গেটম্যানের অবহেলায় ঝরল ১২ প্রাণ

আপডেট : ১৯ ডিসেম্বর ২০২০, ২৩:৩২

রেললাইনের গেটম্যানের দায়িত্বে অবহলোয় জয়পুরহাটের পুরানাপৈল রেলগেট এলাকায় ট্রেন ও বাসের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। গতকাল শনিবার ভোর ৬টা ৫৫ মিনিটে রাজশাহীগামী উত্তরা এক্সপ্রেস ট্রেন ও বাঁধন পরিবহনের একটি বাসের মধ্যে এ সংঘর্ষ হয়েছে। এতে বাসের ১২ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এ ঘটনায় রেলওয়ে ও জেলা প্রশাসন দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। প্রাথমিক তদন্তে গেটম্যানের অবহলোয় এ দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।    

নিহতরা হলেন : দুই ভাই সারোয়ার হোসেন বাবু (৩২) ও আরিফুর রহমান রাব্বি (৩৪), রমজান আলী (৩৮), সাজু মিয়া (২৮) ও শফিকুল ইসলাম বাবু (৩৫), আবুল লতিফ (২৭), সুমন (১২), মঞ্জুরুল ইসলাম নাসিম (২৪), রেজাউল করিম রেজা (৪৩), সাইদুল ইসলাম (৩৪), জুলহাস উদ্দিন (২৫) ও জিয়াউর রহমান (১৯)। নিহতদের লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।                 জানা গেছে, জেলা সদর থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে পুরানাপৈল রেলগেট। গতকাল ভোর ৬টায় ট্রেনটি প্রচণ্ড শক্তিতে হিলিগামী যাত্রীবাহী বাসটিকে ধাক্কা দেয়। বাসটি স্বাভাবিক অবস্থা থেকে এক দিকে কাত হয়ে পড়ে। রেললাইনের ওপরে সেই অবস্থাতেই বাসটিকে ঠেলে সামনে নিয়ে যায়।

প্রত্যক্ষদর্শী পুরানাপৈল বাজারের নৈশপ্রহরী ফুলবর মিয়া, প্রতিবেশী আবুল হাসনাত, আবু হোসেন, সাইফুল ইসলাম জানান, বাসটিকে ধাক্কা মেরে প্রায় ৫০০ গজ দূরে নিয়ে যায়। লাইনচ্যুত হওয়ার পর ট্রেনটি আটকে যায়। ততক্ষণে বাসটি মাঝ বরাবর দুমড়েমুচড়ে চ্যাপটা হয়ে যায়। খবর পেয়ে জয়পুরহাট ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে যান। স্থানীয়দের সহযোগিতায় তারা উদ্ধার কাজ শুরু করেন। এ সময় পুলিশ, র্যাব ও বিজিবি সদস্যরাও সহযোগিতা করেন।

স্থানীয় ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক খন্দকার ছানাউল হক জানান, দুর্ঘটনা কবলিত বাসের ভেতর ছয় জনের লাশ পাই। বাইরে পড়ে ছিল চার জনের লাশ। সেগুলো উদ্ধার করে মর্গে নেওয়া হয়।  দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত পাঁচ জনকে প্রথমে জেলা আধুনিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিত্সার জন্য তাদের বগুড়া শহিদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। বগুড়া নেওয়ার পথে আরো দুই জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানান জেলা আধুনিক হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. রাশেদ মোবারক।

রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চলের জেনারেল ম্যানেজার মিহির কান্তি গুহ জানান, রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চল থেকে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটির প্রধান বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা নাসির উদ্দিন। অন্য সদস্যরা হলেন : বিভাগীয় যন্ত্র প্রকৌশলী আশিস কুমার, বিভাগীয় প্রকৌশলী-২ আব্দুর রহিম ও বিভাগীয় মেডিক্যাল অফিসার শাকিল আহমেদ।  আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে কমিটিকে। প্রাথমিকভাবে গেটম্যানদের দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ পাওয়া গেছে। তদন্ত রিপোর্ট পাওয়ার পর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অপরদিকে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ রেজা হাসানকে প্রধান করে তিন সদস্যবিশিষ্ট আরেকটি তদন্ত কমিটি করেছে জেলা প্রশাসন। জেলা প্রশাসক মো. শরীফুল ইসলাম জানান, আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে গেটম্যানের দায়িত্বে অবহেলার সত্যতা পাওয়া গেছে বলেও জানান তিনি। ঘটনার পর থেকে গেটম্যান তিন জনই পলাতক রয়েছেন।

পাবর্তীপুর ও পাকশী  থেকে আসা উদ্ধারকারী ট্রেন উদ্ধারকাজ সমাপ্ত করে। দুপুর ২টা ৪০ মিনিট থেকে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়। দুর্ঘটনার খবর পেয়ে তাত্ক্ষণিক জয়পুরহাটের জেলা প্রশাসক শরীফুল ইসলাম, পুলিশ সুপার সালাম কবির, সৈয়দপুর রেলওয়ের পুলিশ সুপার সিদ্দিকী তানজিলুর রহমান, জয়পুরহাট সদরের ইউএনও মিল্টন চন্দ্র রায়, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তরিকুল ইসলামসহ পুলিশ ও রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। 

উল্লেখ্য, ২০০৬ সালের ১১ জুলাই আক্কেলপুর বঙ্গবন্ধু মহিলা কলেজসংলগ্ন আমট্ট রেলক্রসিংয়ে বাস-ট্রেন সংঘর্ষে প্রাণ হারান ৩৫ জন।  আহত হন ৪০ জন।

 

 

 

জয়পুরহাট :স্থানীয় পুরানাপৈল রেলগেট ছিল অরক্ষিত। ছিল না গেটম্যান। যাত্রীবাহী বাস না বোঝে ওঠে যায় রেললাইনে। মুহূর্তেই সেখানে চলে আসা আন্তঃনগর উত্তরা এক্সপ্রেসের ধাক্কায় দুমড়েমুচড়ে যায় বাস   —ইত্তেফাক