উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি দেশ বাংলাদেশ। শুধু তাই-ই নয়, দেশটি এখন উন্নতদেশেও উপনীত হতে যাচ্ছে। উন্নয়নশীল হলেও খনিজ নির্ভর নয় বাংলাদেশ। মূলত জনশক্তি এবং পোশাক রপ্তানিই আমাদের বৈদেশিক আয়ের প্রধান উত্স। মধ্যপ্রাচ্যের মতো আমাদের অত বিশালাকারের খনিজ সম্পদ নেই, আছে যত্সামান্য প্রাকৃতিক গ্যাস এবং কয়লা। যা দিয়ে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে বেগ পেতে হচ্ছে খানিকটা। গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় তা রপ্তানির কথা ভাবতে পারছি না আমরা। কয়লার অবস্থাও তদ্রূপ। মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকলেও অদ্যাবধি অনেক এলাকা থেকে এখনো কয়লা উত্তোলন করা সম্ভব হয়নি। নানাবিধ সমস্যার কারণে ঘটেছে এটি। ফলে আমাদেরকে কয়লা আমদানি করতে হচ্ছে এখনো।
এক কথায় বলতে গেলে প্রধান খনিজ সম্পদের দু’টিই আমাদের কাছে পর্যাপ্ত নেই। ফলে আমরা এ দু’টি খনিজ সম্পদ থেকে কোনো ধরনের বৈদিশ মুদ্রা অর্জন করতে পারছি না। এ অশুভ সংবাদের পরেও আমাদের জন্য একটি দারুণ সুসংবাদ অপেক্ষা করছে। সেটি হচ্ছে, বাংলাদেশের মাটিতে উন্নতমানের ইউরেনিয়ামের সন্ধান পাওয়া গেছে। বলা যায়, প্রকৃতি আমাদেরকে করুণা করেছেন, এ দুষ্প্রাপ্য রাসায়নিক পদার্থটি দান করে। এ দুষ্প্রাপ্য রাসায়নিক পদার্থটি অবহেলায় পড়ে আছে দেশের বিভিন্ন নদীর বালুকারাশিতে। এখন শুধু আহরণ করতে পারলেই হলো, রাতারাতি আমাদের ভাগ্যটা বদলে যাবে। কারণ বিশ্ববাজারে ইউরেনিয়ামের দাম যেমনি চড়া তেমনি রয়েছে ব্যাপক চাহিদাও। বিশেষ করে জার্মান, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ইউরেনিয়ামের চাহিদা বলে শেষ করার মতো নয়। এ ছাড়াও বিশ্বের অনেক দেশেই ইউরেনিয়াম সংগ্রহ নিয়ে অনেক কূটকৌশল চলছে।
সূত্রমতে, বাংলাদেশে সর্বপ্রথম ১৯৭৫ সালে ইউরেনিয়ামের সন্ধান মিলে হারগাছা পাহাড়ে। পাহাড়টি মৌলভীবাজার জেলার জুড়ী উপজেলার ফুলতলা ও সাগরনালা ইউনিয়নের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত। সেই সময় দেশের আণবিক শক্তি কমিশনের একটি দল হারগাছা পাহাড়ে অনুসন্ধান চালিয়ে নিশ্চিত হয় ইউরেনিয়াম প্রাপ্তির বিষয়টি। তখন থেকেই হারগাছা পাহাড়কে তেজস্ক্রিয় এলাকা হিসাবে চিহ্নিত করে বাংলাদেশ আণবিক শক্তি কমিশন। পরবর্তীতে ১৯৮৫ সালে বৃহত্তর সিলেট বিভাগে ভূতত্ত্ব ও জরিপ অধিদপ্তর অনুসন্ধান চালিয়ে জৈন্তাপুরের সীমান্তবর্তী কেন্দ্রীয় হাওরে ইউরেনিয়ামের সন্ধান পায়। কিন্তু সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ার কারণে সেই সময় উক্ত গবেষণা স্থগিত করতে বাধ্য হন ভূতত্ত্ব ও জরিপ অধিদপ্তর। ইউরেনিয়ামের সন্ধান শুধু বাংলাদেশই নয়, পেয়েছে ভারতও। সীমান্তবর্তী এলাকায়ই সন্ধান পেয়েছে ভারত। অর্থাত্ জৈন্তাপুর সীমান্তবর্তী ডিবির হাওর ও কেন্দ্রীয় হাওরের ওপারে ইউরেনিয়ামের সন্ধান পেয়েছে ভারত। ভারতের ‘ইউরেনিয়াম কর্পোরেশন অব ইন্ডিয়া লিমিটেড’(ইউসিআইএল) ২০০৯ সালে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী মেঘালয় রাজ্যের পশ্চিম খাসিয়ার পার্বত্য অঞ্চলে ইউরেনিয়াম উত্তোলনের চেষ্টা চালায়। কিন্তু বিভিন্ন কারণে ইউরেনিয়াম উত্তোলন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয় ভারত সরকার। পরবর্তীতে ভারত উক্ত এলাকা থেকে ইউরেনিয়াম উত্তোলনের উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশ আণবিক শক্তি কমিশন ১৯৯১ সালে মৌলভী বাজারের হারগাছায় পুনরায় ইউরেনিয়ামের অনুসন্ধানের কাজ শুরু করে সংগৃহীত ইউরেনিয়াম আকরিক জাপানের আণবিক শক্তি কমিশনের জ্বালানিবিষয়ক গবেষণাগারে পাঠায়। তারা পরীক্ষা-নীরিক্ষা করে রিপোর্ট প্রদান করেন যে, বাংলাদেশের ইউরেনিয়াম অনেক উন্নতমানের। যে রিপোর্টের ফলে আমাদের দেশের প্রাপ্ত ইউরেনিয়ামের মান নিয়ে প্রশ্নবিদ্ধের সংশয় কেটে যায়।
১৯৮৯ সালে ময়মনসিংহ জেলার গারো পাহাড় বেষ্টিত সোমেশ্বর নদীর বালুকারাশিতে ইউরেনিয়ামের সন্ধান পায় বাংলাদেশ। বছর তিনেক আগে উক্ত জেলার ব্রহ্মপুত্র নদে ব্যাপক অনুসন্ধান চালিয়ে ইউরেনিয়ামের সন্ধান পায় গবেষকদল। জানা যায়, ইতিপূর্বে মৌলভীবাজারের হারগাছা পাহাড়ের ও সিলেটের জৈন্তাপুরের মাটি পরীক্ষা-নীরিক্ষা করে প্রতি ১০ লাখ মাটির কণার মধ্যে ৫০০-১৩০০ ইউরেনিয়ামের কণার সন্ধান পায় গবেষকদল। পরীক্ষিত এলাকার মাটিতে ইউরেনিয়াম প্রাপ্তির হার প্রায় ৫০০-১৩০০ পার্টস পার মিলিয়ন (পিপিএম)। সূত্র মতে জানা যায়, কোনো স্থানে ইউরেনিয়ামের মাত্রা ৭ শতাংশ হলে বাণিজ্যিকভাবে সেটি আহরণের উপযুক্ত হয়। সেমতে আমাদের ব্রহ্মপুত্র নদের বালুকারাশিতে ৯ শতাংশ ইউরেনিয়ামের পরিমাণ পাওয়া যায়। যা আহরণে কোনো ধরনের বাধা বিপত্তি নেই। ইতিপূর্বে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা থাকা স্বত্বেও বাংলাদেশের জন্য ইউরেনিয়ামের ব্যবহার ও উত্তোলন প্রায় অসম্ভব ছিল। বর্তমানে সেই বিধি শিথিল করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক পারমাণবিক কমিশন অনুমতি দিয়েছে ইউরেনিয়ামের ব্যবহার ও পারমাণবিক বিদ্যুেকন্দ্র স্থাপনের। রূপপুরের পারমাণবিক বিদ্যুত্ কেন্দ্র স্থাপিত হলে ইউরেনিয়ামের ব্যবহার নিশ্চিত হয়ে পড়বে আমাদের দেশে। না হলে গ্যাস ও কয়লার ওপরে পড়বে প্রচণ্ড চাপ।
আমরা জানি, বর্তমান সরকার ইউরেনিয়াম উত্তোলনের জন্য জোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। সরকার ক্ষমতায় এসে ‘জেএসবি’ নামক একটি প্রতিষ্ঠানকে বিভিন্ন নদ-নদীর বালুকারাশি থেকে ইউরেনিয়াম উত্তোলনের দায়িত্বও দিয়েছেন। সুখবরটি হচ্ছে জেএসবি জরিপ করে ব্রহ্মপুত্র নদীর উত্সস্থল কুড়িগ্রাম এবং যমুনা নদীতে প্রচুর পরিমাণ খনিজ ও রাসায়নিক সম্পদের সন্ধান পেয়েছে। যা আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ। আরো গুরুত্বপূর্ণ সংবাদটি হচ্ছে এসব খনিজ পদার্থ উত্তোলন এবং সঠিক ব্যবহার করতে পারলে আমরা অচিরেই বিত্তশালী দেশে পরিণত হতে পারব বলে বিশ্বাস রয়েছে।
n লেখক : কথাসাহিত্যিক ও বন্যপ্রাণী বিশারদ
