g শিমুল শাহিন
আব্বু-আম্মুর চোখ রাঙানি আর উপেক্ষা করতে পারলাম না, কনে দেখতে যাওয়ার জন্য শেষমেশ রাজি হতেই হলো। এতদিন গায়ে হাওয়া লাগিয়ে বেশ ঘুরছিলাম, সিঙ্গেল জীবনের এমন সুখ-শান্তি বিসর্জন দিয়ে বিয়ে নামক বিলাসিতায় ডুব দিতে চাইনি! চাকরি না পাওয়া পর্যন্ত বিয়ে করব না বলে বেশ কয়েকটা বছর পার করে ফেলেছি অবশ্য, কিন্তু মেঘে মেঘে অনেক বেলা গড়িয়ে গেছে আব্বুর ধৈর্যের বাঁধও ভেঙে গেছে!
পরদিন সকালে কনে দেখতে যাওয়া হবে, তারই আয়োজন চলছে। এ আয়োজনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন জেসমিন খালা আর তার দেবর কাসু মামা! ছোট বোনকে কিছু উেকাচ দিয়ে জেনেছি পাত্রী কাসু মামার কলেজের ছাত্রী। পুরো রাত জেগে বিয়েটা কিভাবে ভেস্তে দেওয়া যায় তা নিয়ে ভাবলাম, কিন্তু সুবুদ্ধি বা কুবুদ্ধি খাটিয়ে কোনো উপায়ই বের করতে পারলাম না! বিয়ে ভাঙার মতো এত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে ‘বিয়ে ভাঙানোর এক শ এক উপায়’ নামক কোনো বই আজও লেখা হয়নি বলে রাগ হতে থাকল পৃথিবীর সকল সাহিত্যিকদের ওপর! তবে সিদ্ধান্ত নিলাম এইবার বিয়েটা কোনো রকমে ভেস্তে দিতে পারলে আমি নিজেই এ বিষয়ে একটা মোটাসোটা বই লিখে ফেলব, অন্তত বেশকিছু ছেলেমেয়ের উপকারে আসবে এটা!
সারারাত নির্ঘুম কাটিয়েছি, সকালের কাঁচা ঘুমটা ভাঙল আব্বুর চেঁচামেচিতে। এত ঠাণ্ডার মধ্যে গোসল করে, পাঞ্জাবি পরতে রীতিমতো বাধ্য করা হলো! আব্বুর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ছোটবোনকে মজা করে বললাম চোখে একটু সুরমা লাগিয়ে দিতে—চোখে একটু মায়া আসবে! যাহোক বেশ সেজেগুজেই বোন, দুলাভাই আর জেসমিন খালার সঙ্গে রওনা দিলাম পাত্রী দেখতে!
পাত্রীর বাসায় ওর আত্মীয়-স্বজনরা এসে চিড়িয়াখানার বাঁদর দেখার মতো আমাকে দেখে গেল! আমাদের হালকা খানাপিনা শেষ হলে পাত্রী ধীর পায়ে ঘরে এল! এক দেখাতেই মেয়েটাকে বেশ সুন্দরী আর লক্ষ্মীমন্তই মনে হলো! একান্তে কথা বলা সুযোগ করে দিল দুলাভাই, মাথা নিচু করে সলাজে শুধু ওর নামটা জিজ্ঞেস করেই চলে এলাম!
বাড়িতে ফিরে আব্বু আম্মুকে মাধ্যম ধরে বললেন, ‘তোমার ছেলেকে জিজ্ঞেস করো মেয়ে পছন্দ হলো কি না!’
মেয়ে পছন্দ হয়নি—এমন একটা কঠিন মিথ্যে কথা আমার গলা দিয়ে বের হলো না! সত্যি বলতে কি মেয়েটা এতটা সুন্দর যে তার সঙ্গে আমার বিয়ে হলে লোকে নির্ঘাত বলবে—বাঁদরের গলায় মুক্তোর মালা! একবার ভাবলাম বিয়েটা করেই ফেলি, কিন্তু সিঙ্গেল জীবনের এমন সোনালি সময় হেলায় ফেলে বিয়ে না করার সিদ্ধান্তেই অটল রইলাম শেষমেশ! বড়আপু আর দুলাভাইকে ডেকে বললাম, ‘আপু, আব্বুকে বলে দাও এ মেয়েকে বিয়ে করব না!’
আপু অবাক হয়ে বলল, ‘বলিস কী! মেয়েটাকে আমাদের সবার পছন্দ হয়েছে! তুই খারাপ কি দেখলি?’
বিয়ে ভেস্তে দেবার কোনো উপায়ন্তর না পেয়ে হুট করে বলে ফেললাম, ‘মেয়েটার নাম আঁখি! আমি এ নামের মেয়ে বিয়ে করব না, বিয়ে যদি করতেই হয় তবে লাকি কিংবা হ্যাপি নামের মেয়ে দেখেই বিয়ে করব!’
দুলাভাই বললেন, ‘বিয়ে করতে চাও না ভালো কথা! কিন্তু এরকম কথা বলার কারণ কী? লাকি বা হ্যাপি নামের ফায়দা কী?’
ঢোঁক গিলে কোনো রকমে বললাম, ‘লাকি বা হ্যাপি নামের বউয়ে একটা টুইস্ট আছে! যখন আমার বউ কারো সামনে দিয়ে যাবে, তখন একজন আরেকজনকে দেখিয়ে বলবে—ওই দেখ, শিহাবের বউ লাকি/ হ্যাপি! কিংবা বয়স্করা যদি জিজ্ঞেস করে—কে মা তুমি, শিমুলের বউ লাকি/হ্যাপি না? উত্তরে বউ বলবে—হ্যাঁ চাচা, আমি লাকি/হ্যাপি!’
আমার এরকম কথা শুনে আব্বু পাশের ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন! বড়আপুকে বললেন, ‘তোর জেসমিন খালাকে ফোন দে তো, আমার সাথে একটু কথা বলিয়ে দে!’
আব্বুর এমন কথা শুনে আমার জ্বর নামার মতোই দুশ্চিন্তা অনেকটাই মাথা থেকে নেমে গেল! বড়আপুকে ফিসফিস করে বললাম, ‘আব্বু এখন জেসমিন খালাকে ফোন করে সম্বন্ধটা ভেঙে দেবেন! যাক বাঁচা গেল, আরও কয়েকটা দিন গায়ে হাওয়া লাগিয়ে শান্তিমতো ঘুরতে পারব!’
আমার কথা শুনে দুলাভাই বেশ উদ্ব্বিগ্ন হয়ে আব্বুকে বললেন, ‘বাবা, জেসমিন খালাকে ফোন দিয়ে এত সুন্দর সম্বন্ধটা এখনই ভেঙে দেওয়া কি ঠিক হবে? শিহাব আরেকটু ভাবুক!’
আব্বু চোখ রাঙিয়ে বললেন, ‘তোমাকে কে বললো সম্বন্ধ ভেঙে দেওয়ার জন্য ফোন দিচ্ছি?’
‘তাহলে?’
‘আমি যখন মেয়েটাকে দেখতে গেছিলাম, তখন ওদের দুইবোনকেই দেখেছি! বড় জনের নাম আঁখি, ছোট জনের নাম সুখী! গাধাটাকে বলে দাও ওর আর কোনো কথাই শুনছি না, ওর বিয়ে আমি ওই বাড়িতেই দিচ্ছি! তবে ওর কথাকে সাধুবাদ জানিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছি আঁখির সাথে নয়, গাধাটার বিয়ে দেবো সুখীর সাথে! ও যেটা চেয়েছে সেটাই হবে, লোকে বলবে শিহাবের বউ সুখী!’
আব্বুর কথা শেষ হতেই বড়আপু মুঠোফোনটা বাড়িয়ে দিলেন ওনার দিকে! আব্বু মুঠোফোনটা কানের কাছে ধরে মুচকি হেসে আমার দিকে এক মুহূর্ত চেয়ে বললেন, ‘হ্যালো জেসমিন.....!’ নিজের তৈরি ফাঁদে নিজেই আটকে গেছি, আর বেশি বুদ্ধি খাঁটাতে যাইনি! শুধু মাথা নীচু করে বললাম, ‘আব্বু, আঁখিই সই!’
রাজশাহী
