শফিকুর রহমান রয়েল
দীর্ঘদিন নিদারুণভাবে বিদেশি সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল থাকা বাংলাদেশ প্রসঙ্গে অর্থনীতি বিষয়ক পণ্ডিত ও বিশ্লেষকরা এখন নতুন করে ভাবতে বাধ্য হচ্ছেন। ম্যালথাসের থিওরিকে অকেজো প্রমাণ করে তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে সেদিনকার তলাবিহীন ঝুড়ি। এক সময়ের সবচেয়ে বড় সমস্যা অধিক জনসংখ্যাকে এখন আর বড় বোঝা মনে করছে না। তবে সামরিক অভ্যুত্থানের তিক্ত অভিজ্ঞতা এবং একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ সত্ত্বেও দারিদ্র্যতা হ্রাস এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির উন্নয়নে বাংলাদেশের কৃতিত্ব উল্লেখ না করাটা হবে রীতিমতো অবিচার। পণ্ডিত ও বিশ্লেষকদের কাছে যে প্রশ্নটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে—চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কিনারে থাকা দেশটি কীভাবে তার ভবিষ্যতের নাটকীয় উন্নতি ঘটিয়েছে, এমনকি ভারতের অর্থনৈতিক অবস্থানকে পেছনে ফেলার হুমকি পর্যন্ত দিচ্ছে, বিশেষত মাথাপিছু আয়ের ক্ষেত্রে। এ প্রশ্নের চটজলদি জবাব দিতে গেলে বলতে হয়, গত ৫ বছর জুড়ে কীভাবে বাংলাদেশ টেকসই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখল তার মধ্যেই উত্তরটা নিহিত।
সাফল্যের মূল রহস্যটা নিহিত ছিল প্রবাসী শ্রমিকদের প্রেরিত রেমিট্যান্স তহবিলের মধ্যে, এদের বেশির ভাগেরই বসবাস পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোয়। ১ কোটিরও বেশি শ্রমিকের প্রেরিত বার্ষিক রেমিট্যান্সের অঙ্কটা ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি। ছোট্ট এ দেশটিতে জনসংখ্যা ১৬ কোটিরও বেশি, তা সত্ত্বেও রেমিট্যান্স দারিদ্র্য প্রশমনে অসামান্য অবদান রেখে যাচ্ছে। দেশের অর্থনীতিতে প্রচলিত অবদান ছাড়াও প্রবাসীরা স্বদেশে বেকারত্ব কমাতে বিশাল ভূমিকা রাখছে। তবে বাংলাদেশের সাফল্যগাঁথা বোঝার জন্য রেমিট্যান্সই যথেষ্ট নয়। কিঞ্চিত্ সমৃদ্ধির পথে সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রার নিয়ামক হচ্ছে তৈরি পোশাক শিল্পের অভাবনীয় সাফল্য, যেখানে নিয়োজিত রয়েছেন প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশ অবদানই গার্মেন্ট খাতের। চীন ও ভিয়েতনাম অন্যান্য খাতে দৃষ্টিনিবদ্ধ করায় বাংলাদেশ এ শিল্পে এগিয়েছে অতি সতর্কতার সঙ্গে। দেশের নারীদের চাকরির ক্ষেত্রে এ খাতই মূল উত্স যেমন, ঠিক তেমনি দেশের আয়েরও বেলাতেও। বলাবাহুল্য, নারীর ক্ষমতায়ন তথা তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক মর্যাদা বৃদ্ধিতে গার্মেন্ট শিল্পের অবদান পাহাড়সম। এই দুটি নিয়ামক ছাড়াও বাংলাদেশ ভারতের মতো শুধু সামাজিক খাতেই বিশেষ নজর দিচ্ছে না। বাংলাদেশ সরকারের কতিপয় নীতিগত দুর্বলতা সত্ত্বেও তারাও মাতৃস্বাস্থ্য ও প্রাথমিক স্বাস্থসেবাকে প্রাধান্য দিতে মোটেও কার্পণ্য করেনি। ফলে শিশুমৃত্যুর হার হ্রাস ও রোগের পরিসর কমিয়ে আনাটা সহজ হয়েছে। রাজনৈতিক পরিস্থিতি শান্ত থাকার পাশাপাশি তুলনামূলকভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতির স্বাস্থ্য ভালো থাকায় এবং স্বপ্রণোদিত হয়ে সরকার ব্যবসাবান্ধব অনেক সুযোগ-সুবিধার বৃদ্ধি করায় বহু দেশ এখন সেখানে বিনিয়োগ করছে। সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে সস্তা শ্রমের বিষয়টি। বিদেশি সরাসরি বিনিয়োগের জন্য আর কি চাই? এফডিআই আকর্ষণে প্রয়োজনে আরো ছাড় দেওয়ার জন্যেও প্রস্তুত বাংলাদেশ। এরই মধ্যে দেশটিতে বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নেওয়ার ব্যাপারে চীন ও ভারতের মধ্যে রীতিমতো প্রতিযোগিতা চলছে।
—ফরেন পলিসি ম্যাগাজিন অনুসরণে
