বধির হয়েও বেটোফেন যেভাবে সেরা সব সংগীত সৃষ্টি করেন

আপডেট : ১৬ ডিসেম্বর ২০২০, ২২:৪১

লুডভিগ ফান বেটোফেন একজন জার্মান সুরকার এবং পিয়ানো বাদক। তাকে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ সুরকারদের একজন মনে করা হয়। জীবনের এক পর্যায়ে পুরোপুরি বধির হয়েও তিনি বিশ্বকে উপহার দিয়েছেন সেরা সব সংগীত। জন্মগতভাবে তিনি বধির না হলেও বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে শ্রবণশক্তি হারাতে থাকেন তিনি। বয়স ৩০ ছোঁয়ার আগেই তিনি পুরোপুরি বধির হয়ে যান। তার সেই শারীরিক প্রতিবন্ধকতাও তাকে দমাতে পারেনি। শ্রবণশক্তি হারানোর পর বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রের সাহায্য সংগীত সৃষ্টি করতেন বেটোফেন। নিজের শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে ভাইদের চিঠি লিখে জানাতে চাইলেও কখনো সেই চিঠি পাঠানো হয়নি। মৃত্যুর পর তার নথিপত্র থেকে ভাইদের চিঠি লেখার বিষয়টি জানা যায়। ভাইদের উদ্দেশ্যে লেখা চিঠিতে বলেন, প্রায় ছয় বছর আগে এক সর্বনাশা রোগে আক্রান্ত হই। যার চিকিত্সা করতে গিয়ে অযোগ্য ডাক্তাররা আমার অবস্থা আরো বেশি সংকটাপন্ন করে তোলে। কীভাবে বধিরতা তাকে যন্ত্রণা দিচ্ছে সে সম্পর্কেও তিনি লিখেছিলেন সেই চিঠিতে।

তবে শ্রবণশক্তি হারানোর বেদনা নিয়ে তিনি বেঁচে থাকতে এবং তার সংগীতের সাধনা চালিয়ে যেতে ছিলেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। শ্রবণশক্তি হারানো শুরু করার পর প্রথমদিকে বেটোফেন কেবল কিছু কিছু ফ্রিকোয়েন্সির শব্দ শুনতে পেতেন না। কিন্তু ক্রমে তিনি তার পুরো শ্রবণশক্তিই হারিয়ে ফেলেন। ১৮১৮ সাল নাগাদ তিনি আর কারো কথা মোটেই বুঝতে পারতেন না। তিনি লোকজনকে অনুরোধ করতেন হাতে লিখে তাকে প্রশ্ন করতে এবং কথা বলতে। এমন প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও বেটোফেন ক্রমাগতভাবে নতুন নতুন সংগীত সৃষ্টি করে যাচ্ছিলেন। এই সময়টাতেই তিনি তার সবচাইতে ভাবপ্রবণ, মর্মস্পর্শী এবং পরীক্ষামূলক কিছু সংগীত সৃষ্টি করেন। আশ্চর্যের বিষয়, তিনি জগদ্বিখ্যাত সংগীত সৃষ্টি করতে পারলেও নিজে তার কিছুই শুনতে পেতেন না।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীতের অধ্যাপক এবং বেটোফেনকে নিয়ে লেখা জীবনীগ্রন্থের লেখক প্রফেসর লরা টানব্রিজ বলেন, সবকিছুর পরেও বেটোফেনের কাছে তার মস্তিষ্কই ছিল সবচাইতে শক্তিশালী যন্ত্র। আপনাকে মনে রাখতে হবে যে, যারা সংগীত তৈরি করেন, তাদের নিজের কল্পনাশক্তির ওপর অনেকখানি নির্ভর করতে হয়।  তারা কিন্তু তাদের মাথার ভেতরে শব্দ শুনতে পান। বেটোফেন কিন্তু একেবারে ছোটবেলা থেকেই তার মাথার ভেতরে এরকম সংগীত তৈরি করে যাচ্ছিলেন। টানব্রিজ বলেন, তিনি হয়তো বাইরের বিশ্বের শব্দ শুনতে পাচ্ছিলেন না। কিন্তু এমনটা মনে করার কোনো কারণ নেই যে, তিনি তার মনের ভেতর সংগীত শোনার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছিলেন, অথবা তার সংগীত সৃষ্টির যে মেধা সেটা কমে গিয়েছিল।

 যে সংগীত তিনি তৈরি করছেন, সেই সংগীত যে তিনি নিজের কানে শুনতে পাচ্ছেন না, এটি ছিল তার জন্য চরম হতাশার। কিন্তু এর মধ্যেই বেটোফেন নতুন চ্যালেঞ্জ নিলেন। তিনি তার সংগীতে এমন ধরনের শক্তি আর ভাবনা সঞ্চারিত করলেন, যেটা এর আগে কেউ কখনো দেখেনি।

বেটোফেনের সংগীত বিশ্লেষণ করে সামপ্রতিককালে কয়েক জন বলেছেন যে, বধির হওয়ার পর তার সংগীত সৃষ্টির প্রতিভা যেন আরো অনেক গুণ বেড়ে গিয়েছিল। একজন ব্রিটিশ সংগীতস্রষ্টা রিচার্ড আইরেস বলেন, আপনি যদি ঠিকমতো শুনতে না পারেন, তখন আপনি আপনার সংগীত প্রকাশের জন্য অন্য মিউজিশিয়ানদের শক্তির ওপর নির্ভর করেন।-বিবিসি