বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাস লিখতে গেলে স্বাভাবিক কারণেই এক সময়ের পূর্ব পাকিস্তানের সাংবাদিকতাও অবশ্যই অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এখানে উল্লেখ করা দরকার যে, পাকিস্তান সৃষ্টির সময় পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকায় কোনো দৈনিক সংবাদপত্রই ছিল না। সেদিক থেকে দেখলে বলতে হবে যে সাবেক পূর্ব পাকিস্তান যা পরবর্তীকালে বর্তমান বাংলাদেশ তাতে প্রায় নতুন করে সাংবাদিকতার প্রক্রিয়া শুরু করতে হয়েছিল। সেই প্রক্রিয়ায় ‘ইত্তেফাক’ পত্রিকাটির ভূমিকা সম্ভবত সবচাইতে উল্লেখযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের সাংবাদিকতার পূর্ণাঙ্গ কোনো ইতিহাস এখনো লিখিত হয়নি। তাই ইতিহাস লিখতে হলে শুধু ইত্তেফাকের ভূমিকার ওপরই এক বা একাধিক অধ্যায় লিখতে হবে।
ইত্তেফাকের অসাধারণ সংগ্রামী ভূমিকার পাশাপাশি বাংলা সাংবাদিকতায় ভাষার কার্যকর বিকাশ এবং নতুন প্রবণতা সৃষ্টির ক্ষেত্রেও এটির ভূমিকা অনন্য। দেশের মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে একটি সংবাদপত্র কত কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে তার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত ইত্তেফাক।
বর্তমানে অনেক সংবাদপত্রের ভিড়ে এই সত্যটি ভুলে যাওয়া উচিত হবে না। ইত্তেফাক যেমন দেশের প্রয়োজনে সংগ্রামী ভূমিকা নিয়েছে তেমনি আজকের ইত্তেফাক বস্তুনিষ্ঠতায়ও পিছিয়ে নেই। মালিকানার আংশিক পরিবর্তনের পর নতুন ব্যবস্থাপনায়ও দেশের প্রধান পত্রিকাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য স্থান ধরে রেখেছে ইত্তেফাক। স্বাভাবিক কারণেই দেশে আরো পত্রপত্রিকা সৃষ্টি হয়েছে এবং মুদ্রণ মাধ্যমে বর্তমানে কিছুটা ম্রিয়মাণ হলেও আশা করা যায় ভবিষ্যতে হয়তো আরো সৃষ্টি হবে, তবে মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে ইত্তেফাকের এবং এটির প্রয়াত সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার সাহসী অবদান অবশ্যই আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করতে হবে।
মানিক মিয়া জীবনে অনেক অত্যাচার ও অবিচারের সম্মুখীন হয়েও তার নীতিমালা থেকে কখনো বিচ্যুত হননি। এই ইত্তেফাক একসময় সাপ্তাহিক থেকে দৈনিকে রূপান্তরিত হয়েছিল। এবং মানিক মিয়া মুসাফির ছদ্মনামে রাজনীতিক মঞ্চ নামক অসাধারণ কলাম লেখার মাধ্যমে যে বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছিলেন, তার কোনো তুলনা এখনো পর্যন্ত আমরা দেখতে পাই না। মানুষের মুখের ভাষার কাছাকাছি অনবদ্য গদ্য সৃষ্টির জন্যই মানিক মিয়া অমর হয়ে থাকবেন। বর্তমানে অফিস-আদালতে যে বাংলা ভাষা ব্যবহূত হচ্ছে তার নমুনাও আমরা অনেকটা খুঁজে পাই ইত্তেফাকের পাতায়। বাংলাকে আমরা রাষ্ট্রভাষা করেছি বটে কিন্তু এখনো অফিস-আদালত থেকে শুরু করে একেবারে সাধারণ মানুষের পর্যায় পর্যন্ত প্রতিটি লোকের কাছে বোধগম্য ও তেমন আদর্শ কার্যকর ভাষা আমরা তৈরি করে উঠতে পারিনি। বর্তমানে প্রমিত বাংলা বলে যে ভাষাটিকে আমরা ব্যবহার করছি, তাকে আরো জনপ্রিয় ও মানুষের কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য মানিক মিয়ার মতো আরো অনেক প্রতিভার প্রয়োজন। ইত্তেফাকের কাছে আমাদের আশা থাকবে, এমন একটি সর্বজনগ্রাহ্য ভাষা তৈরির ক্ষেত্রে ইত্তেফাকের কর্তৃপক্ষ চেষ্টা চালাবেন। ইত্তেফাকের ওপর আমাদের এখনো অনেক আশা-ভরসা রয়েছে। ইত্তেফাক তা যথাযোগ্যভাবে পূরণ করবে বলে আশা রাখি। পত্রিকাটির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে আমি এর উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি ও সাফল্য কামনা করি।
লেখক : অনারারি অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
