থিয়েটার অ্যান্ড পারফর্ম্যান্স স্টাডিজ বিভাগে আমরা যখন নাট্য নির্মাণের কাজ করি তখন খুব স্বাভাবিকভাবেই কাজের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে আমাদের ছাত্রছাত্রীরা। তাদের শিক্ষার প্রশ্নটিকে অমীমাংসিত রেখে, উপেক্ষা করে, গৌণ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে নাট্যচর্চা অর্থপূর্ণ হতে পারে না। তবে আজকের এই মঞ্চায়নে খুব মিস করছি সৈয়দ শামসুল হক স্যারকে। কারণ ছেলেমেয়েরা যে রাতদিন পরিশ্রম করে এই নাটকটি দাঁড় করিয়েছে তাদের দেখতে আসতেন তিনি। কি যে আনন্দ পেতেন। আমরা প্রায়ই এখন শুনি কী সব নাটক ফাটক করে। যদিও আগের চেয়ে কমেছে। কিন্তু তরুণ শিক্ষার্থীদের ভেতরে এই যে জীবনবোধটা জাগিয়ে দেওয়ার জন্য এ রকম মঞ্চায়ন যে কি জরুরি তা বলে বোঝানো যাবে না।
এবারে কিছু তাত্ত্বিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করি। উচ্চশিক্ষার স্তরে নাট্যশিক্ষা বলতে আমরা কী বুঝতে চাই? বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায়—প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে এমন কোনো পাঠক্রম নেই, যা অধ্যয়নের মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে অভিনয় তথা থিয়েটার নিয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য ন্যূনতম প্রস্তুত ছাত্রছাত্রী আশা করা যায়। অন্যদিকে, সকল বিষয়ের জন্য অভিন্ন ভর্তি পরীক্ষার মধ্য দিয়ে এই বিভাগে ভর্তি হওয়া আমাদের ছাত্রছাত্রীদের শুরুই করতে হয় এক ‘কঠিন ও সমস্যাসঙ্কুল’ নতুন শিক্ষাজীবন। এ ধরনের পরিস্থিতিতে ব্যাখ্যামূলক, সমালোচনা মনস্ক ও উদ্ভাবনার অভিনবত্বে পরিপূর্ণ সৃজনশীল নাট্যচর্চা দুরূহ হয়ে পড়ে। বিভাগীয় পাঠক্রম, শিক্ষাদানের বৈচিত্র্যময় পদ্ধতি, নাট্যভাষার ভেতর দিয়ে জীবন ও পৃথিবীকে নতুনভাবে আবিষ্কারে বিভাগের লক্ষ্য—এই সবকিছু মিলিয়েই বিভাগীয় যে শিক্ষণপ্রণালী ও আবহ গড়ে ওঠেছে তা সবসময় বর্তমানের সমস্যাসঙ্কুলতাকে অতিক্রম করে সুন্দর ভবিষ্যতের দিকেই পরিভ্রমণ করতে ঐকান্তিকভাবে আগ্রহী। এই প্রেক্ষাপটের মধ্যেই স্থাপিত আছে উইলিয়াম শেক্সপিয়র রচিত সৈয়দ শামসুল হক অনূদিত নাটক ‘ম্যাকবেথ’ প্রযোজনার নির্মাণ ভাবনা ও কর্মপদ্ধতি।
এমএ সমাপনী সেমিস্টারের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে যখন ম্যাকবেথ মহড়া শুরু করি তখন নির্দেশক ও অভিনেতাদের মধ্যে একটি পারস্পরিক ক্ষেত্র রচনা করতেই সচেষ্ট থাকি। প্রকাশের ক্ষেত্রে অভিনেতাদের নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং পারস্পরিক সমন্বয় ও নির্ভরশীলতার দিকটি নিয়ামক হয়ে ওঠেছিল। এই পারস্পরিকতাই আমাদের মহড়ার প্রশিক্ষণে নির্ণায়করূপে কাজ করে। আমরা যা করে ফেলি আর আমাদের নৈতিক মূল্যবোধ অর্থাত্ কর্ম ও মর্ম—এ দুয়ের সংঘর্ষই যেন ম্যাকবেথ। এই সংঘর্ষই যেন মানুষের নিয়তি। এই নিয়তি থেকে কি আমাদের নিস্তার নেই? এসব প্রশ্ন মোকাবেলা করতেই থিয়েটার অ্যান্ড পারফর্ম্যান্স স্টাডিজ বিভাগ সমাজকে নিমন্ত্রণ জানায়, এসো, আমরা বীজবপণ করি তাহলে মাটি আমাদের একটি ফুল উপহার দেবে। এই উপহার আমাদের জানান দেয় আমরা বেেঁচ থাকি কেবলমাত্র সৌন্দর্য আবিষ্কারের কারণে। এই আবিষ্কার রাজনৈতিকভাবে প্রয়োজনীয়। কারণ রস আস্বাদন করতে পারার মধ্যেই রয়েছে যাবতীয় সমতার সম্ভার।
