পাঁচটি দল নিয়ে (জেমকন খুলনা, গাজী গ্রুপ চট্টগ্রাম, বেক্সিকো ঢাকা, ফরচুন বরিশাল ও মিনিস্টার গ্রুপ রাজশাহী) পুরোপুরি স্বাস্থ্যবিধি মেনে জৈব সুরক্ষাবলয় সৃষ্টি করে দর্শকশূন্য মিরপুর শেরেবাংলা ক্রিকেট স্টেডিয়ামে শুধু মাত্র স্থানীয় খেলোয়াড়দের জন্য বঙ্গবন্ধু টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টের আয়োজন অর্থবহ হয়েছে। ক্রিকেট বোর্ডের এই আয়োজন এবং গ্র্যান্ড ‘আউটপুট’ অনেক বেশি ফলদায়ক হবে, নতুন চোখ খুলে দিতে পারে এ বিষয়টি নিয়ে আগে তেমন চিন্তা করা হয়নি! বিপিএলের ‘কনসেপ্টে’ তবে শুধু স্থানীয় খেলোয়াড়দের নিয়ে আয়োজিত বঙ্গবন্ধু টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট অতীতের যে কোনো বিপিএলের আসর থেকে চিত্তাকর্ষক এবং দেশের ক্রিকেটের স্বার্থ রক্ষার্থে সময়োপযোগী আদর্শ একটি উদ্যোগ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। অতীতে দেশি ও বিদেশি খেলোয়াড়দের অংশগ্রহণে বিপিএল থেকে যা পাওয়া যায়নি, এবার তা পাওয়া গেছে। এটা বুঝাতে চাচ্ছি না যে, বিপিএলের প্রয়োজন নেই। অবশ্যই আছে। দেশি ও বিদেশি খেলোয়াড় নিয়ে অনুষ্ঠিত বিপিএলকে আরো গুছিয়ে অনুষ্ঠিত করার প্রয়োজন আছে।
সদ্য সমাপ্ত বঙ্গবন্ধু টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টে স্পষ্টভাবে লক্ষণীয় হয়েছে ক্রিকেট চত্বরে তারুণ্যের ঝলকানি, তাদের শক্তি, সামর্থ্য আর সম্ভাবনার প্রদর্শনী। তরুণরা সুযোগ লুফে নিয়েছেন, তারা সুযোগের সদ্ব্যবহারের জন্য সাধ্যমতো চেষ্টা করেছেন। তারা ভয়ডরহীন, আত্মবিশ্বাসী স্বাধীন ক্রিকেট খেলেছেন। নিজেদের তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। তাদের ভেতরের বারুদটা জ্বালানোর চেষ্টা করেছেন। আমরা দেখেছি, জাতীয় দলের আশপাশে সম্ভাবনাময় কিছু মুখ—যারা এখনই প্রস্তুত বড় দায়িত্ব নেওয়ার জন্য। আর কিছু যারা খুব কাছেই আছেন এটাই সবচেয়ে ইতিবাচক প্রাপ্তি সদ্য শেষ হওয়া (২৪ নভেম্বর থেকে শুরু হয়ে ১৮ ডিসেম্বর) টুর্নামেন্টে।
সচেতন মহল আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন, টি-টোয়েন্টি সংস্করণে রাত পোহাতে আর বেশি দেরি নেই। টি-টোয়েন্টি উন্নতিতে যা দুরূহ করছে সেই বাধাগুলোকে সরাতে পারলে ক্রমেই আলোকিত পথে হাঁটা সম্ভব। চলতি বছর আমাদের ১৯ অনূর্ধ্ব টি-টোয়েন্টি দল বিশ্ব টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। এই বিজয় বিশ্বাসকে আরো গাঢ় করেছে। ক্রিকেটে বর্তমানে তারুণ্যের কোনো বিকল্প নেই। তরুণদের ওপর আস্থা ও বিশ্বাস রাখতে হবে। তাদের অফুরন্ত প্রাণ ও ইচ্ছাশক্তিকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হবে। আর তা হলেই আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে ‘টেকসই’ উন্নতির মাধ্যমে বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে। ক্রীড়াচর্চা তো এখন আর শুধু বিনোদনের জন্য নয়, খেলাধুলার গুরুত্ব এবং প্রয়োজনীয়তা এখন অন্যরকম।
আমরা মনে করি, বিসিবি শুধু মাত্র স্থানীয় খেলোয়াড়দের জন্য যে টুর্নামেন্টের আয়োজন করেছে এটি যদি তাদের বাত্সরিক ব্যস্ত সূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয় তাহলে এই সংস্করণের ক্রিকেট লাভবান ও উপকৃত হবে। অনেক সমস্যার সমাধান সহজ হবে। নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হবে। বঙ্গবন্ধু টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট কিন্তু নতুন চিন্তাভাবনার জন্ম দিয়েছে। বিসিবি ক্রিকেট অপারেশন্স কমিটি, টিম ম্যানেজমেন্ট এবং জাতীয় ক্রিকেট নির্বাচকরা টুর্নামেন্ট থেকে প্রাপ্তিতে সন্তুষ্ট। কেননা এক ধরনের মনোব্যথা, যন্ত্রণা আর হিসেব-নিকাশ সহজ হতে যাচ্ছে। এটি ভবিষ্যত্ ক্রিকেটের জন্য আশাব্যঞ্জক। ক্রিকেটে তারুণ্যের উত্থান অনেক বড় অর্জন বর্তমান মুজিববর্ষে।
বঙ্গবন্ধু টি-টোয়েন্টির আগে গত অক্টোবর মাসে তিন দল নিয়ে ক্রিকেট বোর্ড বিসিবি প্রেসিডেন্ট কাপ (৫০ ওভারের) খেলা আয়োজন করেছে জৈব সুরক্ষাবলয় সৃষ্টি করে সফলতার সঙ্গে। এখন তাদের তৃতীয় চ্যালেঞ্জ হলো দেশে এই করনাকালীন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের আয়োজন। জীবন তো থেমে থাকতে পারে না। স্বাস্থ্যবিধি মেনেই যতটুকু সম্ভব সবকিছু চালিয়ে যেতে হবে। আগামী ১০ জানুয়ারি তিনটি ওয়ানডে আর দুটি টেস্ট খেলতে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট দলের বাংলাদেশে আসার কথা আছে। তারা ঢাকা ছাড়াও চট্টগ্রামেও লেখবে। আশা করি, পেশাদার মনোভাব নিয়ে এই ‘হাডলস’ ক্রিকেট বোর্ড অতিক্রম করতে সক্ষম হবে।
বাংলাদেশ প্রথম আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ম্যাচ জিতেছে দেশের মাটিতে খুলনায় জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে। ক্রিকেট অনুরাগীরা জানেন, ২০০৭ সালে প্রথম বারের মতো টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ৬ উইকেটে পরাজিত করে ‘সুপার এইটে’ স্থান করে নিয়েছিল বাংলাদেশ। এর পর আর টুর্নামেন্টে একটি ম্যাচেও জিততে পারেনি। কারণ হলো—এই ক্রিকেটে অনভ্যস্ততা, সঠিক মাইন্ড সেট আর লড়াইয়ের ক্ষেত্রে আবেগের অভাব। অনেক সময় বলা হয়, ‘হার্ডহিটার’ ছাড়া ভালো করা সম্ভব নয়—এই ধারণা টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে শতভাগ সত্যি নয়। টি-টোয়েন্টি ফিটনেস, আত্মবিশ্বাস, মানসিক শক্তি, ট্যাকনিক, মাইন্ড সেট, সাহস আর বুদ্ধিদীপ্ত ‘মগজের’ খেলা। বঙ্গবন্ধু টি-টোয়েন্টিতে আমরা তো অনেক কিছুই দেখেছি। ‘হার্ডহিটারের’ শূন্যতা কি পূরণ হয়নি! টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট সময়ের ক্রিকেট! জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। ২০ ওভারের এই খেলা ওয়ান ডে এবং টেস্ট ক্রিকেটেও ভালোভাবেই ‘ভর’ করেছে। টেস্ট ক্রিকেটে তো দেখছি খেলার ‘অ্যাপরোচ’ ধীরে ধীরে পালটে যাচ্ছে। পাঁচ দিনের খেলায় গতি এসেছে। ‘স্টাইকিং রেট’ অনেক বেড়ে গেছে। টেস্ট ম্যাচে এখন সব সময়ই ফলাফল দেখা যাচ্ছে। নিস্তেজ ‘ড্র’-এর সুযোগ কমে যাচ্ছে।
টুর্নামেন্টের ছবি ভরপুর তারুণ্যের প্রাধান্য। তাদের জন্য বৃহত্ ছবিটা অনেক বেশি উজ্জ্বল। ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিং পাশাপাশি ফিটনেসে এরা পিছিয়ে ছিলেন না। এদের নিয়েই তাই বেশি আলাপ-আলোচনা হয়েছে। বাস্তবতাকে তো মেনে নিতেই হবে। দেশের ক্রিকেটে পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তা এখন স্পষ্ট। এটাই জগতের নিয়ম। কেউ সব সময়ের জন্য অপরিহার্য নয়।
বঙ্গবন্ধু টুর্নামেন্টে জাতীয় দল, প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটার, গত অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ জয়ী যুবদল এবং হাইপারফরম্যান্স বিভাগের ক্রিকেটারটা অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েছেন। ক্রিকেটের বড় ক্যানভাসে লক্ষণীয় হয়েছে— তরুণরাই সবচেয়ে বেশি রং ব্যবহার করেছেন। সেরা দশ জন ব্যাটসম্যান, বোলারের তালিকায় তারুণ্যের প্রাধান্য। টুর্নামেন্টের সেরা দশ ব্যাটসম্যানের মধ্যে সাত জনই টপ অর্ডার। টুর্নামেন্টের তিনটি সেঞ্চুরি হয়েছে। সবাই তরুণ ব্যাটসম্যান। বরিশালের তরুণ পারভেজের সেঞ্চুরি তো মনে রাখার মতো। আকবর, শামিম, শরিফুলরা ঝলসে উঠেছেন বলেই আমরা আশায় বুক বাঁধছি।
পুরোনো পারফর্মার তো পারফর্ম করবেন এটাই তাদের দায়িত্ব। এর জন্যই তারা জাতীয় দলে আছেন, কেউ কেউ খুব কাছে অবস্থান করেন। জাতীয় দলের বোলিং এবং ব্যাটিংয়ে কেউ কেউ কিছুটা অফফর্মে ছিলেন, এরা আবার ছন্দ ফিরে পেয়েছেন। আবার কিছু কিছু খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স তাদের সুনাম অনুযায়ী ছিল অনেক দূরে। সিনিয়র ক্রিকেটাররা ভালো করেছেন, যাদের করার কথা তারা ধারাবাহিকতার সঙ্গে করতে পারেননি—এটাই বাস্তবতা। আশা করব, আবেগ নয়, রূঢ় বাস্তবতার আলোকে টিম ম্যানেজমেন্ট সবকিছু পর্যালোচনা করবেন।
উইকেট নিয়ে অনেকেই চিন্তিত ছিলেন। একই মাঠে খেলা। কিন্তু দেখা গেল উইকেটের আচরণ ভালো ছিল বলেই ক্রিকেট প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এবং জমেছে। উইকেট থেকে ব্যাটসম্যান এবং বোলার উভয় সাহায্য পেয়েছেন। পেস বোলাররা এবার ‘ডমিনেট’ করেছেন। মুস্তাফিজ একাই ২২টি উইকেট নিয়ে তালিকায় সবার ওপরে। বোলিংয়ে প্রথম দশ জনের তালিকায় একজন স্পিনার ঢুকতে পেরেছেন। তিনি রবিউল ইসলাম। ১৩টি ইউকেট নিয়েছেন ৮ ম্যাচে।
এক বছর নিষিদ্ধ থাকার পর সাকিব আল হাসান খুলনা দলে খেলতে নেমেছিলেন। ৯ ম্যাচে রান করেছেন ১১০। ৯ ম্যাচে উইকেট নিয়েছেন ৬টি। ব্যাট হাতে ভীষণভাবে নিষ্প্রভ। বোলিংটা ‘ইকোনমি’ ছিল। ফাইনাল খেলতে পারেননি। অসুস্থ শ্বশুরকে দেখতে যুক্তরাষ্ট্রে চলে গেছেন। মিডিয়া সাকিবকে ঘিরে ‘হাইম’ তুলেছে—এতে করে অনেকে মনে করেছেন মাঠে নেমেই সাবিক পারফরম করতে শুরু করবেন। বিষয়টি এত সহজ নয়। এক বছর মাঠের বাইরে। এই গ্যাপ পূরণ করতে সময় লাগবে। মাশরাফি বিন মুর্তজাকে এক পর্যায়ে চারটি দল নিতে চাওয়াতে লটারির মাধ্যমে তিনি খুলনার হয়েছেন। খুলনার হয়ে খেলতে নেমে ৩৭ বছর বয়সের এই ক্রিকেট যোদ্ধা ৩৫ রান ৫ উইকেট নিয়ে চট্টগ্রামের গাজী গ্রুপকে একাই পরাজিত করতে অবদান রেখেছেন। ফিটনেসে কোনো সমস্যা না হলে মাশরাফিকে কি ওয়ানডেতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে খেলতে দেখা যাবে? মাহমুদউল্লাহ সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে ফাইনালে অপরাজিত ৭০ রান করে চট্টগ্রাম গাজী গ্রুপের বিপক্ষে ৫ রানে জিতে দলকে চ্যাম্পিয়ন করেছেন। ধারাবাহিকভাবে পারফরম না করলেও মাহমুদউল্লাহ দলের জন্য সময় মতো জ্বলে উঠেছেন।
লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক।
আজীবন সদস্য বাংলাদেশ স্পোর্টস প্রেস অ্যাসোসিয়েশন।
