নতুন প্রজন্মকে উত্সাহিত করতে ভিন্নরূপে পুরুষ

আপডেট : ১৫ ডিসেম্বর ২০২০, ২১:৫০

আমাদের সমাজের প্রচলিত ধারণা হলো—ঘরের কাজ একান্ত নারীদেরই এবং তাদেরকেই করতে হবে। বিদ্যমান পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার বিপরীতে কোনো কোনো পুরুষ নিয়মিতভাবে গৃহস্থালির সেবামূলক কাজ করে যাচ্ছেন। পুরুষদের এই ভিন্নরূপ সমাজের সামনে তুলে ধরে তাদেরকে রোল মডেল হিসেবে উপস্থাপন করে নতুন প্রজন্মকে উত্সাহিত করা, গৃহস্থালির কাজের স্বীকৃতি প্রদান ও কাজসমূহ ভাগ করে নেওয়া এবং নারীদের ওপর এ কাজের বৈষম্যমূলক চাপ কমিয়ে আনার উদ্দেশ্যে একশনএইড বাংলাদেশ ২০১৭ সাল থেকে প্রতিবছর গাইবান্ধা ও লালমনিরহাটে এবং ২০১৯ সাল থেকে দিনাজপুর জেলার উপজেলা পর্যায়ে পুরুষদের রান্নার উত্সব আয়োজন করে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় এবছর আয়োজন করা হয় ‘ভিন্নরূপে পুরুষ—রান্না উত্সব ২০২০’ । গত ১২-১৪ ডিসেম্বর টেলিভিশন চ্যানেলে ৩ দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হয় বিশেষ টক-শো ‘ভিন্নরূপে পুরুষ—রান্না উত্সব ২০২০’। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন নাভিদ মাহবুব। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন একশনএইড ইন্টারন্যাশনাল-এর পাওয়ার প্রজেক্টের সাউথ এশিয়া কো-অর্ডিনেটর মো. হেলাল উদ্দিন, বিশিষ্ট অভিনেতা ও গুণী শিল্পী ফজলুর রহমান বাবু, জাতীয় সংসদের মাননীয় ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট মো. ফজলে রাব্বী মিয়া এমপি এবং বিসিবি পরিচালক এবং কোয়াবের সভাপতি নাইমুর রহমান দুর্জয় এমপি।

ফজলে রাব্বী মিয়া, এমপি

আমাদের জনসংখ্যার অর্ধেকই নারী, এই বিপুল নারী জনগোষ্ঠীর শক্তিকে হিসেবের বাইরে রেখে আমরা এসডিজি অর্জন করতে সক্ষম হবো না। একজন নারী সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সারাদিন নানারকম কাজ করে থাকেন, এসব কাজের যদি যথাযথ মূল্যায়ন না হয় তবে নারীর মধ্যে হীনমন্যতা সৃষ্টি হতে পারে। নারীদের সকল কাজকে হিসেবের আওতায় নিয়ে আসতে হবে, নারীর ঘরের কাজের মূল্যায়ন করতে হবে, এব্যাপারে কোনো মতপার্থক্য থাকা ঠিক হবে বলে আমি মনে করি না। 

নাইমুর রহমান দুর্জয়, এমপি

আমাদের পরিবারের নারীরা হাসিমুখে প্রতিনিয়ত আমাদের খুশি রাখতে ঘরের কাজ করে থাকেন। প্রতিনিয়ত তাদের এই একই ধরনের কাজ করাকে আমার কাছে কষ্টসাধ্য মনে হয়। আমরা যদি ঘরের কাজকে নারীর বাধ্যবাধকতা থেকে বাইরে আনতে পারি, নারীদেরকে যদি বাইরের কাজে সম্পৃক্ত করতে পারি এবং একই সাথে একটি পলিসির মাধ্যমে তাদের এই ঘরের কাজকে, সেক্রিফাইসকে যদি অর্থনৈতিকভাবে বা সামাজিকভাবে মূল্যায়ন করা যায়—তাহলে তাদের কিছুটা হলেও সম্মানীত করা যাবে এবং এই সম্মানটা তাদের প্রাপ্য। ঘরের কাজ যে শুধু নারীর কাজ—আমাদেরকে এই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

ফজলুর রহমান বাবু

আসলে সব কাজই সমান, কাজের মধ্যে ভেদাভেদের কোনো কারণ দেখি না। ছোটবেলা থেকেই আমরা দেখে আসছি ঘরের যাবতীয় কাজই নারীরা করে আসছেন। এভাবে আমাদের মধ্যে একটা মানসিকতা তৈরি হচ্ছে যে, গৃহস্থালির কাজ বুঝি মেয়েদেরই কাজ, যা পরিবর্তন হওয়া প্রয়োজন। করোনাকালে আমি কিন্তু ঘরের কাজ করেছি; যেমন—ঘর মোছা, ঘর ঝাড়ু দেওয়া, বাড়িঘর পরিষ্কার করা, এমনকি কাপড় ধোয়ার কাজও করেছি। 

হেলাল উদ্দিন

আমাদের সমাজে নারীরাই মূলত ঘরের কাজ করেন। কিন্তু আমরা এটাও দেখেছি কোনো কোনো ক্ষেত্রে কিছু পুরুষও এসব কাজ করেন। কিন্তু সামাজিকভাবে এসব পুরুষদের কোণঠাসা করে রাখা হয়; তারা মেয়েলি কাজ করছেন বা তার স্ত্রীর বশীভূত হয়ে আছেন— এমন কথা বলা হয়। আমরা সামাজিক এই দৃষ্টিভঙ্গিকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য যেসব পুরুষ ঘরের কাজ করেন তাদেরকে রোল মডেল হিসেবে উপস্থাপনের জন্য এ উদ্যোগ গ্রহণ করি। আমরা এই কাজটি ২০১২ সালে শুরু করি দিনাজপুর, লালমনিরহাট এবং গাইবান্ধায়। আমরা প্রায় ৬ হাজার নারীর সঙ্গে কাজ করেছি। তারা বলেছেন, যখন তাদের স্বামীরা তাদেরকে ঘরের কাজে সহযোগিতা করেছেন তখন তাদের মধ্যে পারস্পরিক শেয়ারিংটা বেড়ে গেছে, আন্তরিকতা বেড়েছে এবং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যে দ্বন্দ্ব ছিল সেটা কমেছে।

লালমনিরহাট

লালমনিরহাটে অনুষ্ঠিত ‘ভিন্নরূপে পুরুষ— রান্না উত্সব ২০২০’-এ ১ম স্থান অধিকার করেন জিল্লুর রহমান। তিনি বলেন, ‘আমি আজকে হাসের মাংস আর রুটি রান্না করেছি, আমি বাসায়ও রান্না করি। বাড়িতে আমি গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি পালন করি এবং আবাদ করি। আজকে বিজয়ী হয়ে ভালো লেগেছে। পুরস্কার হিসেবে টিভি পেয়েছি বাসার সবাই মিলে টিভি দেখতে পারব।’ এছাড়াও ২য় স্থান অধিকার করেন ইসমাইল হোসেন এবং ৩য় স্থান অধিকার করেন আব্দুল মালেক। 

গাইবান্ধা

গাইবান্ধার রাধাকৃষ্ণপুরে অনুষ্ঠিত ‘ভিন্নরূপে পুরুষ—রান্না উত্সব ২০২০’-এ ১ম স্থান অধিকার করেন মো. হাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, ‘বিজয়ী হয়ে ভালো লাগছে, পুরস্কার হিসেবে টেলিভিশন পেয়েছি, বাসায় সবাই মিলে দেখব, ভালো লাগবে। আমি আজকের প্রতিযোগিতায় কবুতরের মাংস রান্না করেছি। আমি বাড়িতে প্রায়ই রান্না করি। সবাই আমার  রান্না পছন্দ করেছে।’ এতে ২য় স্থান অধিকার করেন আরিফুল ইসলাম এবং তৃতীয় স্থান অধিকার করেন শ্রী সুরেশ চন্দ্র রায়।

দিনাজপুর

দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে অনুষ্ঠিত ‘ভিন্নরূপে পুরুষ—রান্না উত্সব ২০২০’-এ ১ম স্থান অধিকার করেন মো. আজাদ আলী। তিনি বলেন, ‘আমি আজকে ভুনা খিচুড়ি রান্না করেছি, প্রায়ই বাড়িতে রান্না করি।’ ২য় স্থান অধিকার করেন শ্রী সঞ্জয় কুমার এবং তৃতীয় স্থান অধিকার করেন মো. আনসার আলী।

লটারির মাধ্যমে ফেসবুক কুইজে বিজয়ী

১ম পর্বে সামিহা আকতার, ২য় পর্বে মো. নুরুন্নবী, ৩য় পর্বে সৈয়দ নাঈম শোভন।