৪৯ বছর ৯ মাস আগের কথা-১৯৭১ সালের মার্চ মাস-আমার বয়স যখন ১৬ বছর ৪ মাস তখন বাংলাদেশের জনগণ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে এক মরণপণ সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পর যে যুদ্ধ আমরা শুরু করেছিলাম তা ছিল অনেকখানি ‘যার যা কিছু আছে’ তা নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ার মতো এক যুদ্ধ। অনেক ‘বিজ্ঞ লোক’ তখন ভেবেছিলেন যে, বাঁশের লাঠি দিয়ে সর্বাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে বাঙালিরা কখনোই যুদ্ধে জিততে পারবেন না। কিন্তু আমার মতো কোটি কোটি আবেগদীপ্ত তরুণ-কিশোর তখন ভেবেছিল, আর নয়, যথেষ্ট হয়েছে— এবার ‘করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে’! পরে ইতিহাস পড়ে বুঝেছি যে, ‘জনগণের শক্তি’ কত বিরাট শক্তি। রবার্ট ম্যাকনামারাকেও স্বীকার করতে হয়েছিল যে, শতশত মেগাটন বোমা ফাটিয়েও ভিয়েতনামের জনগণের আদর্শ ও চেতনাকে পরাজিত করা সম্ভব নয়। চীনেও ‘বোকা বুড়োরাই’ পাহাড় সরাতে সক্ষম হয়েছিলেন। আর ল্যাটিন আমেরিকায় আবার মৃত চে-র পুনরুত্থান হচ্ছে, আমরা দেখছি। এসবই প্রমাণ করে জনগণের প্রকৃত উত্থানকে কোনো শক্তিই দাবিয়ে রাখতে পারে না। প্রগতির চাকা সাময়িকভাবে থেমে যেতে পারে, এমনকি পিছিয়েও যেতে পারে কিন্তু কখনোই তা স্থায়ীভাবে থামেনি, ভবিষ্যতেও থামবে না। এগিয়ে সে যাবেই। জীবন আছে বলেই তার সঙ্গে ছায়ার মতো মৃত্যুও থাকে। কিন্তু প্রগতিশীল মানুষের জন্য মৃত্যু শেষ কথা নয়, জীবনই শেষ কথা!
মুক্তিযুদ্ধে জনগণের উত্থান
আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ছিল প্রকৃত অর্থে একটি জনযুদ্ধ। বাঙালি জাতির সব শ্রেণির সব সদস্যই এর পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন। এমনকি যারা পাকিস্তানি শাসক শ্রেণির অনুগ্রহপুষ্ট সুবিধাভোগী ছিলেন তারাও ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংস আক্রমণের পর আর স্থির থাকতে পারেননি, স্বাধীনতার পক্ষে চলে এসেছিলেন। একমাত্র ‘অন্ধ মৌলবাদী’ ও মুষ্টিমেয় দালাল ছাড়া কেউই পাকিস্তানের ঐ নৃশংস আক্রমণকে মানতে পারেনি। অন্ধ কিছু সুবিধাবাদী অবশ্য শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ছিল। তারা ‘মার্কটাইম’ করছিলেন। যেদিকে জিতবে সেদিকেই যাবেন— এটাই ছিল তাদের চিন্তা। খোদ আমেরিকা, চীন ও সৌদি আরবের জনগণও শত অপপ্রচার সত্ত্বেও তাদের শাসক শ্রেণির বিরূপ ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান উপেক্ষা করে বাংলাদেশের জনগণের মুক্তিসংগ্রামের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন। এইভাবে বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে ১৯৭১ সালে গড়ে উঠেছিল বিশ্বমানবতার এক অপূর্ব ঐক্যতান! প্রকৃতপক্ষে ২৫ মার্চ তারিখেই পাকিস্তানের ললাটে পরাজয়ের বিধিলিপিটি লেখা হয়ে গিয়েছিল। মনে পরে, যুদ্ধ চলাকালে অল্পদিন পরেই এক পাকিস্তানি সাধারণ সৈনিকের হতাশোক্তি,
‘যাব আওয়াম আপকা সাথ নেহি
রাহেগা—জংমে আপ ক্যায়েসে জিতেগা?’
‘যখন জাতি আপনার সঙ্গে থাকবে না
— তখন আপনি যুদ্ধে কি ভাবে জিতবেন?’
g মুক্তিযুদ্ধের ‘ইস্পাত তৈরি হয়েছিল কীভাবে?
আমরা অনেকেই পাভেল করচাগিবের কথাও ‘ইস্পাত’ উপন্যাসটি মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তীতে পড়ে থাকব। মহত্ ঘটনা ঘটানোর মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষের চরিত্রও কীভাবে পরিবর্তিত হয়ে মহত্ হয়ে উঠে তার একটি অনবদ্য বর্ণনা ঐ উপন্যাসে রয়েছে। বাংলাদেশে একসময় প্রচলিত একটি স্লোগান ছিল— ‘বদলে দাও-বদলে যাও’। আমার মনে হয়, মার্কসের ফয়েরবাখের ওপর ১১টি থিসিসের (‘Theses on Feurbach’-Marx) নির্যাসও তাই! পুরোনো পরিস্থিতিকে পুরোনো মানুষরাই বদলায়। আবার এই বদলাতে যেয়ে পুরোনো মানুষদের নিজেকেই বদলে ফেলতে হয়! যে কোনো মহাসংগ্রাম একটি আগুনের মতো। যে আগুন শুধু ধ্বংসই করে না, আগুনে পুড়ে পুড়ে লোহাকে ইস্পাতেও পরিণত করে। পৃথিবীর সব মহাযুদ্ধের মধ্যেই—প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, অসংখ্য মুক্তিযুদ্ধ বা আরো আগে প্রাচীণকালের গ্রিক যুদ্ধ থেকে শুরু করে কুরু-পান্ডবের কুরুক্ষেত্র, সবগুলো যুদ্ধের মধ্যেই আমরা শুধু ধ্বংস এবং অশান্তি দেখলে ভুল করব। ঐ সব ধ্বংসের আড়াল থেকে মহত্ সৃষ্টি সব সময়ই উঁকি মেরেছে, আমরা দেখতে পেয়েছি জনগণের অসাধ্য কিছুই নেই। মানুষের মধ্যেই রয়েছে সুর, রয়েছে অসুর। রয়েছে দানব, রয়েছে দেবতা। দানবের মন্থন থেকেই দেবতার উদ্ভব হয়েছে। বদলে দেওয়ার মহত্ সংগ্রামের মাধ্যমেই আমরা নিজেদেরকেও মহত্ মানুষে পরিণত করছি। নিজেদেরকে বদলে দিচ্ছি।
g একটি ‘খাবারের’ কথা
সম্ভবত ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাস। আমরা তখন গোকুলনগর ট্রানজিট ক্যাম্পে ঠান্ডা শীতে ঠি-ঠি করে কাঁপছি এবং অপেক্ষা করছি কখন ডাক আসবে—কখন মুক্তিযুদ্ধে প্রশিক্ষণের জন্য ট্রানজিট ক্যাম্প ছেড়ে ট্রেনিং ক্যাম্পে যেতে পারব। মনে একটিই বাসনা ‘ট্রেনিং নিয়ে বন্দুক হাতে দেশে যাব, যুদ্ধ করব।’ অন্যদিকে পাকিস্তানি বাহিনী তখন দ্রুত একের পর এক হার মানছে এবং পশ্চাত্পসরণ করতে শুরু করেছে। ভারত থেকে দলে দলে মুক্তিযোদ্ধারা দেশের ভেতরে প্রতিদিন ঢুকছেন। আমরা ট্রানজিট ক্যাম্পে বসে থাকতে থাকতে প্রতি মুহূর্তে অধৈর্য হয়ে পড়ছি। কখন ডাক আসবে। এই চেতনায় অস্থির উন্মুখ হয়ে অপেক্ষা করছি।
এরকম মুহূর্তে ট্রানজিট ক্যাম্পের বদ্ধ জীবনটা আমাদের জন্য মোটেও কাম্য ছিল না। সুখপ্রদ তো নয়ই। ক্যাম্পের কনিষ্ঠতম সদস্যদের একজন হওয়ার কারণে আমাদের ক্যাম্পের প্রধান কঠিন কঠোর ব্রহ্মচারীর মতো দৃঢ়চেতা অগ্নিযুগের বিপ্লবী কমরেড জ্ঞানচক্রবর্তী আমাকেই একটি কঠিন দায়িত্ব দিয়েছিলেন। ফলে প্রতিদিন সবাইকে টিকিট দিয়ে আমার খেতে খেতে দুপুর গড়িয়ে বিকাল হয়ে পড়ত। কিন্তু বয়স আমার কম ছিল বিধায়, বয়স্ক ক্যাম্প সাথীরা ধৈর্য ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতেন। লজ্জায় কেউ লাইন ভাঙতেন না। ভাবতেন ঐ বাচ্চাটাই যখন এতক্ষণ অপেক্ষা করছে, আমরা কেন পারব না। সে দায়িত্বটি হচ্ছে দুপুর বেলায় লাইন করে যখন সবাই খাবারের বাসনটি নেবে, তখন সেই লাইনে টিকিট বিতরণের দায়িত্ব আমার। আমরা তখন খোলা ময়দানে বাঁশের চাটাইয়ের ওপর বসে দুপুরের ভাত বিকালে খেতাম। রাতেও হ্যাজাকের আলোতে ময়দানেই খাওয়া চলত। সুশৃঙ্খল লাইনে দাঁড়িয়ে একই পদ্ধতিতে। গভীর রাতে পোকা-মাকড় এসে ভাতের থালায় পড়লে আমরা সেটাই কড়মড়িয়ে খেতাম এবং মধ্যবিত্ত কমরেডরা একে অপরকে ঠাট্টা করে বলতাম ‘প্রোটিন’ খাচ্ছি। আমাদের প্রতি বেলা আহার বরাদ্দ ছিল খুবই সামান্য। সকালে দুটো আটা রুটি ও এক চামচ বুটের ডাল। দুপুরে মাপা এক কাপ ভাত এবং এক হাতা ‘ঘ্যাট’ নামক বিচিত্র এক তরকারি। অর্থাত্ যা কিছু শাকসবজি ‘কচু-ঘেঁচু’ সংগৃহীত হয়েছে তার সম্মিলিত এক রূপ। রাতেও দুপুরের মতোই একই খাবার। স্বভাবতই আমরা সবাই থাকতাম অর্ধভুক্ত, বিশেষত শ্রমিক-কৃষক সাথীদের এত অল্প ভাতে চলত না, তাদের হাতে বাইরে থেকে কোনো কিছু কেনার পয়সাও ছিল না। আমরা মধ্যবিত্তরা তখন এক কাপ চা কিনে কীভাবে চার জনে ভাগ করে তা খেতে হয় তা শিখেছিলাম। মূলকথা, এভাবেই বহু ধনীর দুলাল, বহু আদরের ছেলেমেয়েরা মুক্তিযুদ্ধের ঐ অগ্নিঝরা দিনগুলোতে ধীরে ধীরে কঠিন কঠোর যোদ্ধায় পরিণত হচ্ছিল। পাশাপাশি ক্যাম্পের অন্য সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমজীবী সাথীরা অনেকটা মমতা ও স্নেহের সঙ্গে আমাদের এই কৃচ্ছ্রতাকে দেখতেন এবং আমাদের দিকে আন্তরিক বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। এইভাবে বাস্তব জীবনের পারস্পরিক আমাদের দুই ভিন্ন শ্রেণি এক সূত্রে গেঁথে দিয়েছিল। এইভাবে আমরা এক অজেয় গণবাহিনীতে পরিণত হয়েছিলাম। মধ্যবিত্তের নেতৃত্বে পরিচালিত কিন্তু আসলে সেটা ছিল শ্রেণিত্যাগী মধ্যবিত্তের নেতৃত্বাধীন জনগণের গণবাহিনী। প্রিন্সিপাল-এজেন্ট সমস্যা (Principal-Agent Problem) একদম যে ছিল না তা নয়, তবে সেটা ততটা গভীর ও বিস্তৃত হতে পারেনি।
g ‘বিশ্বাসঘাতক’ মধ্যবিত্ত এজেন্ট
একদিন আমাদের একজন বয়োজ্যেষ্ঠ দায়িত্বশীল নেতা আমাদের মতো ‘সুশিক্ষিত’ ‘মধ্যবিত্ত’ কিছু নেতাকে ডেকে বললেন, আজ একটা পৃথক খাদ্যের আয়োজন করেছি। আসলে তিনি পার্শ্ববর্তী শরণার্থী শিবির থেকে কীভাবে জানি কিছু পুঁটি মাছ সংগ্রহ করে নিয়ে এসেছিলেন। দুপুরে সেটাই রান্না করে আমরা পাঁচ-ছয় জন সবাই চোখ এড়িয়ে গোপনে তা খেতে বসেছিলাম। কিন্তু কীভাবে জানি—সম্ভবত গন্ধের জন্যই সেটা জানাজানি হয়ে গেল। সেদিন অবশ্য আমাদের ক্যাম্পের পরিচালক অগ্নিযুগের বিপ্লবী জ্ঞান চক্রবর্তী আগরতলা শহরে গিয়েছিলেন বিশেষ কাজে। ফলে তাকে ছাড়াই আমরা এই কাজটা করেছিলাম। যাই হোক, রাতে তিনি যখন ফিরে এলেন তখন তার জন্য রেখে দেওয়া বিশেষ পুঁটি মাছের তরকারিটি তাকে সাধা হলো। তিনি জানতে চাইলেন, কেন এবং কীভাবে এই ‘বিশেষ আয়োজন’। সব ঘটনা শুনে তিনি সেদিন আমাদের বলেছিলেন যে—এ কাজটা করা আমাদের ঠিক হয়নি। ব্যাপারটা ঘটনা হিসেবে হয়তো সামান্যই। সুবিধাটাও খুবই ছোট আকারের সুবিধা। কিন্তু এটা গোপনে সাথীদের না জানিয়ে কিছুটা চুরি করে খাওয়ার মতো একটা ব্যাপার হয়ে গেছে। যেটা ক্যাম্প-শৃঙ্খলা বা মুক্তিযুদ্ধের যে নৈতিক সমতার ভিত্তি রয়েছে তাকে দুর্বল করে দেয়।
সবশুনে সেদিন আমাদের মনে প্রশ্ন জেগেছিল যে, আমরা কি আমাদের জ্ঞান-বুদ্ধির জোরে ক্যাম্পের ম্যানেজমেন্টের দায়িত্ব পেয়ে বাড়তি অগ্রহণযোগ্য সুবিধা নিয়েছি? আমরা কি ‘বিশ্বাসঘাতক’? ঘটনা ছোট—কিন্তু প্রশ্নটি ছিল বিশাল। কেউ কেউ বলেছিলেন, আমরা গড় ক্যাম্পবাসীর তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ কাজে নিয়োজিত ছিলাম সুতরাং একটু বেশি তো আমরা নিতেই পারি। অন্য কেউ কেউ বলছিলেন, আমাদের চেয়ে সাধারণ ক্যাম্পবাসীদের প্রয়োজন বেশি, অভাব বেশি, সুতরাং তাদেরই প্রাপ্য বেশি। এই প্রশে্নর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ‘যোগ্যতা-দক্ষতার প্রশ্নের সঙ্গে প্রয়োজনের দ্বন্দ্বের প্রশ্ন’। যেই দ্বন্দ্বের সঠিক নিরসন আজো হয়েছে বলে মনে হয় না। যেটা নিরসনের সঠিক উপায় বার করার জন্য এ কে সেনকে ২০০৯ সালে এসে প্রায় ৪৬৮ পৃষ্ঠার একটি মোটা বই লিখতে হয়েছে The Idea of justice (Penguin Books)। সেখানে তিন শিশুর কলহের কূটাভাষটি কেউ ইচ্ছা করলে পড়ে দেখতে পারেন।
g ছোট ঘটনা—বড় প্রশ্ন—সাম্প্রতিক ভাবনা
পরবর্তীতে এ নিয়ে আমি ব্যক্তিগতভাবে অনেক ভেবেছি। এ কথা ঠিক সমাজতন্ত্রে ‘মুড়ি-মুড়কির’ সমান দর হবে না। কিন্তু এ কথাও ঠিক যে, যখন নিম্নতম প্রয়োজনই সবার মেটেনি তখনো কি এই ধরনের বাড়তি ভোগ করাটা সমীচীন হবে, ‘ক্রুশ্চেভপন্থি’রা মনে করেছিলেন যে, ‘বস্তুগত প্রেরণা’ ছাড়া উত্পাদনশক্তির বিকাশ ঘটাতে অধিকতর দক্ষ ব্যক্তিরা অনুপ্রাণিত হবেন না এবং সে জন্য সেটুকু প্রেরণা তাদেরকে অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে দিতে হবে। মার্কস ও লেনিনের নিজস্ব অনেক লেখায় এর অনুমোদন পাওয়া যায়। আবার চে-র অনুসারীরা ভাবেন যে, নৈতিকভাবে উদ্বুদ্ধ হয়ে মানুষ কোনো পুরস্কার ছাড়াই অসাধ্য সাধনের আনন্দের জন্য অসাধ্য সাধন করবেন। একবিংশ শতাব্দিতে আবার আধুনিক চীনের স্রষ্টা দেং চীনাদের বলেছেন, ‘আমরা রাষ্ট্রে তোমাদেরকে সব সুযোগ তৈরি করে দেব। বাজারকে ব্যবহার করে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে তোমরা সকলেই ধনী হওয়ার চেষ্টা কর। তাতে কিছুটা অসমতা তৈরি হবে। উত্পাদন শক্তির বিকাশ হলে সেটা আমরা আবার পরে গিয়ে সংশোধন করে নিব।’ এ পর্যন্ত ইতিহাসের অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায় যে, এর কোনটা যে ঠিক তা নির্দিষ্ট পরিস্থিতির নির্দিষ্ট মূল্যায়ন ছাড়া বলা মুশকিল। অবশ্য এত কথা লিখছি— কিন্তু এ কথাও তো সত্য যে, আমাদের মতোই অন্য বিভিন্ন ক্যাম্পে তখন ১৯৭১ সালে আরো অনেক এই ধরনের বা এর চেয়েও তীব্র অসমতা ঘটেছে এবং সেই অমীমাংসিত অসমতা সমস্যার বীজ ধারণ করেই আমাদের মুক্তিযুদ্ধ সামনে অগ্রসর হয়েছে। এমনকি একথাও ঠিক যে, তা এই সমস্যা নিয়েই বিজয়ও অর্জন করেছে। তাই ভাবি, অসাম্যের সমস্যার সঠিক সমাধান নিশ্চয়ই একদিন হবে।
উত্পাদন শক্তির বিকাশ ও সাম্যের সোনালি সূত্রের সন্ধান মানবিকতার অসীম প্রগতিশীল যাত্রার মধ্যেই নিহিত আছে। সম্ভবত পাঁচ আঙ্গুলের অসমতার কিন্তু আবার কার্যকারিতার যে চরিত্রটি রয়েছে তার সমাধান এমনভাবেই আমাদের করতে হবে। যাতে অসমতা দূর হয়। কিন্তু কার্যকারিতা যেন নষ্ট না হয়, আরো বৃদ্ধি পায়। এর কোনো সহজ সরল ‘ধর তক্তা মার পেরেক’ মার্কা নিয়ম নেই। পাঁচ আঙুল মাও-সে-তুং সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় হুকুম দিয়ে কেটে সমান করার চেষ্টা করেছিলেন—তা চীনের জন্য সুফল বয়ে আনতে পারেনি। হয়তো এমন কোনো নতুন কৌশল খুঁজে বার করতে হবে, যেখানে ছোট আঙুলগুলোর জন্য রইবে বাড়তি সুযোগ। বড় আঙুলগুলো পুরোটা না কেটেই ছোট আঙুলগুলোর প্রবৃদ্ধির বা বিকাশের গতিবেগ বৃদ্ধি করে হয়তো আমরা একই সঙ্গে আরো আধুনিক কিন্তু আরো সুষম সমাজ নির্মাণে সক্ষম হব। বৈষম্য নিরসক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির সেই লক্ষ্যগুলো আজকের বিশ্ব এসডিজি-র (Sustainable Development Goal) মাধ্যমে গ্রহণ করে নিয়েছে। কিন্তু যা-ই আমরা চাই না কেন- জনগণের উত্থান ছাড়া যে তা হবে না, সেটা নিশ্চিত। আর জনগণের উত্থানের সঙ্গে যুক্ত হতে হবে তাদের নিজস্ব বিকশিত জ্ঞান। তাহলেই উত্থানের ফলাফলও কখনোই তাদের হাতছাড়া হবে না। স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা তো লাগবেই, কিন্তু তারও আগে লাগবে জাগ্রত, সাহসী, সচেতন এবং সক্ষম জনগণ।
লেখক : অর্থনীতিবিদ।
