ঘরছাড়া এক সুরের পথিক

আপডেট : ১৮ জানুয়ারি ২০১৯, ২৩:১০

বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার একটি গ্রাম শিবপুর। বাংলার আর দশটা গ্রামের মতই সুজলা সুফলা পাখির কুজনে মাতোয়ারা এ গ্রামের সবুজ প্রান্তর। এ গ্রামেই জন্মেছিলেন প্রকৃতি প্রেমিক আলম। প্রকৃতির সান্নিধ্য ভালো লাগত তাঁর। প্রকৃতির মাঝে খুঁজে বেড়াতেন সুর। সঙ্গীতের সেই অন্বেষণ থেকেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ। তিনিই উপমহাদশের শাস্ত্রীয় সঙ্গীতকে বিশ্বের দরবারে পরিচিত করিয়েছিলেন। সেই সুরসম্রাট সঙ্গীত নিয়ে বলেছিলেন, ‘সুরের নাগাল পাওয়া খুব কঠিন। বুড়ো হয়ে গেলাম তবু সুরের নাগাল পেলাম না। যতই তাকে ধরতে যাই, অমনি পালিয়ে যায়। না, ঠিক পালিয়ে নয়, দূরে সরে গিয়ে যেন আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকে। আমি আবার তাকে ধরতে যাই। সে আবার পালিয়ে যায়।’ অপর এক প্রসঙ্গে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ বলেছিলেন, ‘আরও যদি তিনশ’ বছর বাঁচতে পারতাম, তাহলে হয়তো সুরের খানিকটা নাগাল পেতাম।’

এই সুরের নাগাল পাওয়ার জন্য জীবনে কী না করেছেন আলাউদ্দিন খাঁ। ভারতবর্ষ চষে বেড়িয়েছেন। পরে উপমহাদেশের সুর নিয়ে ভ্রমণ করেছেন বিশ্ব। অথচ সেই সুর সম্রাট স্মৃতির পাতা ওল্টালেই বলতেন, বাংলাদেশ আমার জন্মভূমি। এর মাটিকে আমি প্রাণের চেয়েও ভালোবাসি।’ অথচ সুরের টানে সেই মাটির টান কাটিয়ে ছেড়েছিলেন জন্মভিটা। বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন। এ প্রসঙ্গে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সাহেবের উক্তি, ‘কেন পালিয়ে গিয়েছিলাম? অমৃতের সন্ধানে। সুরের সন্ধানে।’ তিনি বলতেন, ‘সঙ্গীত আমার জাতি আর সুর আমার গোত্র।’

আলাউদ্দিন খাঁ ঘর ছেড়েছিলেন সেই কিশোর বয়সে। জীবনের একটা বিশাল অংশ তিনি সঙ্গীতশিক্ষার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করেন। না খেয়ে রাস্তায় পড়ে থেকে তিনি সঙ্গীতগুরুর সান্নিধ্য পাবার জন্য দিনের পর দিন পার করেছেন। একের পর এক সঙ্গীতগুরুর শিষ্যত্ব নিয়ে সঙ্গীতের সাধনা করেছেন। ওস্তাদ ওয়াজির খাঁর দেখা পেতে প্রায় ছয় মাস তিনি অপেক্ষা করেছেন। এরপর শুরু হয় তাঁর কৃতিত্ব অর্জনের পালা। ১৯৩৫ সালে তিনি নৃত্যশিল্পী উদয়শঙ্করের সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সফর করেন। তিনিই ভারতীয় উপমহাদেশের রাগসঙ্গীতকে সর্বপ্রথম পাশ্চাত্যের শ্রোতাদের কাছে পরিচিত করান। তিনি নৃত্যাচার্য উদয়শঙ্কর পরিচালিত নৃত্যভিত্তিক ‘কল্পনা’ শীর্ষক একটি ক্ল্যাসিকধর্মী ছায়াছবিতে আবহসঙ্গীতে সরোদ পরিবেশন করেন। তিনি দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের সমন্বয়ে অর্কেস্ট্রার স্টাইলে একটি যন্ত্রীদল গঠন করে নাম দেন ‘রামপুর স্ট্রিং ব্যান্ড’। ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ‘খাঁ সাহেব’ উপাধিতে ভূষিত করেছিল।

সুরের খোঁজে ঘর ছেড়েছেন:কিশোর বয়সে অগ্রজ ফকির আফতাবউদ্দিন খাঁর নিকট সঙ্গীতে হাতেখড়ি হয় আলমের। তখনও তিনি আলাউদ্দিন খাঁ হয়ে ওঠেননি। স্কুল ফাঁকি দিয়ে এক যাত্রাদলের সঙ্গে গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়াতেন। ওই সময় তিনি  জারি,  সারি,  বাউল,  ভাটিয়ালি,  কীর্তন,  পাঁচালি প্রভৃতি গানের সঙ্গে পরিচিত হন। কিন্তু তাতে তৃপ্তি হয়নি বালক আলমের। সুরের সন্ধানে সেই কিশোর বয়সে মায়ের সিন্দুক থেকে ১২ টাকা চুরি করে বাড়ি থেকে পালিয়ে চলে আসেন নারায়ণগঞ্জ। সেখান থেকে কলকাতার শিয়ালদহ। কলকাতায় সঙ্গীতসাধক গোপালকৃষ্ণ ভট্টাচার্য ওরফে নুলো গোপালের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। সাত বছর পর নুলো গোপালের মৃত্যু হলে আলাউদ্দিন কণ্ঠসঙ্গীতের সাধনা ছেড়ে যন্ত্রসঙ্গীত সাধনায় নিযুক্ত হন। স্টার থিয়েটারের সঙ্গীতপরিচালক অমৃতলাল দত্ত ওরফে হাবু দত্তের নিকট তিনি  বাঁশি, পিকলু, সেতার, ম্যান্ডোলিন, ব্যাঞ্জো ইত্যাদি দেশি-বিদেশি  বাদ্যযন্ত্র বাজানো শেখেন। সে সঙ্গে তিনি লবো সাহেব নামে এক গোয়ানিজ ব্যান্ড মাস্টারের কাছে পাশ্চাত্য রীতিতে এবং বিশিষ্ট সঙ্গীতজ্ঞ অমর দাসের কাছে দেশীয় পদ্ধতিতে বেহালাবাদন শেখেন। একই সময়ে তিনি মিসেস লবোর নিকট স্টাফ নোটেশনও শেখেন। এ ছাড়া হাজারী ওস্তাদের কাছে সানাই, নাকারা, টিকারা, জগঝম্প এবং নন্দবাবুর নিকট  মৃদঙ্গ ও  তবলা শেখেন। এভাবে তিনি সর্ববাদ্যে বিশারদ হয়ে ওঠেন।

আলাউদ্দিন খাঁ কিছুদিন ছদ্মনামে মিনার্ভা থিয়েটারে তবলা শিল্পী হিসেবে চাকরি করেন। পরে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার জমিদার জগিকশোর আচার্যের আমন্ত্রণে তাঁর দরবারে সঙ্গীত পরিবেশন করতে যান। সেখানে ভারতের বিখ্যাত সরোদিয়া ওস্তাদ আহমেদ আলী খাঁর সরোদবাদন শুনে তিনি সরোদের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং তাঁর নিকট পাঁচ বছর সরোদে তালিম নেন। পরে ভারতখ্যাত তানসেন বংশীয় সঙ্গীতজ্ঞ ওস্তাদ ওয়াজির খাঁর নিকট সরোদ শেখার জন্য তিনি রামপুর যান। ওস্তাদ ওয়াজির খাঁ রামপুরের নবাব হামেদ আলী খাঁর সঙ্গীতগুরু ও দরবার-সঙ্গীতজ্ঞ ছিলেন। আলাউদ্দিন তাঁর নিকট দীর্ঘ ত্রিশ বছর সেনী ঘরানায় সঙ্গীতের অত্যন্ত দুরূহ ও সূক্ষ্ম কলাকৌশল আয়ত্ত করেন।

ওয়াজির খাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ: আলাউদ্দিন খাঁ শুনেছিলেন যে ভারতের রামপুরের নবাবের দরবারে পাঁচশ সঙ্গীতজ্ঞ আছেন এবং এই সমস্ত ওস্তাদের প্রধান ছিলেন ওয়াজির খাঁ। তিনি তানসেনের কন্যা সরস্বতী দেবীর সরাসরি বংশধর। ওয়াজির খাঁ ছিলেন বীনকর ঘরানার। রামপুরের নবাব স্বয়ং তার শিষ্য। দরবারে নবাবের সিংহাসনের পাশেই ওয়াজির খাঁর আসন। আলাউদ্দিন খাঁর মনে হল, এমন গুণী ওস্তাদের কাছে সঙ্গীত না শিখতে পারলে তাঁর জীবনই বৃথা। একদিন সব সঙ্কোচ ঝেড়ে ফেলে আলাউদ্দিন খাঁ গেলেন ওস্তাদ ওয়াজির খাঁর সঙ্গে সাক্ষাত্ করতে। কিন্তু আলাউদ্দিন খাঁর পোশাক-আশাক তখন প্রায় ফকিরের মত। তাকে দেখে মোটেও পাত্তা দিল না ওয়াজির খাঁর দারোয়ান। সে ফটক থেকেই ভাগিয়ে দিল তাঁকে। ভীষণ রকমে ভেঙে পড়লেন আলাউদ্দিন। এমন ওস্তাদের কাছে যদি তালিম না নেয়া যায়, তবে বেঁচে থেকে লাভ কী! দুই তোলা আফিম কিনলেন বাজার থেকে। আবারও যদি ওয়জির খাঁর সাক্ষাত্ পেতে ব্যর্থ হন তবে এই আফিম খেয়েই তিনি জীবন শেষ করে দেবেন বলে ঠিক করলেন। তবে কপালগুণে এই সময় তার সাক্ষাত্ হয় সেখানকার মওলানার সঙ্গে। মওলানা তাঁকে বোঝালেন, আত্মহত্যা অপরাধ। আলাউদ্দিন খাঁ জানতে পারলেন যে নবাব দুই একদিনের মধ্যে মঞ্চে অভিনয় দেখতে যাবেন। সময় মত আলাউদ্দিন খাঁ গিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন নবাবের যাত্রা পথের ধারে। নবাবের ঘোড়ার গাড়ি কাছে আসা মাত্র তিনি লাফিয়ে পড়লেন তার সামনে। পাইক পেয়াদারা সঙ্গে সঙ্গে তাকে ধরে নিয়ে গেল নবাবের কাছে। এই সুযোগের অপেক্ষায়ই ছিলেন তিনি। নবাবের সামনে গিয়ে তিনি সব কথা খুলে বললেন তাঁকে। এও বললেন যে, কোন উপায় না পেয়ে বাধ্য হয়েই এই চরম পন্থা গ্রহণ করতে হয়েছে তাকে, এজন্য তিনি ক্ষমাপ্রার্থী। নবাব তাকে দরবারে নিয়ে গিয়ে বললেন, ‘এখানে সব বাদ্যযন্ত্রই আছে। তুমি কোন যন্ত্র বাজাতে পার, এখান থেকে নিয়ে বাজিয়ে শোনাও একটু। কারণ, ওস্তাদ ওয়াজির খাঁ সবাইকে তালিম দেন না।’ আলাউদ্দিন খাঁ প্রথমে সরোদ তুলে নিয়ে বাজালেন একটা রাগ। বাজনা শুনে মুগ্ধ নবাব আরো তাজ্জব হয়ে গেলেন, তখন তিনি দেখলেন যে ময়লা ছেঁড়া কাপড় চোপড় পরা ফকিরের মত মানুষটা বেহালা হাতে তুলে নিয়েছেন বাজানোর জন্য। বাজালেনও চমত্কার। বিস্মিত নবাব জিজ্ঞেস করলেন, ‘আর কোন যন্ত্র বাজাতে জানো?’  আলাউদ্দিন খাঁ বিনয়ের সঙ্গেই জবাব দিলেন, ‘আপনার দরবারে যত রকম বাদ্যযন্ত্র আছে, তার সবই বাজাতে পারি।’ এবার অবিশ্বাসের ছায়া দুলে উঠল নবাবের চোখে। তাও কি সম্ভব! বললেন, ‘বেশ বাজাও একে একে।’ এরপর আলাউদ্দিন যে কাজটি করলেন তাতে নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল নবাবের। নবাবের সামনে সমস্ত বাদ্যযন্ত্রই একের পর এক বাজিয়ে দেখালেন তিনি। নবাব বললেন, ‘অসাধারণ, অবিশ্বাস্য। তুমি এরকম আরো কিছু জানো নাকি যুবক?’ আলাউদ্দিন খাঁ বললেন, ‘হুজুর, যে কোন রাগ, যে কোন সুর শুনেই আমি তা কাগজে লিখে দিতে পারি।’ এবার নবাব নিজেই গাইতে আরম্ভ করলেন এক দুরূহ রাগের গমক। আলাউদ্দিন খাঁর পক্ষে তা লেখা মোটেও কঠিন ছিল না। কিন্তু তার মনে হল, রাজা বাদশাহরা কোন ব্যাপারে হেরে গেলে তাদের মেজাজ বিগড়ে যায়। তাই এক্ষেত্রে নবাবকে হারিয়ে দিলে হিতে বিপরীত হতে পারে। তাই তিনি বললেন, ‘এত বড় দুরূহ তান হুজুর! এটা আমার পক্ষে লেখা সম্ভব নয়।’ এটা শুনে ভারি খুশি হলেন নবাব। সঙ্গে সঙ্গে তিনি বিরাট একটা রূপার থালা ভর্তি স্বর্ণমুদ্রা, মূল্যবান বস্ত্র ও নানা রকম খাদ্য সামগ্রী উপঢৌকন হিসাবে ওস্তাদ ওয়াজির খাঁর কাছে পাঠিয়ে আলাউদ্দিন খাঁকে তার শিষ্যত্বে বরণ করে নেয়ার প্রস্তাব জানালেন। নবাবের দরবারে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আলাউদ্দিন খাঁকে শিষ্য হিসাবে বরণ করে নিলেন ওস্তাদ ওয়াজির খাঁ। নবাব স্বয়ং উপস্থিত ছিলেন এ অনুষ্ঠানে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আলমের বিশ্বজয়: ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সাহেবের জন্ম ১৮৬২ সালের ৮ অক্টোবর ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর উপজেলার শিবপুর গ্রামে এক সঙ্গীত পরিবারে। তাঁর পিতা সবদর হোসেন খাঁ ওরফে সদু খাঁও ছিলেন বিশিষ্ট সঙ্গীতজ্ঞ। মাতার নাম সুন্দরী বেগম। তাঁর সঙ্গীতগুরু ছিলেন আগরতলা রাজদরবারের সভাসঙ্গীতজ্ঞ তানসেনের কন্যাবংশীয় রবাবী ওস্তাদ কাশিম আলী খাঁ। শিবপুরে এখনো রয়েছে তাঁর মা-বাবার কবর। তার নামে গড়ে উঠেছে শিবপুর ওস্তাদ আলাউদ্দি খাঁ কলেজ। ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁ ও ওস্তাদ নায়েব আলী খাঁ তার ছোট ভাই।

আলাউদ্দিনের ডাক নাম ছিল ‘আলম’। তিনি প্রচুর গান রচনা করেছেন। তাঁর রচিত গানে তিনি ‘আলম’ ভনিতা ব্যবহার করেছেন। ১৯১৮ সালে নবাব তাঁকে মধ্য প্রদেশের মাইহার রাজ্যে প্রেরণ করেন। মাইহারের রাজা ব্রিজনারায়ণ আলাউদ্দিন খাঁকে নিজের সঙ্গীতগুরুর আসনে অধিষ্ঠিত করলে তিনি মাইহারে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। বেরিলির পীর সাহেবের প্রভাবে তিনি যোগ, প্রাণায়াম ও ধ্যান শেখেন। ১৯৭২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সেখানেই মারা যান সুরসম্রাট।

মাইহার ঘরানার প্রবর্তন: আলাউদ্দিন খাঁ সরোদে বিশেষত্ব অর্জন করেন। সহজাত প্রতিভাগুণে তিনি সরোদবাদনে ‘দিরি দিরি’ সুরক্ষেপণের পরিবর্তে ‘দারা দারা’ সুরক্ষেপণ-পদ্ধতি প্রবর্তন করেন। সেতারে সরোদের বাদনপ্রণালী প্রয়োগ করে সেতারবাদনেও তিনি আমূল পরিবর্তন আনেন। এভাবে তিনি সঙ্গীতজগতে এক নতুন ঘরানার প্রবর্তন করেন, যা ‘আলাউদ্দিন ঘরানা’ বা  ‘মাইহার ঘরানা’ নামে পরিচিতি লাভ করে। যোগ্য শিষ্য তৈরি তাঁর এক বিশাল কীর্তি। তাঁর সফল শিষ্যদের মধ্যে তিমিরবরণ, পুত্র আলী আকবর খান, জামাতা পন্ডিত রবিশঙ্কর, ভ্রাতুষ্পুত্র বাহাদুর হোসেন খান, কন্যা রওশন আরা বেগম (অন্নপূর্ণা), পান্নালাল ঘোষ প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য। আলাউদ্দিন খাঁ সাহেবের পরামর্শ ও নির্দেশে কয়েকটি নতুন বাদ্যযন্ত্র উদ্ভাবিত হয়। সেগুলির মধ্যে ‘চন্দ্রসারং’ ও ‘সুরশৃঙ্গার’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

সমাজসেবামূলক কাজও করেছেন এই সুরের জাদুকর। শিবপুর গ্রামে তিনি একটি মসজিদ নির্মাণ করেন এবং পানি পানের জন্য একটি পুকুর খনন করিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর নির্মিত মসজিদটি এখনও তাঁর স্মৃতিবহন করে চলছে। মাইহার রাজ্যে ‘মাইহার কলেজ অব মিউজিক’ প্রতিষ্ঠা তাঁর সঙ্গীত জীবনের এক শ্রেষ্ঠ অবদান।

বিশ্ববরেণ্য সুর সম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সঙ্গীত আশ্রম করার লক্ষ্যে ১৯৫৭ সনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের জেল রোডে প্রায় ৪২ শতাংশের একটি বাড়ি কেনেন। তার ছোট ভাই ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁকে অধ্যক্ষ করে আলাউদ্দিন খাঁ মিউজিক কলেজ নামে কার্যক্রম শুরু হয়। কয়েকবছর এর কার্যক্রম চালানোর পর তিনি কুমিল্লায় চলে গেলে এর কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। পরে ১৯৭৫ সালে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর সন্তান আলী আকবর খাঁর অনুরোধে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আসেন। তত্কালীন মহকুমা প্রশাসক তোফায়েল আহমেদ চৌধুরীর সহযোগিতায় সুরসম্রাট আলা্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্উদ্দিন খাঁ সঙ্গীতাঙ্গন নাম দিয়ে পুনরায় কার্যক্রম শুরু করেন। সেই থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় শুদ্ধ সঙ্গীতের শিক্ষা দেওয়া শুরু হয়।

ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সৃষ্ট কিছু রাগরাগিনী:খাঁ সাহেব অনেক রাগ-রাগিণীও সৃষ্টি করেন। যেমন: হেমন্ত, দুর্গেশ্বরী, মেঘবাহার, প্রভাতকেলী, হেম-বেহাগ, মদন-মঞ্জরী, মোহাম্মদ(আরাধনা), মান্ঝ খাম্বাজ, ধবলশ্রী, সরস্বতী, ধনকোশ, শোভাবতী, রাজেশ্রী, চন্ডিকা, দীপিকা, মলয়া, কেদার মান্ঝ, ভুবনেশ্বরী ইত্যাদি। তিনি স্বরলিপিতে সিদ্ধহস্ত ছিলেন।

সম্মাননা:ভারত সরকার তাঁকে একে একে ‘সঙ্গীত নাটক আকাদেমী সম্মান’ (১৯৫২), ‘পদ্মভূষণ’ (১৯৫৮) ও ‘পদ্মবিভূষণ’ (১৯৭১); বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় ‘দেশিকোত্তম’ (১৯৬১) এবং দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় ‘ডক্টর অব ল’ উপাধিতে ভূষিত করে। ১৯৫৪ সালে তিনি ভারত সরকার কর্তৃক প্রথম সঙ্গীত নাটক আকাদেমীর ফেলো নির্বাচিত হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ্ মুসলিম হল তাঁকে আজীবন সদস্যপদ দান করে। তিনি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আমন্ত্রণে শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতীতে আমন্ত্রিত অধ্যাপক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। এসব দুর্লভ সম্মান ও খেতাব সঙ্গীতবিদ্যায় আলাউদ্দিন খাঁর অসাধারণ কীর্তি ও সাফল্যকেই সূচিত করে।

ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর তালিমের গুণে তাঁর পুত্র সরোদশিল্পী ওস্তাদ আলী আকবর খান বিশ্ববিখ্যাত হয়েছেন। ভারত সরকার কর্তৃক ‘পদ্মভূষণ’ ও ‘পদ্মবিভূষণ’ এবং তাঁর জামাতা সেতারশিল্পী পন্ডিত রবিশঙ্কর বিশ্বখ্যাত হয়েছেন এবং ভারত সরকার কর্তৃক ‘পদ্মভূষণ’, ‘পদ্মবিভূষণ, ও ‘ভারতরত্ন’ উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন।