বাঙালি দীন মাহোমেদকে নিয়ে গুগলে কেন এত কৌতূহল!

আপডেট : ১৮ জানুয়ারি ২০১৯, ২৩:১১

১৫ জানুয়ারি গুগলের সার্চ পেজ খুলতেই ভেসে উঠেছিল কিছু লতাপাতা, কয়েক রকমের মশলা আর একটি বোতলের ছবি। বোতলের মাঝখানে এক ব্যক্তির মুখের ছবি। এটাই ছিল সেদিনের গুগল ডুডল। ডুডলে মাউস ছোঁয়াতেই লেখা এলো 'Celebrating Sake Dean Mahomed'। তারপরেই মানুষ খুঁজতে শুরু করে লোকটি সম্পর্কে তথ্য। দিনের শেষে গুগল ট্রেন্ডিংয়ের হিসাবে দেখা গেল সারাদিনে ওই নামটিই ছিল ভারতে সবচেয়ে বেশি গুগল করা বিষয়। কেবল ভারত থেকে এক কোটিরও বেশি মানুষ এই নামটি সার্চ করেছেন। শেখ দীন মাহোমেদ সম্পর্কে এতো মাতামাতির প্রধান কারণ ছিল, তিনিই ছিলেন প্রথম ভারতীয় লেখক যিনি ইংরেজি ভাষায় বই লিখে প্রকাশ করেছিলেন। সেই বই প্রকাশকেই সম্মান জানাতে গুগল বানিয়ে ছিল ওই ডুডল।

উইকিপিডিয়া সহ নানা সূত্র থেকে শেখ দীন মাহোমেদ সম্পর্কে জানা গেছে বিস্ময়কর এক মানুষের জীবন কাহিনী। ভারতের বিহার রাজ্যের এক ছোট্ট জনপদের নরসুন্দর পরিবারের ছেলে দীন মাহোমেদ ভাগ্যচক্রে হয়ে  উঠেছিলেন ইংল্যান্ডের রাজা ষষ্ঠ জর্জের ব্যক্তিগত সহচরদের একজন। ১৭৫৯ সালে পাটনা শহরে জন্ম হয়েছিল দীন মাহোমেদের। বর্তমানের বিহার রাজ্যের রাজধানী পাটনা সেই সময়ে ছিল বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অধীন। তার পরিবারের আদি বাস ছিল বক্সার জেলায়। পাটনায় থাকলেও দীন মাহোমেদ ছিলেন একজন বাঙালি। ‘কারিলাইফ’ পত্রিকার সম্পাদক সৈয়দ বেলাল আহমেদ এই তথ্য জানান।

দীন মাহোমেদ খুব কম বয়সে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিতে কাজ নিয়েছিলেন। সেখানেই তিনি নানা ধরনের রাসায়নিক দিয়ে ক্ষার আর সাবান তৈরি করতে শেখেন। বাবার মৃত্যুর পরে মাত্র দশ বছর বয়সে ক্যাপ্টেন ‘গডফ্রে এভান বেকার’ নামের এক ব্রিটিশ অফিসার দীন মাহোমেদকে দায়িত্ব নেন। তার সহযোগিতায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেনাবাহিনীতে চাকরিও জুটে যায়।

১৭৭২ সালে ওই ব্রিটিশ ক্যাপ্টেন সেনাবাহিনী থেকে পদত্যাগ করেন। তিনি ইংল্যান্ডে ফিরে যাওয়ার সময় দীন মাহোমেদকেও সঙ্গে নিয়ে যান। লন্ডনে বেশ কয়েক বছরে থাকার পরে ১৭৮৪ সালে ক্যাপ্টেন বেকারের পরিবারের সঙ্গেই দীন মাহোমেদ আয়ারল্যান্ডে চলে যান। ভালো করে ইংরেজি শেখার জন্য ভর্তি হন একটি স্থানীয় স্কুলে। সেখানেই প্রেমে পড়েন জেন ডেলি নামের এক সম্ভ্রান্ত প্রটেস্ট্যাণ্ট পরিবারের মেয়ের। মেয়েটির পরিবার তাদের সম্পর্ক মেনে না নেয়ায় ১৭৮৬ সালে পালিয়ে দুই জনে বিয়ে করেন।

বিয়ের বেশ কয়েক বছর পরে ১৭৯৪ সালে তিনি নিজের ভ্রমণ কাহিনী প্রকাশ করেন - ‘দা ট্র্যাভেলস অব দীন মাহোমেদ’। সেটিই ছিল প্রথম কোনও ভারতীয়ের লেখা ইংরেজি বই, আর ওই বইয়ের স্মরণেই গুগলের ডুডল। বইয়ের শুরু হয়েছিল চেঙ্গিস খান আর প্রথম মুঘল সম্রাট বাবরে স্তুতি দিয়ে - তারপরে রয়েছে নানা শহরে নিজের ভ্রমণের কথা, আবার লিপিবদ্ধ করেছেন সেই সময়কার নানা যুদ্ধের বর্ণনাও।

১৮১০ সালে লন্ডনে শেখ দীন মাহোমেদ প্রথম ভারতীয় রেস্তোরাঁটি খোলেন। পোর্টম্যান স্কয়ারের কাছে জর্জ স্ট্রিটে অবস্থিত ওই রেস্তোরাঁর নাম ছিল ‘হিন্দোস্তানী কফি হাউস’। তবে ভারতের সংবাদ সংস্থা পিটিআই গত বছর একটি খবরে লিখেছিল, ১৮০৯ সালে পোর্টম্যান স্কয়ারের ওই রেস্তোরাঁর নাম ছিল ‘হিন্দোস্তানী ডিনার অ্যান্ড হুক্কা স্মোকিং ক্লাব’। সেই রেস্তোরাঁয় আসল ভারতীয় মশলা দিয়ে রান্না হত সম্পূর্ণ দেশীয় রেসিপির নানা পদ। সেই প্রথম ইংল্যান্ডের মানুষ পেয়েছিল ভারতীয় ‘কারি’র স্বাদ।

রেস্তোরাঁ ব্যবসার পরে দীন মাহোমেদ মনোযোগ দেন ‘শ্যাম্পুইং’য়ের দিকে। ছোটবেলায় যে সাবান আর ক্ষার তৈরির বিদ্যা শিখেছিলেন, সেটাই কাজে লাগিয়ে ব্রিটিশদের ভারতীয় কায়দায় স্নান করা শেখাতে শুরু করেন। যেটাকে সাধারণত দক্ষিণ এশিয়ায় মাসাজ বলা হয়, সেই ভাবেই ‘ভেপার ম্যাসিওর বাথ’-এর জন্য ব্রাইটনে একটি দোকান খোলেন তিনি। স্থানীয় কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে জানিয়ে ছিলেন ভারতীয় ভেষজ-বাষ্প দিয়ে স্নান করলে কী কী রোগ সারতে পারে। এই ব্যবসাটাও কিছু দিনের মধ্যেই খুব জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, আর তাকে বলা হতে থাকে ‘ডক্টর ব্রাইটন’। এমনকি হাসপাতালগুলো থেকেও তার কাছে রোগী পাঠানো হতে থাকে - মূলত গাঁটের ব্যথা, বাত এসবের প্রতিকারের জন্য। তার ‘শ্যাম্পু’ চিকিত্সা বা মাসাজের সুফল জানতে পেরে রাজা ষষ্ঠ জর্জ এবং চতুর্থ উইলিয়াম শেখ দীন মাহোমেদকে ব্যক্তিগত ‘শ্যাম্পুইং সার্জেন’ হিসাবে নিয়োগ দিয়েছিলেন।

মাহোমেদ দম্পতির সাতটি ছেলে-মেয়ে ছিল। এক নাতি, ফ্রেডেরিক হেনরি হোরাশিও আকবর মাহোমেদ ছিলেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চিকিত্সক। উচ্চ রক্তচাপ সংক্রান্ত গবেষণায় তার অবদান এখনও স্মরণ করা হয় চিকিত্সা বিজ্ঞানে। শেখ দীন মাহোমেদ ১৮৫১ সালে মারা যান। পরে তাকে দাফন করা হয় ব্রাইটনের সেন্ট নিকোলাস চার্চে।-বিবিসি