সাদিকুল নিয়োগী পন্নী
‘আচ্ছা তোমার সমস্যা কী? চেয়ারে বসে এমন নড়াছড়া করছ কেন? রেস্টুরেন্টের লোকজন কী ভাববে?’ ‘আসলে ঠোঁটের জিনিসটা আনতে ভুলে গেছি। শীতের দিন একটু পর পর ঠোঁট শুকিয়ে যায়।’
শাহীন ভাইয়ের কথা শুনে তার প্রেমিকা ইরা ব্যাগ থেকে লিপজেল বের করে এগিয়ে দিলেন। শাহীন ভাই ঠোঁটে লিপজেল দিয়ে মুচকি হাসি দিলেন।
কয়েক মিনিট পর শাহীন ভাইয়ের আবার নড়াছড়া দেখে ইরা বললেন, ‘এখন কী হয়েছে? মাত্র তো লিপজেল দিয়েছ।’
শাহীন ভাই নিচু গলায় বললেন, ‘আসলে আমি ঠোঁটে অন্য জিনিস দিই। লিপজেল-টিপজেলে আমার হয় না।’
‘মানে কী? তুমি কী লিপস্টিক দিবা নাকি?’
‘দিলে ভালো হতো। আমার কালো ঠোঁট। তাই সব সময় হালকা কালারের লিপস্টিক দিই। এতে সুবিধা হলো, সহজে ঠোঁট শুকায় না, ফাটে না, আবার কালো ঠোঁটও ঢাকা থাকে।’
শাহীন ভাই ভেবেছিলেন এই কথা শুনে ইরা হয়তো ব্যাগ থেকে লিপস্টিক বের করে দেবেন। কিন্তু তিনি উল্টো হাসাহাসি করছেন। এতে শাহিন ভাই কিছুটা বিব্রত হলেন বটে। কিন্তু লিপস্টিকবিহীন ঠোঁট নিয়ে তিনি পড়লেন বেশ অস্বস্তিতে।
শাহীন ভাই বললেন, ‘তুমি একটু বস ইরা। আমি খাবারের অর্ডার দিয়ে যাচ্ছি। ওয়েটার খাবার নিয়ে আসতে আসতে আমি চলে আসব।’
ইরা হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়লেন।
শাহীন ভাই থাই সুপের অর্ডার দিয়ে রেস্টুরেন্ট থেকে বের হলেন। তারপর রেস্টুরেন্টের পাশের একটা বড় কসমেটিকসের দোকান দেখে সেখানে ঢুকলেন।
‘ভাই হালকা লিপস্টিক আছে?’
দোকনাদার এক বক্স লিপস্টিক এগিয়ে দিলেন।
শাহীন ভাই সেখান থেকে নিজের জন্য হালকা গোলাপি কালারের তিনটা এবং প্রেমিকার জন্য একটা লাল টুকটুকে লিপস্টিক কিনলেন।
তারপর রেস্টুরেন্টে ফিরে দেখেন ইরা চুপচাপ বসে আছেন।
‘স্যরি, একটু দেরি হয়ে গেল।’
রাগে ইরার চোখ-মুখ লাল হয়ে আছে। কারণ মিনিট বিশেক সময় খাবার নিয়ে তিনি একাই বসে আছেন।
শাহীন ভাই সে দিকে কোনো খেয়াল না করেই বললেন, ‘এই তোমার কাছে আয়না আছে?’
ইরা বিরক্তি নিয়ে ব্যাগ থেকে ছোট আয়না বের করে দিলেন।
শাহীন ভাই আয়না দেখে আপন মনে ঠোঁটে লিপস্টিক দিলেন।
‘দেখ তো ইরা এবার কেমন দেখাচ্ছে আমাকে?’
ইরা উত্তর দিলেন, ‘ঠিক আমার বান্ধবীর মতো। কপালে একটা লাল টিপ দিলে আরও ভালো হতো।’
‘তুমি বেশ মজা করতে জানো। এই নাও তোমার জন্যও একটা লিপস্টিক নিয়ে এসেছি।’
শাহীন ভাইয়ের কর্মকাণ্ড দেখে আশপাশের টেবিলে বসা সবাই হাসাহাসি করছিলেন। ইরা বিষয়টি মেনে নিতে পারেননি। অনেকক্ষণের জমানো ক্ষোভের এবার বহিঃপ্রকাশ ঘটালেন। অগ্নিমূর্তি হয়ে চেয়াল থেকে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর শাহীন ভাইয়ের দেওয়া লিপস্টকটা তার মুখেই ছুড়ে মেরে বললেন, ‘লিপস্টিক দেওয়া ছেলে কোনো মেয়ের বয়ফ্রেন্ড হতে পারে না। তুমি বরং কোনো ছেলের সাথে প্রেম কর। আমি গেলাম।’ এই বলেই ইরা দ্রুত রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে গেলেন।
দুই.
‘শাহীন ভাইয়া আপনার লিপস্টিকটা একটু দেবেন? আমার বয়ফ্রেন্ড দেখা করতে আসবে বিকালে। সকালে বাসা থেকে তাড়াহুড়া করে আসার সময় ব্যাগে লিপস্টিকটা নিতে ভুলে গেছি।’
শাহীন ভাই প্যান্টের পকেট থেকে লিপস্টিক বের করে দিলেন।
‘ভাইয়া এটা বেশি হালকা। একটু কড়া কালারের হলে ভালো হতো।’
শাহীন ভাই এবার কড়া গোলাপি কালারের লিপস্টিক বের করে দিলেন।
‘ধন্যবাদ ভাইয়া।’
‘স্বাগতম। আর শোন, মনে করে লিপস্টিক ফেরত দিয়ে যাবে। এর আগে তোমার এক বান্ধবী নিয়ে আর ফেরত দেয়নি।’
‘ভাইয়া আপনি টেনশন করবেন না। লাইব্রেরি বন্ধ হওয়ার আগেই দিয়ে যাব,’ এই বলে লাইব্রেরির নিয়মিত পাঠিকা মৌসুমি চলে গেল।
পাবলিক লাইব্রেরির কোনো মেয়ে শাহীন ভাইকে তেমন পাত্তা না দিলেও প্রতিদিনই কেউ না কেউ তার কাছে আসে লিপস্টিক নিতে। আর নির্দিষ্ট সময় পর পর হরেক রকমের লিপস্টিকের বহর নিয়ে পাবলিক লাইব্রেরিতে শাহীন ভাইয়ের কাছে হাজির হন কসমেটিকস বিক্রেতা আকরাম আলী।
তিন.
‘তোমার জামা কাপড় সব নিয়েছি। টুকটাক আর কিছু থাকলে দাও।’
শাহীন ভাইয়ের সদ্য বিবাহিত বউ রেশমা লাগেজ গোছাতে গোছাতে এসব কথা বলছিলেন।
আজ রাতের বাসে তারা হানিমুনে কক্সবাজার যাবেন। হোটেল বুকিংও দেওয়া হয়েছে এরমধ্যে।
শাহীন ভাই লিপস্টিকের কথা বলতে গিয়েও থেমে গেলেন। ভাবলেন নতুন বউকে বিষয়টি বললে ভিন্নভাবে নিতে পারে। তাই তিনি নিজেই লিপস্টিক নেওয়ার জন্য তার ব্যক্তিগত ওয়ারড্রবের তালা খুললেন।
এমন সময় রেশমা ভাবি ছুটে এলেন। তার চোখ পড়ল ড্রয়ারের ভিতরে সাজিয়ে রাখা নানা রকমের লিপস্টিকের ওপর।
‘তোমার ড্রয়ারে লিপস্টিক কেন? বাড়িতে আমি ছাড়া অন্য কোনো মেয়ে নেই। তার মানে কী?’ বলেই ভাবি হইচই শুরু করে দিলেন।
শাহীন ভাই বললেন, ‘শীতের মধ্যে লিপস্টিক না দিলে আমার ঠোঁট ফাটে। এগুলো আমারই।’
‘আমাকে বোকা পেয়েছ? হয় তোমার বাসায় নিয়মিত মেয়েরা আসে। নতুবা তুমি আগে বিয়ে করেছিলে।’
‘বিশ্বাস কর, আমি ছোটবেলা থেকেই লিপস্টিক দিই।’
এভাবে লিপস্টিক নিয়ে তুমুল ঝগড়ার এক পর্যায়ে ভাবি রাগের বশে মশারি টানানোর স্ট্যান্ড দিয়ে শাহীন ভাইয়ের মাথা ফাটিয়ে দিলেন।
অবশেষে ফাটা মাথা আর কয়েকদিন ধরে লিপস্টিক না দেওয়ার কারণে ফেটে যাওয়া ঠোঁট নিয়ে শাহীন ভাইকে হানিমুনে যাওয়ার পরিবর্তে হাসপাতালে যেতে হলো! g
