ডায়েরির পাতা থেকে খসে পড়তে যাচ্ছে ডিসেম্বর, করোনা-অভিশপ্ত একটি বছর ২০২০ সাল। এই একটি বছরে জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামানসহ অনেক মহান মানুষকে হারিয়েছি আমরা। বছরের শেষ প্রান্তে এসে (ডিসেম্বর) করোনা মহামারী কেড়ে নিল আমাদের শিল্প-সাহিত্য অঙ্গনের আরো এক মহাপ্রাণ মনজুরে মওলাকে। একাধারে কবি, গবেষক—বিশেষভাবে রবীন্দ্রসাহিত্যের অসামান্য পাঠক-বিশ্লেষক মনজুরে মওলার মৃত্যু আমাদের শিল্প-সাহিত্য অঙ্গনের জন্য যে কত বড়ো ক্ষত সৃষ্টি করেছে, তা তাঁর পাঠকমাত্রই উপলব্ধি করবেন।
ষাটের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের মেধাবী ছাত্র মনজুরে মওলা কর্মজীবনে যেমন, সৃজনশীল সাহিত্যচর্চায়ও তেমনই মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন। বৈষম্যপীড়িত পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে পূর্ববাংলার ছেলেদের ঠাঁই পাওয়া ছিল অসম্ভবের কাছাকাছি চেষ্টা। অসামান্য মেধাবী ছাড়া সেই বৈষম্যে নাড়ানো সি এস পি পরীক্ষার সাঁকো পার হওয়া সম্ভব হতো না। মেধাবীরা সর্বত্রই মেধাবী, তার প্রমাণ করে মনজুরে মওলা সাহিত্যকৃতির পাশাপাশি প্রশাসক হিসেবেও তাঁর অসামান্য সাফল্য। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিবের দায়িত্ব পালন করতে গিয়েও তিনি তাঁর সৃজনশীলতার স্বাক্ষর রেখেছিলেন। একটি দৃষ্টান্ত দেওয়া যাক। তিনি যখন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় সচিব তখন দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কল্যাণে উদ্ভাবনামূলক এক অভিনব কর্মসূচি গ্রহণ করে একসঙ্গে সারাদেশের বহু দরিদ্র তরুণীর বিয়ের ব্যবস্থা করেছিলেন মন্ত্রণালয়ের খরচে। পরবর্তীকালে এই ধরনের কল্যাণমূলক কর্মসূচি অনুসরণ করে বহু বেসরকারি সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন। ১৯৮২ সালের ডিসেম্বরে মনজুরে মওলা যখন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন তখন একাডেমির প্রশাসনিক শৃঙ্খলা কতটুকু ছিল তা প্রবীণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিশ্চয়ই স্মরণ করতে পারবেন। মহাপরিচালক বসতেন একটি উন্মুক্ত মাঠের মতো হলঘরের একপ্রান্তে। সবকিছুতেই একটা ঢিলেঢালা ভাব।
সেই বাংলা একাডেমিকে আমূল পালটে দিয়েছিলেন মনজুরে মওলা। মহাপরিচালক যেমন পরিবেশে বসা দরকার সে রকম একটি ছিমছাম কক্ষ বানালেন। একান্ত সচিব বসার জন্য ঘর তৈরি করলেন। কর্মকর্তাদের স্থানগুলো বদলে গেল। কর্মকর্তাদের প্রশাসনিক মেজাজ তৈরি করলেন। তাদের মর্যাদাবান করেই তিনি তৃপ্ত থাকেননি; তাদের অবসরভাতাসহ অনেক সুযোগ-সুবিধার ব্যাবস্থাও করেছিলেন। আজ যে বিশাল পরিসরে বাংলা একাডেমির অমর একুশে গ্রন্থমেলা তারও দক্ষ রূপকার মনজুরে মওলা। এই বইমেলার সাংগঠনিক রূপ দিয়েছিলেন তিনি।
‘একুশ আমাদের পরিচয়’—এই প্রত্যয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করেন অমর একুশে গ্রন্থমেলা। বর্ধমান হাউসের সংস্কার, প্রথম জাতীয় ফোকলোর কর্মশালা আয়োজন; আরজ আলী মাতুব্বর, খোদা বক্স সাঁইয়ের মতো লোকমনীষাকে ফেলোশিপ প্রদান; ‘বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস’, ‘ডেভিডসনের চিকিত্সাবিজ্ঞান’ কিংবা আনিসুজ্জামানের ‘পুরোনো বাংলা গদ্য’-এর মতো বই প্রকাশে উদ্যোগী হয়েছিলেন মনজুরে মওলা। ‘উত্তরাধিকার’সহ বাংলা একাডেমির পত্রিকাগুলোর প্রকাশনা নিয়মিত করার পাশাপাশি ভাষাশহীদ গ্রন্থমালার ১০১টি বইসহ নানা বিষয়ের সিরিজ গ্রন্থমালা প্রকাশের মধ্য দিয়ে তিনি নতুন গতি সঞ্চার করেন বাংলা একাডেমি প্রকাশনায়।
সম্পাদনা যে কত বড়ো শিল্প তার স্বাক্ষর রেখে গেছেন মনজুরে মওলা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সার্ধশত জন্মবর্ষে মূর্ধন্য প্রকাশনী থেকে তাঁরই পরিকল্পনা এবং সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছিল ১৫১টি বই। এত বিচিত্র বিষয়ের রবীন্দ্রনাথ একসঙ্গে এতগুলি বইয়ের পৃথক বিষয় হতে পারেন ভাবাই যায়নি। সম্পাদিত গ্রন্থ ‘বাংলাদেশের কবিতা’ (১৯৪৭-২০১৭) এবং ‘পঁচিশ বছরের প্রেমের কবিতা’ মূর্ধন্য প্রকাশনী থেকেই করেছিলেন মনজুরে মওলা। বইগুলির ভূমিকা পড়লে মনে হয়—এ যেন রীতিমতো গবেষণা। চুলচেরা নিবিড় বিশ্লেষণ। একই কথা বলা যায় আবুল হোসেনের কবিতা সমগ্র সম্পাদনার ক্ষেত্রেও।
তাঁর স্বকীয়তাখচিত কাব্যগ্রন্থসমূহের বাইরে রয়েছে তাঁর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ‘দশমী’ বইটিকে কেন্দ্র করে ‘নষ্ট নীড়’ রচনা করেছেন মনজুরে মওলা। অনুবাদ করেছেন ইবসেনের নাটক ‘ব্র্যান্ড’, এলিয়টের ‘সুইনি’ ও ‘দ্য রক’, ‘গির্জায় খুন’।
কবি মনজুরে মওলার সঙ্গে আমার পরিচয় ১৯৮৫ সালের দিকে, তখন আমি দৈনিক বাংলায় কাজ করি। কবিতার জন্য তাঁকে ফোন করেছিলাম। সেই পরিচয় কালক্রমে অনেক নিবিড় হয়েছিল। জনকণ্ঠের দিনগুলিতে মনজুরে মওলার সঙ্গে প্রায় নিয়মিত কথা হতো টেলিফোনে। লিখেছেন জনকণ্ঠের সাময়িকী এবং সম্পাদকীয় পাতায়। আমি সবচেয়ে বেশি পছন্দ করতাম তাঁর কবিতা। কবিতা প্রসঙ্গে দু-একবার কথায় কথায় আমার অভিমত জানিয়েছিলাম। সেই মুগ্ধ অনুভূতি শুনে তিনি সবিস্ময়ে হেসেছিলেন। ‘তাই! এটা কি তোমার মনের কথা? আমার কবিতা সম্পর্কে এত উচ্চ ধারণা কেন তোমার?...’
আমি কথা বলছিলাম তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘নিমগ্ন কি করে পারো’ প্রসঙ্গে। আমার বিবেচনায় ষাটের দশকের কবিতায় ‘নিমগ্ন কি করে পারো’ এক নতুন কণ্ঠস্বর। নতুন কাব্যভূগোল। এর ভাষা, প্রতীক-উপমা-চিত্রকল্প সম্পূর্ণ নতুন। ইংরেজি কবিতার অন্ধ অনুকরণও নয়। এমন স্রোতের বিপরীতে কবিতা লিখতে সাহস লাগে, মেধা আর প্রজ্ঞাও লাগে। ঐতিহ্য আর আধুনিকতাকে চমত্কারভাবে সমন্বিত করেছিলেন তাঁর কবিতায়। কবিতায় একঘরেই ছিলেন। সংবাদ সাময়িকীতে লিখতেন নিয়মিত। হাসনাত ভাই (সম্প্রতি প্রয়াত কালি ও কলম সম্পাদক আবুল হাসনাত) খুব যত্ন করে ছাপতেন।
আমার সৌভাগ্য বলতে হবে—আমি মনজুরে মওলার স্নেহ পেয়েছিলাম। যেখানেই কাজ করেছি সেখানেই তাঁর লেখা পেয়েছি। আমার ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে তিনি একটি গদ্য লিখে আমাকে আশীর্বাদ করেছিলেন!
তিনি ছিলেন তরুণদের সত্যিকারের বন্ধু। বয়স যা-ই হোক মননে তিনি ছিলেন চিরসবুজ একজন তরুণ। তরুণদের প্রতিদ্বন্দ্বী হবার মতো কবিতাও তিনি লিখেছেন। প্রতিদিন সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত অব্দি আড্ডা হতো তাঁর বাড়িতে। সেসব আড্ডায় মাঝে মাঝে গিয়েছিও। আমার দুই দশক পরের তরুণেরা যোগ দিতেন তাঁর বাড়ি অম্বর-এর সেই সান্ধ্য আড্ডায়। শেষের কয়েক বছর যেতে পারিনি। কিন্তু কথা হতো ঠিকই। আলোচনা কবিতা নিয়েই। বাংলাদেশের কবিতা ১৯৪৭ থেকে ২০১৭ সম্পাদনা করতে গিয়ে অভিমত নিয়েছেন অনেক তরুণ লেখকেরও। সেসব যোগবিয়োগ করে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি নিজের মতো করেই।
মনজুরে মওলা যখন কাজ করেছেন তাতে মৌলিকত্বের ছাপ রেখেছেন। সৃজন আর মননের এক আশ্চর্য সম্মিলন ঘটেছিল তাঁর ভেতরে। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত হারাননি চিন্তার তারুণ্য।
মাত্র তিন মাস আগে অক্টোবরে যাপন করেছেন ৮০তম জন্মদিন। বয়সের হিসেবে পরিণত, কিন্তু এমন মেধাবী একজন কবি সাধকের মৃত্যু মন কিছুতেই মেনে নিতে চায় না। তাঁর শূন্যতা বহুদিন আমাদের হূদয়কে দগ্ধ করবে। অনিচ্ছাসত্ত্বেও তবু বলতে হলো—বিদায় মাওলা ভাই! বিদায় মনজুরে মওলা!
মনজুরে মওলা [১ অক্টোবর ১৯৪০—২০ ডিসেম্বর ২০২০ ]
