লেষণের সূত্র ধরে আমরা অচিরেই দেখতে পাই, পাকিস্তান রাষ্ট্র একটি জাতি রাষ্ট্র হিসেবে এমনকি একটি রাষ্ট্রীয় কাঠামোয়ে নিজেকে ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়ে গেছে। স্বাধীন বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে বেরিয়ে আসার পর আজকের বাস্তবতায়ও আমরা দেখতে পাচ্ছি, পাকিস্তান ধর্মের ভিত্তিতে একটি রাষ্ট্র হিসেবে অদ্যাবধিও সক্ষমতা অর্জন করতে পারছে না। বস্তুত বাংলাদেশ হচ্ছে ঐতিহাসিক বাস্তবতার একটি যৌক্তিক পরিণতি। কেননা, পাকিস্তানের দুই অঞ্চলের মধ্যে ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, ভাষা ও সাংস্কৃতিক বিভাজন ছিল অনপনেয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের কোনো সূত্র মতেই এই বিভাজন দূরীভূত হওয়ার ছিল না। এমনকি, যদিও ইসলাম পাকিস্তানের উভয় অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষের ধর্ম, কিন্তু প্রায়োগিক ও চেতনাগত দিক থেকে দুই অঞ্চলের মুসলমানদের মধ্যে মিলের চেয়ে অমিলই ছিল বেশি। এমনকি, রাষ্ট্রচিন্তার দিক থেকেও বাঙালিরা স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের ধারক ও বাহক। যদিও বাঙালি মুসলমানেরা স্বাধীনতা সংগ্রামের একপর্যায়ে পাকিস্তানের সৃষ্টিতে পালন করেছিলেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা, কিন্তু অচিরেই তাদের মোহভঙ্গ হয়।
পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কী হবে—এই নিয়ে যে প্রশ্নের জন্ম হয়েছিল, বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মর্যাদা দেওয়ার যে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছিল ১৯৪৮ আর ১৯৫২-তে, তা-ই পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভেতর থেকে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ গঠনের পথ রচনা করেছিল। তার পরের ইতিহাস সবার জানা। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে নতুন ইতিহাস রচনা করে। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য কিছু পথভ্রষ্ট কুলাঙ্গারে ক্ষমতালিপ্সা আর পাকিস্তানপ্রীতির কারণে ১৯৭৫ সালে ঘটে যায় জাতির ইতিহাসে সবচেয়ে নির্মম এবং ঘৃণিত হত্যাকাণ্ড। এই হূদয়বিদারক পটপরিবর্তনের পর আমাদের জাতীয় জীবনে বারবার সমরতন্ত্র চেপে বসেছিল। তার পরও নানা চড়াই-উত্রাই পার করে আমরা গণতন্ত্রে ফিরেছি। যদিও এ পথও খুব মসৃণ ছিল না।
আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্রের দুর্বলতা সত্ত্বেও বৈশ্বিক পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের অর্জন অসাধারণ। বিজয়ের ৪৯ বছরে এসে এই অগ্রগতি দেখলে একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আনন্দিত হই। বঙ্গবন্ধুকন্যার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আর্থসামাজিক সূচকসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রত্যাশাজনক সাফল্য অর্জন করেছে। নিজস্ব অর্থে পদ্মার ওপর সেতু নির্মাণ করার সাহস দেখাচ্ছে বাংলাদেশ। বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন থেকে সরে যাওয়ার পর বিশাল এ প্রকল্প হাতে নেওয়ার ঘটনা অনেক দেশ ও সংস্থার সন্দেহ ও বিস্ময় প্রকাশ করলেও সে স্বপ্ন এখন দৃশ্যমান। এ ছাড়া মেট্রোরেল, এলিভেটেট এক্সপ্রেসসহ আরো কিছু বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সরকার।
১৯৭১ সালে বাঙালির সার্বিক মুক্তির লক্ষ্যে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে আমরা যে সশস্ত্র মুক্তির লড়াই করেছি, তার অন্যতম লক্ষ্য ছিল অর্থনৈতিক মুক্তি। আমরা এখন এ লড়াইয়েও সঠিক পথে এগুচ্ছি। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য ’৭৫-এর পরাজিত শক্তিকে সমূলে উত্পাটন করতে পারিনি। রাজনীতির নানা আবরণে সেই শক্তির পুনর্বাসন ঘটেছে। যদি তা-ই না হতো, মুজিব শতবর্ষে এসে জাতির পিতার ভাস্কর্য নিয়ে এমন বিতর্ক তৈরি সম্ভব হতো না। দুঃসাহসেরও একটা সীমা-পরিসীমা থাকে। প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি তার মাত্রাও ছাড়িয়ে গেছে। অথচ রক্তে কেনা এই বাংলাদেশ পরিচালনার জন্য অসাধারণ এবং সর্বজনীন একটি সংবিধান আমাদের আছে। এই সংবিধানকে পাশ কাটিয়ে কথায় কথায় ধর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু আসল কথা হচ্ছে, ধর্ম এখানে একটা উপলক্ষ্য মাত্র। ধর্মের আবরণে মূল টার্গেট জাতির পিতা। বাংলাদেশ জন্মের পরপরই প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তির মূল টার্গেট ছিল জাতির পিতা, তার পরিবার এবং তার একনিষ্ঠ অনুসারীদের ওপর। তাদের একমাত্র লক্ষ্যই ছিল মুজিবাদর্শকে চিরতরে মুছে ফেলা; যা আমরা কখনো হতে দিতে পারি না। কেননা মুক্তিযুদ্ধ ও মুজিবাদর্শ মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠের মতো একসূত্রে গাঁথা।
বাঙালির জীবনে বিজয়ের মাস এমনিতেই আলোর উত্তাপ নিয়ে আসে। ১৯৭৫-এর ১৫ই আগস্টের পর আমাদের সমগ্র চেতনাকে স্তব্ধ করে দিয়ে মৃত্যুর শীতলতায় পৌঁছে দিতে উদ্যত ছিল প্রতিক্রিয়ার শক্তি, মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধ শক্তি। জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্ব আমাদের সেই মৃতপ্রায় চেতনায় নবজীবনের সূচনা করেছে। বাঙালি সত্তা জেগে উঠেছে। জয় বাংলার দুর্দমনীয় স্লোগানকে ধারণ করে বাঙালি আবার জেগে উঠেছে। যা কিছু মন্দ, কলুষ, সবকিছুকে ঝেড়ে মুছে দিয়ে, সব দুর্বলতাকে ছাড়িয়ে তারুণ্যের যে উচ্ছ্বাস সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে, সে উচ্ছ্বাসকে ধারণ করে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে উত্খাত করায় আমরা জাতি হিসেবে, রাষ্ট্র হিসেবে যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি, তা কখনো পূরণ হওয়ার নয়। তার পরও এ দেশের জনগণ আমাদেরকে সুযোগ এনে দিয়েছে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশকে পুনর্গঠনের, সে সুযোগকে কাজে লাগাতে হবে। ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিক্রিয়ার শক্তিকে মোকাবিলা করতে হবে। নতুন দিনের চেতনা, বিজয়ের চেতনা আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এক ও অভিন্ন এবং অবিচ্ছেদ্য। এই ঐক্যের চেতনায় এবার বিজয় দিবসে আমরা একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের আহ্বান জানাব।
লেখক : মাননীয় সংসদ সদস্য, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩
