আধুনিক ইউরোপে সিরাত চর্চা

আপডেট : ২৪ ডিসেম্বর ২০২০, ২১:১৯

ষোলো শতকের কথা। মুসলমানদের নবির নাম যে মোহাম্মদ—এ বিষয়টিও চরম বিকৃত করে উপস্থাপন করেন পশ্চিমা লেখকেরা। সতেরো শতকের শুরুর দিকে একদল লেখক নবিজীবন চর্চায় উন্মুক্ত মন নিয়ে এগিয়ে আসেন। তবে ইসলাম সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা না থাকায় ঐ সময়ও নবির      চরিত্রে কালি লেপনের বিষয়টি বন্ধ হয়নি। এই ঘৃণ্যতা রোধ হয়েছে আঠারো শতকের শেষ দিকে। নবি (স.)-এর নামে অনবরত মিথ্যা-দুর্নামের প্রতিবাদে একদল কবি-সাহিত্যিক মোহাম্মদবন্দনায় আত্মনিয়োগ করেন। মূলত এ সময় থেকেই আধুনিক ইউরোপ-আমেরিকায় সিরাত চর্চার স্বর্ণযুগ শুরু হয়। উচ্চশিক্ষিতরা মাতৃভাষা ইংরেজির পাশাপাশি আরবি ভাষার ওপরও দক্ষতা অর্জন করেন। তারা              আরবি গ্রন্থগুলো অনুবাদ করে মানুষের সামনে ইসলাম ও বিশুদ্ধ নবিজীবন তুলে ধরেন। এ সময় ইউরোপে ইসলাম ও ইসলামি সাহিত্যের জাগরণ এত বেশি পরিমাণে হয়েছে যে, ১৮৮০ থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত মাত্র কয়েক বছরেই ইসলাম ধর্মের বিভিন্ন বিষয়ের ওপর ৬০ হাজারেরও বেশি গ্রন্থ রচিত হয়। শুধু আমেরিকাতেই অর্ধশতেরও বেশি ইসলামি গবেষণাকেন্দ্র গড়ে ওঠে, যার ধারাবহিকতা এখনো অব্যাহত আছে।

পাশ্চাত্যের বিভিন্ন ভাষায় আরবি গ্রন্থ অনুবাদের পাশাপাশি খ্যাতনামা কবি-সাহিত্যিকেরা রসুল (স.)-এর বন্দনায় রচনা করেছেন অসংখ্য কবিতা-প্রবন্ধ-বই এবং গবেষণাকর্ম। পশ্চিমা বিশ্বের মহাকবি খ্যাত দান্তে, গ্যাটে, পুশকিন নিজ নিজ কবিতায় মোহাম্মদ (স.)-এর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন। আধুনিক ইংরেজ কবি টি এস এলিয়ট লেখেন, ‘মোহাম্মদ কেবল আজীবন দানই করে গেছেন, কারো দান গ্রহণ করেননি।’

মহাকবি গ্যাটে তার কবিতায় মোহাম্মদ (স.)কে ‘পাহাড়ের ঝরনা’ বলে উল্লেখ করেছেন। রুশ কবি পুশকিন রসুল (স.)কে নিয়ে একটি দীর্ঘ কবিতা রচনা করেন, যার শিরোনাম দিয়েছেন ‘দ্য প্রফেট’। স্কটল্যান্ডের জনপ্রিয় সাহিত্যিক টমাস কার্লাইল ১৮৪০ সালের ৮ মে এক ভাষণে মহানবি (স.) সম্পর্কে বলেন, ‘একটি জাতি। নাম আরব জাতি। একজন মানুষ। নাম মোহাম্মদ। যার শিক্ষা ও সংস্কার আরবের গণ্ডি পেরিয়ে দিল্লি থেকে গ্রানাডা পর্যন্ত জয় করেছে প্রতিটি দেশ ও জাতিকে।’

বিখ্যাত ফরাসি সাহিত্যিক আল ফ্রেড দে লা মার্টিন তার তুর্কি ইতিহাসের প্রথম খণ্ডে খুব জোর দিয়েই বলেছেন, ‘দার্শনিক, বক্তা, ধর্মপ্রচারক, বীর যোদ্ধা, আইনপ্রণেতা, প্রতিমামুক্ত প্রার্থনা পদ্ধতির সফল প্রতিষ্ঠা হিসেবে মোহাম্মদ (স.)-এর মতো অনন্য মানুষ পৃথিবীর বুকে আর আসেননি, আসবেনও না। ইউরোপীয় সাহিত্য সমালোচক ও প্রখ্যাত লেখক ডেভেন পোর্ট সিরাতের ওপর লেখা তার রচনায় বলেন, “পবিত্র বাইবেলে উল্লেখিত প্রতিশ্রুত ‘পারাক্লিত’ বা শান্তিদূত হলেন সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবি হজরত মোহাম্মদ (স.)।”

পশ্চিমা বিশ্বের জনপ্রিয় একটি এনসাইক্লোপিডিয়ার নাম ‘চেম্বার এনসাইক্লোপিডিয়া’। সেখানে সিরাতের ওপর একটি প্রবন্ধ সংকলন করা হয়। প্রবন্ধের নাম ‘মিরাকল অব মোহাম্মদ’। প্রবন্ধে বলা হয়, ‘মোহাম্মদ (স.) শিক্ষা, সংস্কৃতি-সভ্যতার যে সুবিশাল অট্টালিকার ভিত্তি তৈরি করে গেছেন, তার সুফল এখন আধুনিক বাগদাদ, সিরিয়া, স্পেন, ইউরোপসহ পুরো বিশ্ব ভোগ করছে।’

পশ্চিমা বিশ্বে সিরাত চর্চায় মাইকেল এইচ হার্টের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি ছিলেন প্রখ্যাত জোতির্বিজ্ঞানী ও ইতিহাসবিদ। বিশ্বের সেরা ১০০ ব্যক্তির জীবনী নিয়ে তিনি রচনা করেন বিখ্যাত বই ‘দ্য হান্ড্রেড’। এখানে তিনি মোহাম্মদ (স.)কে প্রথম স্থান দেন এবং তাদের ধর্মের নবি ঈসা (আ.)কে রাখেন দ্বিতীয় স্থানে। এছাড়া পাশ্চাত্যের আরো অনেক লেখকই সিরাত চর্চায় বিশেষ ভূমিকা রাখেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা হলেন—হাঙ্গেরির ড. জুলিয়াস জার্মান, স্যার টমাস আর্নল্ড, এডুইন আর্নল্ড; ফ্রান্সের লা মার্টিন, ড. এ বার্থারেন্ড, ডব্লিউ হুকিং, এডওয়ার্ড হেমিলটন; ওলন্দাজের কবি ভ্যান মিল্টন, গাট সিমিপি; মার্কিন লেখক ও গবেষক জর্জ সারটেন, ড. মরিস, ড. স্টংগাচ প্রমুখ।

লেখক :সাংবাদিক।