সাইফুল ইসলাম জুয়েল-এর
সে কয়েক বছর আগের ঘটনা। হিরু তার ছোটকুর সঙ্গে আমেরিকায় গিয়েছিল। সেদেশে ওরা কাজ-বাজ করে বিস্তর টাকা-পয়সা কামাই করবে। আইডিয়াটা অবশ্য হিরুর ছোটকুর। হিরু ছিল নীরব দর্শক। বাবার ঝাড়ি খেয়ে তাকেও ছোটকুর সঙ্গী হতে হয়।
নতুন পরিবেশে গিয়ে ওদের মানিয়ে নেওয়াটা খুব একটা সুখকর হলো না।
তারা এক গার্ডেনে কাজ পেল। বাগানের মালিক আবার ভীষণ কিপটা। তার বাগানের মাঝখানে একটা চৌবাচ্চা। বৃষ্টির পানি সেখানে জমা হয়। সেই পানিই সে বাগানের গাছগুলোর জন্য খরচা করে। হিরুদের দায়িত্ব পড়ল—চৌবাচ্চা থেকে পানি নিয়ে অদূরের গাছগুলোতে দিতে হবে।
বিনাবাক্যে রাজি হয়ে গেল ওরা।
‘এখানে কোনো মর্টার কিংবা পাইপ নাই যে খুব সহজেই পানি দিয়ে ফেলবে। কষ্ট করতে হবে, বুঝলে!’ কিপটা মালিক বলল।
‘আচ্ছা।’
‘কোনো বালতি বা পাত্রও পাবে না, যাতে করে পানি বহন করে নিয়ে যাবে।’
‘আচ্ছা।’
‘আমি তাহলে গেলুম। সন্ধ্যার পর আমার অফিসে গিয়ে পেমেন্ট বুঝে নিও।’
‘আচ্ছা।’
বুড়ো মালিক চলে যাবার পরে ছোটকু হিরুকে চেপে ধরল, ‘খুব তো “আচ্ছা, আচ্ছা” করলি। জিনিসপত্র ছাড়া পানি দেবো কী করে?’
‘পানি কি দিতেই হবে?’
‘গাছগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে। পানি দিতে হবে না?’
‘সে তো বলল সন্ধ্যার পরপর তার অফিসে গিয়ে পেমেন্ট বুঝে নিতে। সেটাই করব আমরা।’
‘কাজ না করেই টাকা নিয়ে নিবি?’
‘কাজ না দিলে করব কী করে?’
ছোকটু দ্বিধায় পড়ে গেল। কিপটা বুড়ো সত্যিই বেকায়দায় ফেলে গেছে ওদের। একে বলে ‘কাজ দিয়ে কাজ না করানো’!
‘কিন্তু... আমাদের উচিত বিকল্প কোনো উপায়ে কাজটা সেরে ফেলা। এখানে এসেই রেপুটেশন নষ্ট করতে চাইছি না। তাহলে আর কোনো কাজ পাব না।’ ছোটকু বলল।
‘আজ বৃষ্টি নামবে। আমাদের বিকল্প উপায়ও হয়ে যাবে!’
‘আকাশে মেঘের ছিটে ফোঁটাও নাই। বলি—বৃষ্টিটা আসবে কোত্থেকে? হাওয়া থেকে?’
হিরু কিছু বলল না।
ছোটকু বলল, ‘তাহলে তুই কাজ শুরু কর। আমি একটু হাওয়া খেয়ে আসি।’
ছোটকু চলে গেল। হিরু নেমে পড়ল পানিভর্তি চৌবাচ্চায়। অনেকদিন গোসল করা হয় না। এখন গোসল করায় যে মজা হচ্ছে, তাতে সারাদিন কাজের পর ডলার না পেলেও কোনো সমস্যা নাই ওর!
একটু পরেই চৌবাচ্চায় শুরু হলো—তোলপাড়। তীব্র ঢেউয়ের সৃষ্টি হলো। হিরু একবার এ পাশে যায়, তো আরেকবার ঢেউয়ের ধাক্কায় অন্য পাশে চলে যায়।
‘বুড়ো কিপটা হলেও বেজায় রসিক আছে। চৌবাচ্চায় কৃত্রিম ওয়েব-এর ব্যবস্থা রেখেছে।’ খুব খুশি হলো ও। কতক্ষণ পর পানি থেকে উঠে এল। মনভরে গোসল করে নিয়েছে। ততক্ষণে ঢেউও থেমে গেছে। পাড়ে উঠে তো দারুণ অবাক ও।
তীব্র ঢেউয়ে চৌবাচ্চার পানি অর্ধেকটাই খালি। পানি বাগানের সবগুলো গাছকে ভিজিয়ে দিয়েছে।
‘বুড়ো তাহলে এই পদ্ধতিতেই গোসলের পাশাপাশি বাগানের গাছগুলোতেও পানি দেয়! এক ঢিলে দুই পাখি মারা যাকে বলে আর কী!’ হিরু বিড়বিড় করে বলল।
পরনের কাপড়গুলোসহই নেমে পড়েছিল ও। ওদেশে গিয়ে তখনো গায়ের সমস্ত কাপড় ছেড়ে গোসল করার ব্যাপারটা ওর আয়ত্তে আসেনি। বাগানের এক কোণায় কিছুটা আড়ালে গিয়ে ক্রমান্বয়ে একটা একটা করে কাপড় খুলে নিংড়ে নিচ্ছে। তখন ছোটকু চলে এল।
‘তুই এরই মধ্যে সব কাজ সেরে ফেললি?’ দারুণ অবাক সে।
হিরু কিছু না বলে চুপচাপ নিজের কাজ করে যাচ্ছিল।
ছোটকু ফের বলল, ‘তুই আসলেই জিনিয়াস। আমি জানতাম—ঠিকই একটা না একটা উপায় বের করে ফেলবি! তোর এই চৌবাচ্চার পানিতে কাপড় ভিজিয়ে গাছগুলোর ওপর তা নিংড়ে পানি দেওয়ার ব্যাপারটা কিন্তু দারুণ।’
হিরু তার ছোটকুর কাছে জানতে চাইল, ‘তুমি এতক্ষণ কোথায় ছিলে?’
‘ইয়ে মানে... রাস্তার ওপাশে একটা পার্ক আছে। সেখানে একটা দোলনা দেখে ছেলেমানুষী ভর করল—খুব ঝুলতে ইচ্ছে হলো আর কী। ওটাতেই দোল খেয়ে এলাম কিছুক্ষণ।’
‘দোলনাটা খুব দুলছিল, তাই না?’
‘হ্যাঁ। তুই জানলি কী করে? বুঝলি—আমাকে তো আর কেউ পিছন থেকে ধাক্কা দিয়ে সাহায্য করেনি। একা একা যতটা পেরেছি...। কিন্তু দোলনাটা খুবই ভালো। অল্পতেই বেশি দোল দেয়!’
হিরু আর কিছু না বলে মুচকি করে একটু হাসল। একটু আগের ভূমিকম্পের কম্পনটা ছোটকু টের পায়নি।
সন্ধ্যার পরে ওরা গেল বুড়োর অফিসে। পেমেন্ট নিতে। ‘তোমাদের আরেকটা কাজ করতে হবে। তারপরে পেমেন্ট পাবে।’ বুড়ো বলল।
‘কী কাজ?’
‘আমার একটা লাইব্রেরি আছে। ওর সবগুলো বই সেলফ থেকে নিচে নামিয়ে রাখবে। কাজের মেয়েটা কাল সকালে এসে বইগুলো পরিষ্কার করবে।’
‘আচ্ছা।’
লাইব্রেরির ভিতরে ঢুকল ওরা। বিশাল। মাথা চক্কর দিয়ে উঠল। ‘এত্তগুলো বই কীভাবে নামাব? কাজ করতে করতে রাত পাড় হয়ে যাবে...’ ছোটকু বিড়বিড় করে বলল।
হিরু বলল, ‘লাইব্রেরির বই নিচে নামানো ওয়ান-টুর ব্যাপার। একটা সেলফ ধরে ধাক্কা দাও। একে একে সবগুলো পড়ে যাবে।’
ছোটকু ধাক্কা দিল। একটা বইও পড়ল না। দৈত্যাকৃতির শেলফগুলো নড়ল না পর্যন্ত।
‘তাহলে তুই শুরু কর। আমি একটু আসি।’ ছোটকু বলল।
‘এখন আবার কোথায় যাচ্ছো? হাওয়া খেতে, নাকি দোল খেতে?’
‘ইয়ে মানে... বুড়োর এক নাতনি আছে। বেশ সুন্দরী। ও আমাকে দেখা করতে বলেছে।’
‘তুমিও শেষে এমন হলে!’
‘আরে নাহ। আমার জন্য নয়। মেয়েটা বলেছে—সে নাকি আমাদের দেশের কোনো এক ছেলের প্রেমে মজেছে। ওদেশ উড়াল দেবে। যাওয়ার আগে আমার সাথে একটু শলাপরামর্শ করে নিতে চায়।’
ছোটকু চলে যেতে হিরু বিড়বিড় করে বলল, ‘ঘটকালি খুব ভালো পেশা।’
হিরু ওর কাজে মনোযোগী হলো। ভেবেছিল—এটা খুবই সহজ কাজ হবে। বিভিন্ন মুভিতে দেখেছে। লাইব্রেরিতে একটা বুকশেলফে ধাক্কা লাগলে একে একে সবগুলো গড়িয়ে পড়ে! কিন্তু এখন তো সেই থিউরি কাজ করছে না!
‘বুড়োটা কী বোকা!’ মনে মনে বলল ও। ‘বইগুলো নামানোর কী দরকার! একটা একটা করে বই পরিষ্কার করে রেখে দিলেই তো হয়!’
চোখের সামনে নিজের পছন্দের একটা বই পেয়ে ও সেটাকে হাতে নিয়ে টেবিলে বসে পড়ল। আস্তে আস্তে ঢুবে গেল বইয়ের কাহিনির ভিতর... এক প্রলয়ঙ্করী দুর্যোগ। সবকিছু ভেঙেচুড়ে খানখান হয়ে যাচ্ছে...
কতক্ষণ পর হুঁশ হতে বই রেখে উঠে দাঁড়াল। অমনি যেন টাসকি খেল। লাইব্রেরির সমস্ত বই নিচে পড়ে আছে। সেই মুহূর্তে ওর ছোটকুও চলে এল।
‘বাব্বা! এর মধ্যে কাজটা শেষ করে ফেলেছিস!’ চমকিত সে। কিন্তু কিছুতেই ভেবে পাচ্ছে না—যেখানে সে একটা সেলফও নাড়াতে পারেনি, সেখানে এত অল্প সময়ে হিরু কীভাবে কী করল! ‘চল তাহলে, পেমেন্ট নিয়ে আজকের মতো চলে যাই।’
বুড়ো ওদের কাজের গতি দেখে খুব খুশি হলো। পেমেন্ট দিয়ে শেষে বলল, ‘কাল আবার এসো। বইগুলো ওঠানোর কাজটাও করে দিয়ো, কেমন!’
‘বেঁচে থাকলে আর এই বুড়োর ধারে-কাছে ঘেঁষব না।’ হিরু মনে মনে বলল।
‘তোমাদের দুজনের মধ্য থেকে একজনকে আমার নাতনির বিয়ে দিতে চাই। বলো, কে করবে? দুজনই রাজি থাকলে অবশ্য আমাকে টস করতে হবে।’
ছোটকু কিছু বলতে যাচ্ছিল। হিরু ‘সিদ্ধান্তটা কাল জানাই?’—এই বলে ছোটকুকে টেনে বাইরে নিয়ে এলো।
‘কীরে, এমন সুযোগ কেউ হেলায় হারায়! আজ বউ পেতাম। ক’দিন পর গ্রিনকার্ডটাও পেয়ে যেতাম...।’ ছোটকু কিছুটা আশাহত।
‘যে মেয়ে অন্য আরেকজনকে ভালোবাসে, তুমি তাকে বিয়ে করবে? দুদিন পরে তার আরেকজনের সাথে পালিয়ে যেতে বাকি কী!’
‘না, ও আসলে অন্য কাউকে ভালোবাসে না। তখন সরাসরি বলতে পারেনি। একটু আগে ওর সাথে যখন দেখা করতে গেলাম, তখন ও বিষয়টা ভাঙিয়ে বলছে—ও আসলে আমার সাথেই পালিয়ে যেতে চায়!’
‘শুনে তোমার কী মনে হলো?’
‘ওর মুখে কথাটা শুনে মনে হলো—ভূমিকম্প হচ্ছে! চারপাশটা থরথর করে কাঁপছে। মেয়েটা অবশ্য আর দাঁড়ায়নি। দৌড়ে পালিয়েছে। লজ্জায় বুঝলি, লজ্জায়। ভাবলাম—আমার ভিতরটা যখন এত্ত কাঁপাকাছি করছে, তখন ওই মেয়ে নিশ্চিত করেই আমার হূদয়ে পাকা আসন গেড়ে বসেছে!’
‘ছোটকু তাহলে একটু আগের ভূ-কম্পন টের পায়নি! সকালেরটাও না। বেচারা! মেয়েটা যে লজ্জায় নয়, ভূমিকম্পে ভয়ে দৌড়ে পালিয়েছে, তাও বুঝতে পারেনি। অন্যদিকে আজ কোনো কাজ না করেই কতগুলো টাকা পেলাম...।’ ভাবতে ভাবতে হিরু হেসেই ফেলল।
‘কিরে, হাসছিস কেন?’
‘হাসছি তোমার আশু পরিণতি দেখে!’
‘মানে?’
‘মানে খুবই সহজ। বিয়ে করে এখানে থাকলে বুড়ো তোমাকে খাটিয়ে মারবে। বুড়ো কোনো কাজের লোকই রাখবে না। আর ওই মেয়ে পালিয়ে দেশে গেলে তুমি ভাইরাল হবে। ইজ্জত পাংচার হবে তোমার।’
তখনই ভূমিকম্প শুরু হলো। ওই দিনে তৃতীয়বার। ওদের সামনেই অনেক কিছু ভেঙেচুড়ে খানখান হয়ে গেল। ছোটকু ভীষণ ভয় পেল। সে বলল, ‘এখানে খুব বেশিদিন থাকা যাবে নারে... যেভাবে সবকিছু কাঁপছে আমার... দেশেই ফিরে যাব!’
দুই
এর কয়েক বছর পরের কথা। একদিন হিরু তার ছোটকুকে নিয়ে বাণিজ্য মেলায় গেল। চারদিকে মানুষজনে গিজগিজ করছে। খাবারের দোকানগুলোতে প্রেমিক-প্রেমিকারা জোড়ায় জোড়ায় বসে আছে। প্রেমিকের মুখে হাসি নেই, অন্যদিকে প্রেমিকা গোগ্রাসে গিলছে। স্বামী-স্ত্রী বিভিন্ন স্টলে স্টলে ঘুরে কেনাকাটা করছে। স্ত্রী স্বামীর পকেট কাটিং করছে আর কী! বেচারা স্বামীর হাত ভরে উঠেছে শপিং ব্যাগে...। কতক্ষণ পর ভীষণ ‘ধুক ধুক’ আওয়াজ কানে এলো ওদের।
অমনি ছোটকুটা দৌড় লাগাল। হিরুও তাকে ধরতে পিছন পিছন ছুটল। ছোটকু এক দৌড়ে গেটের বাইরে এসে তবে থামল। ‘কী হলো? অমন দৌড় লাগালে কেন? পকেটমার তোমার পকেট মেরে দৌড়চ্ছিল বুঝি?’
‘আরে না। ভূমিকম্প হচ্ছিল। টের পাসনি?’
হিরু কিছু না বলে হাসতে লাগল। ও জানে—ভূমিকম্প-টুমিকম্প কিচ্ছু হয়নি। মেলার ভিতরে আতঙ্কে পুরুষ প্রজাতির বুক ধুপধুপ করছিল। সেই কম্পনই ছোটকুর মনে ভয় সৃষ্টি করে।
‘কিরে হাসছিস কেন?’
‘ক’দিন পরে না তোমার বিয়ে? তখন তুমিও এসব ভূমিকম্প-টম্প কিচ্ছু টের পাবে না। এখন চলো।’ এই বলে ও হাঁটা শুরু করল।
পিছনে তার ছোটকু ভ্যাবলার মতো মুখ হাঁ করে দাঁড়িয়ে রইল। g
