পাকিস্তানের ২৪ বছরের ইতিহাসে শাসন-শোষণ-নিপীড়ন-নির্যাতন অসহ্য অসহনীয় হয়ে উঠলে অস্ত্রের মুখে স্বাধিকারের ডাক এসেছিল ‘জাগো বাঙ্গালী জাগো’। আর এই রণধ্বনির স্ফুলিঙ্গ সেদিন আকাশ-বাতাসে প্রকম্পিত করার কাজ করেছিল আজকের এই ইত্তেফাক। বস্তুতপক্ষে আমাদের স্বাধীনতাসংগ্রাম, বঙ্গবন্ধু এবং স্বাধীনচেতা জনগণের প্রত্যাশা ছিল পরিপূরক। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে ইত্তেফাকের আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা অপরপ্রান্তে চলমান লোমহর্ষক ঘটনায় ইত্তেফাকের বলিষ্ঠ অবদান অনস্বীকার্য।
জাতি ও রাষ্ট্রগঠনে বিবেকের আদালতে থেকে ইত্তেফাককে বিচ্যুতি করতে পারেননি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। শত প্রতিকূলতা আর চাপের মুখোমুখি হয়ে কাজ করেছিলেন আজকের এই দৈনিকটি। সামরিক আইনকে লঙ্ঘনের অভিযোগে ১৯৫৯ সালে মানিক মিয়াকে গ্রেফতার করা হয়। এক বছর জেল খাটতে হয় তাকে। ৬৩ সালে পুনরায় গ্রেফতার হন তিনি। ঐ সময় ইত্তেফাকের প্রকাশনা নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। বাজেয়াপ্ত করা হয় নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস। এরই মধ্যে ওনার আর দুটি পত্রিকা ঢাকা টাইমস ও পূর্বাণী বন্ধ হয়ে যায়। তত্কালীন আইয়ুব সরকার ১৯৬৬ সালে ৬ দফাকে ব্যাপকভাবে সমর্থনের কারনে ১৯৬৯ ফ্রেব্রুয়ারি পর্যন্ত জনপ্রিয় এই পত্রিকার প্রকাশনা ও প্রচারণা বন্ধ করে দেয়। এই সময়কালের মধ্যে চলে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা। ইত্তেফাক ও মানিক মিয়াকে আইয়ুব সরকার শত রুদ্ররোষেও দমিয়ে রাখতে পারেনি। মানিক মিয়ার ইত্তেফাকের দেখানো পথে জ্বলে ওঠে বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী জনসমাজ। গণ-আন্দোলনের মুখে আইয়ুব খান ইত্তেফাকের ওপর থেকে বাধানিষেধ প্রত্যাহার করতে বাধ্য হন। ইত্তেফাকের মুসলিম লীগবিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলা, আওয়ামী লীগকে সাংগঠনিকভাবে সুসংহতকরণ, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বৈষম্য ও কেন্দ্রীয় শাসকগোষ্ঠীর বিমাতাসুলভ আচরণের মুখোশ উন্মোচনে সামনে থেকে নেতৃত্বে দিয়েছে এই পত্রিকাটি। ইত্তেফাক ছাড়া বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও আওয়ামী লীগকে সুসংহতকরণ অসম্ভব ব্যাপার হতো। আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি জড়িত না থেকেও তিনি উপদেষ্টা হিসেবেই বিবেচিত হয়েছিলেন। ’৫৭ সালের কাগমারী সম্মেলনের পর মানিক মিয়া বঙ্গবন্ধু ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর পক্ষাবলম্বন করেন। তিনিও মানিক মিয়াকে সুখে দুঃখে পাশে রেখেছিলেন, ডেকেছিলেন সব কাজেই। সদ্য প্রতিষ্ঠিত ন্যাপ ও শেরেবাংলা ফজলুল হকের সঙ্গে বৈরী সম্পর্ক তৈরি হয়। এই স্বার্থ ছিল আদর্শিক স্বার্থ।
মানিক মিয়া একজন কলমযোদ্ধা, ইত্তেফাক সম্পাদক ও মালিক হিসেবে তিনি শেখ মুজিবের জন্য রীতিমতো যুদ্ধ চালিয়েছেন। শেখ মুজিব মানিক মিয়ার থেকে বয়সে ছোট হলেও তাদের মধ্যে সম্পর্কটা ছিল সুহূদ। মানিক মিয়া শেখ মুজিবকে স্নেহ করে ‘মুজিব মিয়া বলে ডাকতেন’ শেখ মুজিব ওনাকে ‘মানিক ভাই’ বলে ডাকতেন। মানিক মিয়া তার লেখনীর মাধ্যমে মুজিবকে বাংলাদেশের প্রতীক হিসেবে ফুটিয়ে তুলতে নিরলস কাজ করে গেছেন। শেখ মুজিবের নানা চড়াই-উতরাইয়ে শেষ আশ্রয়স্থল ছিল মানিক মিয়া ও ইত্তেফাক পত্রিকা। মুজিব-মানিকের ঘনিষ্ঠতা প্রকাশ্যে-অপ্রাকাশ্যে দুই ভাবেই দৃশ্যমান ছিল। ১৯৬৮ সালের ১৯ অক্টোবরে আওয়ামী লীগের সম্মেলন অধিবেশনে বঙ্গবন্ধু ক্যান্টনমেন্টে বন্দি ছিলেন। অনুষ্ঠিত সভায় বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে সভাপতিত্ব করেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম। সম্মেলন সভার প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইত্তেফাকের সম্পাদক তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া। ইতিমধ্যে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা চলাকালীন ইত্তেফাক আসামিদের পক্ষাবলম্বনে ভূমিকা রাখলেও মানিক মিয়ার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে তত্কালীন আইয়ুব সরকারের গদির নড়বড়ে অবস্থার কারনে তারা ইত্তেফাকের প্রতি দমন-পীড়ন অবস্থা থেকে ক্ষাণিকটা সরে আসে। ’৬৯-এর ৬ ফেব্রুয়ারি চাপের মুখে দেশের জরুরি অবস্থার কথা শিথিলতার ব্যাপারে সাংবাদিকদের অবহিত করে তত্কালীন সরকার। ফলত ৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ সালের দৈনিক ইত্তেফাকের ‘নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস’-এর ওপর থেকে বাজেয়াপ্ত আদেশ প্রত্যাহার ও গোলটেবিলে আলোচনার প্রস্তাব গৃহীত হয়। কিন্তু সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়, আগরতলা মামলা প্রত্যাহার ও শেখ মুজিব ছাড়া আওয়ামী লীগ কোনো গোলটেবিলে যোগ দেবে না। এর কিছুদিন পর হঠাত্ আগরতলা মামলার অন্যতম আসামি সার্জেন্ট জহুরুল হককে ক্যান্টনমেন্টের ভেতরেই নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়। দেশ জুড়ে বিদ্রোহের আগুন ছড়িয়ে পড়ে। দেশে গণ-অভুত্থান হয়ে যায়। ২২ ফেব্রুয়ারি চাপের মুখে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে মুজিবকে মুক্তি দেওয়া হয়। গণ-অভ্যুত্থান ও মুজিবের মুক্তি নিয়ে ইত্তেফাকে নিউজ হয়—‘পূর্ব বাংলার মাটিতে অবশেষে বাঙ্গালীদের কারাগার ধসিয়া পড়িয়াছে। জনতার জয় হইয়াছে। গণদাবীর নিকট নতি স্বীকার করিয়া দোর্দণ্ডপ্রতাপে সরকার তথাকথিত আগতরতলার ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করিয়া পূর্ব বাংলার অগ্নিসন্তান, দেশ গৌরব আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানসহ এই মামলায় অভিযুক্ত সকলকে কুর্মিটোলা সামরিক ছাউনির বন্দী নিবাস হইতে বিনা শর্তে মুক্তি দিতে বাধ্য হইয়াছেন।’ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা এবং শেখ মুজিবের মুক্তি নিয়ে ইত্তেফাকের কর্ণধার মানিক মিয়া সম্পাদকীয় কলামে লিখেছিলেন—‘জয় নিপীড়িত জনগণের জয়, জয় নব উত্থান। আজ উত্সবের দিন নয়, বিজয়ের দিন। আজ আনন্দের দিন নয়, স্মরণের দিন। তথাকথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহূত হইয়াছে। দুঃশাসনের কারান্তরীন হইতে দেশের প্রিয় সন্তান শেখ মুজিব অন্যান্য বন্দীর সঙ্গে যুক্ত হইয়া আবার তাঁর দেশবাসীর মাঝে ফিরিয়া আসিয়াছেন। শহিদী ঈদে আমাদের অভিযান সফল হইয়াছে। গণজাগরণের প্রবল শ্রাবণের পলিমাটিতে রক্তাক্ষরে লিখিত হইয়াছে নূতন এক ঊষার স্বর্ণদুয়ার উন্মুক্ত করার অবিস্মরণীয় কাহিনী। এই কাহিনী অসংখ্য শহীদের আত্মদানের, অসংখ্য বীরমাতা ও বীরজায়ার অশ্রু ও হাহাকার সংবরণের কাহিনী...।’
এমন সার্বিক বিষয়ে জাতি ব্যাপক মনোবল সমৃদ্ধ হয়ে এগিয়ে যেতে থাকে। অবশেষে ১০ই মার্চ রাওয়ালপিন্ডিতে গোলটেবিলে শেখ মুজিবের অনড় অবস্থান দেখে আইয়ুব খান ইয়াহিয়া খানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। কৌশলগত কারণেই মানিক মিয়া সম্পাদকীয় ছাড়াও ইত্তেফাকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শোষণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে ‘রাজনৈতিক মঞ্চ’ ও পরবর্তী সময়ে ‘মঞ্চে নেপথ্যে’ কলামে ‘মোসাফির’ ছদ্মনামে নিয়মিত উপসম্পাদকীয় লিখতেন। এছাড়াও ‘মিঠেকড়া ভিমরুল’ কলামটিও ওনার লেখা ছিল বলে অনেকের ধারণা। ৩১ মার্চ ইয়াহিয়া খান প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণার পরেও এসবের তথ্য ইঙ্গিত দিয়ে তিনি লেখেন—‘সাধারণভাবে সামরিক শাসনব্যবস্থা কাহারো কাম্য নয়। জেনারেল ইয়াহিয়া বক্তৃতায় তাহা প্রকাশ পাইয়াছে। প্রেসিডেন্ট আইয়ুবের ১০ বছরের স্থায়ী স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে জনগণ এতই বিক্ষুব্ধ ও মারমুখী হইয়া উঠিয়াছিল যে, তিনি আগামী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হইবেন না...।’
ইত্তেফাকের সম্পাদক মানিক মিয়া ওনার অনেক লেখনীতে ফুটিয়ে তুলেছেন একটি অবাধ সাধারণ নির্বাচনের ব্যবস্থার কথা। দেশের কল্যাণ ও যোগ্য নেতৃত্বে একদিন পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীনতার স্বাদ আস্বাদন করবে। প্রত্যাশিত ও লালিত স্বপ্নটি বুকে নিয়ে সবাইকে কাঁদিয়ে মানিক মিয়া হঠাত্ ওপারে চলে গেলেন। আহূত মুজিব মানিক মিয়াকে হারিয়ে বলেছিলেন, ‘মরহুম মানিক মিয়া শুধু একজন দেশপ্রেমিক ও সাংবাদিকই ছিলেন না, মানিক ভাই ছিলেন আমার পথপ্রদর্শক। তাঁহার আকস্মিক ইন্তেকালে আমার অপূরণীয় ক্ষতি হইল।’ (দৈনিক ইত্তেফাক, ২রা জুন, ১৯৬৯)। স্বাধীনতার পরবর্তী ও পূর্ববর্তী সময়ে ইত্তেফাকের গণমুখী অধিকার প্রতিষ্ঠার অবদানের কথা ভুলবার সুযোগ নেই। সুতরাং দেশ জাতি গঠনে স্বাধীনতার স্বাদ আস্বাদনে নীরবে থেকে কাজ করে গেছেন মহান এই মানুষটি। বিজয়ের এই মাসে আনন্দের পাশাপাশি আমাদের সেইসব মানুষকে স্মরণ করা উচিত এবং তাদের প্রতি যে আমরা ঋণী হয়ে আছি সেটা মনে রাখা উচিত, যাতে আমরা তাদের আকাঙ্ক্ষিত সমাজ গড়তে পারি। যেটা আমাদের বাহাত্তরের মহান সংবিধানে তুলে ধরা হয়েছে। যে মূল্যবোধ লিপিবদ্ধ করা হয়েছে সংবিধানে তাতে স্বাক্ষর করেন বঙ্গবন্ধু, তার সহকর্মী তাজউদ্দীন এবং অন্য নেতৃবৃন্দ। সেটি আমাদের কাছে একটা দলিল হিসেবেই রয়ে গেছে। ওটা দেখলেই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য কী ছিল তা আমরা দেখতে পাই। সেই লক্ষ্য ও মৌলিক কর্তব্য এখনো আমাদের মধ্যে আছে এবং সেই লক্ষ্য পুরোপুরি অর্জন না করা পর্যন্ত আমাদের ঐক্যকে আরো সুসংগত করতে হবে এবং ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন করার জন্য আমাদের কাজ করে যেতে হবে।
লেখক : সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও রাজনীতিক।
