বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তিগত উন্নতির মহাবিস্ফোরণের কল্যাণে বিগত কয়েক দশক আগেও সামাজিক যোগাযোগ এবং মতামত প্রকাশের মধ্যমগুলোতে যে সীমাবদ্ধতা ছিল তা এখন গল্প-স্মৃতি। যোগাযোগের জন্য সর্বজনব্যবহূত মাধ্যম হিসাবে চিঠিপত্র আর মতামত প্রকাশের জন্য শুধু কাগজ আকারে প্রকাশিত সংবাদপত্র আমাদের আগের প্রজন্মের একমাত্র সম্বল ছিল; কিন্তু এই সময়ের বাস্তবতায় মতামত প্রকাশের সীমাবদ্ধতার সেই কুঁড়েঘরের ছাদ এখন বিস্তৃত মহাকাশের সমান। সাংবাদিকের কলম এখন কিবোর্ড রেকর্ডার হয়ে নাগরিক সাংবাদিকতার কল্যাণে আলোক গতির বুলেটে রূপান্তরিত হয়েছে হঠাত্ই।
দেশভাগের আগে ব্রিটিশ শোষণ থেকে মুক্তি পেতে এই বঙ্গের রাজনৈতিক নেতাদের নেতৃত্বে গণমানুষের লড়াই-সংগ্রামের ইতিহাস, জেল-জুলুম আর মতপ্রকাশে টুঁটি চেপে ধরার এক নির্মম ট্র্যাজেডি। দেশভাগের পরও যখন বাঙালিদের মুক্তির স্বপ্ন অধরা তখন বৈষম্যের শিকার হওয়া এদেশের মানুষের বন্ধ দমের গল্পগুলো প্রকাশ করতেও তত্কালীন সংবাদমাধ্যমগুলোতে ছিল বাধ্যবাধকতা। সময়ের আবেদনে বাংলার গণমানুষের নিষ্পেষণের ক্ষোভ আর সংগ্রামের মুখপত্র হয়ে প্রথম সাপ্তাহিক ইত্তেফাক প্রকাশিত হয় হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, আবদুল হামিদ খান ভাসানী, শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত রাজনৈতিক দল আওয়ামী মুসলিম লীগের সমর্থিত পত্রিকা হিসেবে, যার সম্পাদক ছিলেন তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া।
এই পত্রিকাটিই ভাষা আন্দোলনের পরবর্তী সময়ে ১৯৫৩ সালের ২৪শে ডিসেম্ব্বর দৈনিক পত্রিকা হিসেবে প্রকাশিত হতে থাকে। ১৯৫৪ সালে নির্বাচনে প্রভাবশালী মুসলিম লীগের হারিকেনের বিরুদ্ধে নব্যগঠিত যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন ছিল তত্কালীন সময়ের রাজনৈতিক ঐতিহ্য বিবেচনায় কঠিন এক লড়াই। সেই নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের ২৩ দফার প্রচারসহ জনমত গঠনে ইত্তেফাক পত্রিকা ভূমিকা রাখে। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান ক্ষমতা দখল করলে স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয় ইত্তেফাকের কলম। ১৯৬২ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে গ্রেফতার হন ইত্তেফাকের সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া।
১৯৬৪ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার উত্থান হলে অসাম্প্রদায়িক চেতনা বিকাশে ইত্তেফাক ছিল প্রচারণার কাজে। ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত ছয় দফা প্রচারে পত্রিকাটি মুখপত্র হিসেবে ভূমিকা রাখে। ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানে বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে সমর্থন ও অভ্যুত্থানের সংবাদ প্রচার করে গণ-আন্দোলনকে চাঙ্গা রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে ইত্তেফাক। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ কালরাতে অপারেশন সার্চলাইট শুরু করার সময় ইত্তেফাকের কার্যালয় পুড়িয়ে দেয় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধ চলার সময়েই আবার প্রকাশিত হয় পত্রিকাটি।
ভাষা আন্দোলনের পরবর্তী সময় থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বাঙালির চূড়ান্ত মুক্তির সময় পর্যন্ত বা আওয়ামী মুসলিম থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের লড়াই-সংগ্রাম আর স্বাধিকার আদায়ের দুর্বার সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বিজয় অর্জন পর্যন্ত ইত্তেফাক ছিল বাঙালির গণমানুষ এবং রাজনৈতিক নেতাদের মতামত প্রকাশ ও তথ্যপ্রাপ্তির অন্যতম বস্তুনিষ্ঠ এবং নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম। ১৭ই ডিসেম্বর ইত্তফাক প্রধান সংবাদ ছিল, ‘দখলদার পাক বাহিনীর আত্মসমর্পণ, সোনার বাংলা মুক্ত’ এবং ১৮ই ডিসেম্বর ইত্তেফাকের প্রধান সংবাদ ছিল, ‘সোনার বাংলায় মানবেতিহাসের নৃশংসতম হত্যাকাণ্ড, ঢাকার শতাধিক সাংবাদিক সাহিত্যিক অধ্যাপক চিকিত্সক ও বুদ্ধিজীবী নিহত’।
সেই প্রতিবেদনটিতে শহিদ বুদ্ধিজীবীদের নাম উল্লেখ করে বলা হয়, ‘দখলদার পাক বাহিনীর শেষ নৃশংস গণহত্যার নির্মম শিকার সোনার বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের মৃতদেহ ছড়াইয়া-ছিটাইয়া পড়িয়া রহিয়াছে। ঢাকার শহরতলি রায়ের বাজারের অদূরবর্তী খানাখন্দ, ইটের গাদা ও গর্তে ইতিহাসের সেই জঘন্যতম নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার বাংলার বুদ্ধিজীবীদের মৃতদেহের সবারই পেছনে হাত বাঁধা এবং বুক ও মাথায় গুলি ও বেয়নেটের আঘাতের চিহ্ন। অনেকের চোখ ওপড়ানো। অনেক মৃতদেহ শকুন, শৃগাল, কাক ও কুকুরের আহার্যে পরিণত হইয়াছে। অনেকের শুধু কঙ্কাল ছড়াইয়া পড়িয়া রহিয়াছে।
মতিঝিলের, ১ রামকৃষ্ণ মিশন রোড বা ইত্তেফাক মোড় আবার মহান জাতীয় সংসদ ভবনের সামনের মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ নামটি এদেশের অনেক সাংবাদিক ও রাজনৈতিকের কাছেই এক স্মৃতিবিজড়িত আবেগের নাম। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেখ মুজিবুর রহমান, বাংলার গণমানুষের আওয়ামী লীগ, তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া আর দৈনিক ইত্তেফাক, এই সম্পর্কের সম্মিলন, এদেশের ইতিহাসে বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের বার্তা বাহক।
লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
