স্বাধীনতা ত্বরান্বিত করার অন্যতম বাহক ইত্তেফাক

আপডেট : ২৬ ডিসেম্বর ২০২০, ১৯:৪৬

বর্তমানে প্রত্যন্ত অঞ্চলসহ সারা বাংলাদেশে ছোট-বড় মিলে প্রায় অর্ধশতাধিক দৈনিক পত্রিকা চলমান। কিন্তু দৈনিক ইত্তেফাক খানদানি পত্রিকা হিসেবে নিজস্ব স্বকীয়তায় সুনামের সঙ্গে দেশের কোটি কোটি মানুষের হূদয় আঙিনায় জায়গায় করে নিয়েছে। এর মধ্যে কিছু কিছু কসমেটিক পত্রিকা বেশ কিছুদিন চলে আবার বিদায় নিয়েছে। কিন্তু দৈনিক ইত্তেফাক সর্বাবস্থায় এবং সর্বক্ষণে মাথা উঁচু করে চলেছে। অবশ্য এর অন্যতম প্রধান কারণ হলো, এতে অতিরঞ্জিত কিংবা বানোয়াট অতিমাত্রার মুখরোচক কিংবা হলুদ সংবাদের (Yellow News) স্থান নেই। সর্বসময় বস্তুনিষ্ঠ ও সত্য খবর পরিবেশন করে দেশ-বিদেশের সম্মানিত পাঠক সমাজের কাছে তুলনামূলক অধিক সমাদৃত। মূলত, এই ইত্তেফাক পত্রিকা বাংলাদেশ অভ্যুদয়ের পেছনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুগান্তরকারী ভূমিকা রেখেছে; সেটা পরে সংক্ষেপে তুলে ধরব। আসলে ‘ইত্তেফাক’ হলো আরবি শব্দ, যার আভিধানিক অর্থ হলো ‘ঐক্য বা একত্রে বা মিলেমিশে কাজ করা। যাহোক, সঙ্গতকারণেই-এর জন্মলগ্নে বঙ্গবন্ধু কি বলেছিলেন, সেই কথা তার মুখেই শুনুন (যা তার লেখা অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে প্রকাশিত হয়েছে) ‘একদিন ভাসানী সাহেব ও আমি কোর্টে যেয়ে দেখি মানিক ভাই দাঁড়িয়ে আছেন, আমাদের সাথে দেখা করার জন্য। আলাপ-আলোচনা হওয়ার পরে মানিক ভাই বললেন, ‘নানা অসুবিধায় আছি, আমাদের দিকে খেয়াল করার কেউই নাই। আমি কি আর করতে পারব, একটা বড় চাকরি পেয়েছি করাচিতে চলে যেতে চাই। আপনারা কি বলেন।’ আমি বললাম, ‘মানিক ভাই, আপনিও আমাদের জেলে রেখে চলে যাবেন? আমাদের দেখবারও কেউ বোধহয় থাকবে না।’ আমি জানতাম মানিক ভাই চারটা ছেলেমেয়ে নিয়ে খুবই অসুবিধায় আছেন। ছেলেমেয়েদের পিরোজপুর রেখে তিনি একলাই ঢাকায় আছেন। মানিক ভাই কিছু সময় চুপ করে থেকে আমাদের বললেন, ‘না, যাব না আপনাদের জেলে রেখে’। মওলানা সাহেব সাপ্তাহিক ইত্তেফাক কাগজ বের করেছিলেন। কয়েক সপ্তাহ বের হওয়ার পরে বন্ধ হয়ে যায়। কারণ টাকা কোথায়? মানিক ভাইকে বললেন, কাগজটা তো বন্ধ হয়ে গেছে, যদি পার তুমিই চালাও। মানিক ভাই বললেন, কি করে চলবে, টাকা কোথায়, তবুও চেষ্টা করে দেখব। আমি মানিক ভাইকে আমার এক বন্ধু কর্মচারীর কথা বললাম, ভদ্রলোক আমাকে আপন ভাইয়ের মতো ভালোবাসতেন। কলকাতায় চাকরি করতেন, সোহরাওয়ার্দী সাহেবের ভক্ত ছিলেন। বাংলাদেশের বাসিন্দা নন তবুও বাংলাদেশকে ও তার জনগণকে তিনি ভালোবাসতেন। আমার কথা বললে কিছু সাহায্য করতেও পারেন। মানিক ভাই পরের মামলার তারিখে বললেন যে, কাগজ তিনি চালাবেন। কাগজ বের করলেন। অনেক জায়গা থেকে টাকা জোগাড় করতে হয়েছিল। নিজেরও যা কিছু ছিল এই কাগজের জন্য ব্যয় করতে লাগলেন। কিছুদিনের মধ্যে কাগজটা খুব জনপ্রিয় হতে লাগল। আওয়ামী লীগের সমর্থকরা তাকে সাহায্য করতে লাগল। এ কাগজ আমাদের জেলে দেওয়া হতো না, আমি কোর্টে এসে কাগজ নিয়ে নিতাম এবং পড়তাম। সমস্ত জেলায় কর্মীরা কাগজটা চালাতে শুরু করল। আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠানের কাগজ হিসাবে জনগণ একে ধরে নিল। মানিক ভাই ইংরেজি লিখতে ভালোবাসতেন, বাংলা লিখতে চাইতেন না। সেই মানিক ভাই বাংলায় অন্যতম শ্রেষ্ঠ কলামিস্টে পরিণত হলেন। চমত্কার লিখতে শুরু করলেন। নিজেই ইত্তেফাকের সম্পাদক ছিলেন। তাকে ছাত্রলীগের দুই-তিন জন কর্মী সাহায্য করত। টাকা পয়সার ব্যাপারে আমার বন্ধুই তাকে বেশি সাহায্য করতেন। বিজ্ঞাপন পাওয়া কষ্টকর ছিল, কারণ ব্যবসা-বাণিজ্য কোথায়? আর সরকারি বিজ্ঞাপন তো আওয়ামী লীগের কাগজে দিত না। তবুও মানিক ভাই কাগজটাকে দাঁড় করিয়ে রেখেছেন একমাত্র তার নিজের চেষ্টায়’।

দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, এই স্বনামধন্য পত্রিকার চলার পথ মোটেই মসৃণ ছিল না। বস্তুনিষ্ঠ ও মানুষের আশা-আকাঙ্খার কথা বলতে গিয়ে মাঝে মধ্যে বড় বড় ধাক্কা খেতে হয়েছে; এ প্রেক্ষাপটে উল্লেখ্য যে, পাকিস্তান সৃষ্টি হওয়ার পর থেকে পশ্চিম পাকিস্তানপুষ্ট তথাকথিত সরকার পূর্ব পাকিস্তানকে নানা ভাবে ঠকাতে থাকে এবং পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে যে বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছিল। তার নেতিবাচক শিকার হয় তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের ৭ কোটি বাঙালি। আর এ ধরনের কথা নিয়মিত তুলে ধরে এই ইত্তেফাক পত্রিকা, যার ফলশ্রুতিতে ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচিত হয় বললে বেশি বলা হবে না। যদিও ষড়যন্ত্রের কারণে এই সরকার বেশি দিন টেকেনি। এদিকে প্রেসিডেন্ট আইয়ুবের আমলের (কনভেনশন মুসলিম লীগ) পুরো ১০ বছরসহ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের গোজামিলের সময় পর্যন্ত এই পত্রিকা বস্তুনিষ্ঠ খবর জনসমক্ষে তুলে ধরতে এতটুকু পিছপা হয়নি। এর মধ্যে বাঙালিদের স্বার্থ বিবেচনায় এনে সমালোচনামূলক খবর প্রকাশের জন্য সম্পাদক মানিক মিয়া ১৯৫৯ সাল এবং ১৯৬২ সালে গ্রেফতার হন। এদিকে ১৯৬৪ সালে হিন্দু মুসলমান দাঙ্গা রোধকল্পে বলিষ্ঠ ভূমিকা নেয়। এতদ্ব্যতীত ১৯৬৬ সালে ছয় দফা দাবির পক্ষে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ পূর্বক মুখপত্র হিসেবে সোচ্চার হলে সেই বছরে মানিক মিয়া পুনরায় গ্রেফতার হন এবং তার উপর চলে অকথ্য অত্যাচার। শুধু তাই নয়, দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ করে দেওয়া হয়। যদিও চাপের মুখে ১৯৬৯ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি এই পত্রিকা পুনঃপ্রকাশের অনুমতি পায়। তত্পর একই সালে গণঅভ্যুত্থানের সময় এই সেই দৈনিক পত্রিকা ইত্তেফাক, যা বাঙালি জাতীয়তাবাদ সমুন্নত করতে বলিষ্ঠ ভূমিকা নিয়েছিল, তা কভু ভুলবার নয়। কিন্তু এই বছরের জুন মাসের ১ তারিখে এই পত্রিকার জীবনে বিরাট একটি সুনামি নেমে আসে। কেননা এই তারিখে জ্বলজ্বলে নক্ষত্রস্বরূপ অত্র পত্রিকার কর্ণধার মানিক মিয়া এই ধরাধাম থেকে চির বিদায় নেন। তার তিরোধানে সুযোগ্য দুই পুত্রের (সর্বজনাব মইনুল হোসেন ও আনোয়ার হোসেন মঞ্জু) ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নেন। এর মধ্যে একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয় এবং স্বাধীনতার পক্ষে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে ইতিবাচক ভূমিকা থাকায় ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনী ইত্তেফাক পত্রিকার প্রধান কার্যালয় সম্পূর্ণরূপে ভস্মীভূত করে দেয়। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশ হওয়ার পরও ১৯৭৫ সালের ১৭ জুন জাতীয়করণ করা হয়। যদিও একই বছরে ২৪ আগস্ট সুযোগ্য তনয়দ্বয়কে মালিকানা আবার ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এই প্রবন্ধের স্বার্থে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পেছনে এর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভূমিকা বড় আকারে না করে যতকিঞ্চিত্ তুলে ধরেছি। যাহোক, বর্তমানে এই বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ বাহক পত্রিকা ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন লিঃ আওতায় ৪০ নং কাওরান বাজার থেকে প্রকাশিত হচ্ছে। এর বর্তমানে সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তাসমিমা হোসেন (যিনি জনাব আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর এর সুযোগ্য সহধর্মিণী)। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য যে, এই পত্রিকা সব ধরনের পাঠকদের মনের ক্ষুধা প্রশমিত করে থাকে। এতে বর্তমানে সমসাময়িক খবরসহ ২৫টিরও অধিক ইভেন্ট সন্নিবেশিত করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে মানসম্পন্ন পত্রিকা হিসেবে সর্বজন স্বীকৃত।

পরিশেষে এই কথা বলে ইতি টানছি যে, এই খানদানি পত্রিকা শত বাধার মধ্যেও এতটুকু থেমে থাকেনি। বস্তুনিষ্ঠ খবর পরিবেশনের ব্যাপারে এই ধান শালিকের দেশের প্রায় ১৮ কোটি মানুষের মনের আঙিনায় জায়গা করে নিয়ে মাথা উঁচু করে আছে। আর ১৯৫২ সাল থেকে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে এই পত্রিকা যে গণমানুষের আবেদনময়ী খবর প্রকাশ করে দ্রুত স্বাধীনতার পথ সুগম করে, তা কোনোক্রমেই খাটো করে দেখার অবকাশ নেই। তাই আমরা জোর গলায় বলতে পারি যে, বাংলাদেশ অভ্যুদয়ের পেছনের একচ্ছত্র নিয়ামক হিসেবে এই পত্রিকার বলিষ্ঠ ভূমিকা প্রশংসা পাওয়ার দাবিদার। তাছাড়া জননন্দিত ও বহুল প্রচারিত এই দৈনিক ইত্তেফাক ৬৭ বছরের দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে চলতি বছরের ২৪ ডিসেম্বর ৬৮ বছরে পদার্পণ করছে। আর এই শুভক্ষণে আমরা কায়মনবাক্যে হূদয় নিংড়ানো শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।

 

লেখক : গবেষক।