মাদকরাজ্যে প্রবেশের তোরণ

আপডেট : ২৬ ডিসেম্বর ২০২০, ২১:২৩

একটি জাতি ধ্বংস হবার জন্য তার যুবসমাজ বিপথগামী হওয়াটাই যথেষ্ট। আর ধূমপান ও মাদকাসক্তিই একটি যুবসমাজকে ধ্বংসের অতলগহ্বরে নিক্ষেপ করতে সক্ষম। গবেষণায় দেখা যায়, অল্প বয়সে ধূমপানের অভ্যাস হতেই ধীরে ধীরে কিশোর বা যুবকরা মাদকের প্রতি আসক্ত হয়। ধূমপানে আসক্তিটা সৃষ্টি হয় নানাবিধ কারণে। যেমন, কৌতূহল একটি বড় কারণ। যখন শিশু-কিশোররা চারদিকে ধূমপানের ছড়াছড়ি দেখে, তখনই তাদের মধ্যে এটা নিয়ে এক ধরনের কৌতূহল কাজ করে। শখের বশবর্তী হয়ে অনেকে ধূমপান করে বসে। তারপর ধীরে ধীরে সিগারেটের প্রতি নেশা তৈরি হয়ে যায়। আবার, অসত্ বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশার কারণে অনেক শিক্ষিত পরিবারের সন্তানরাও জড়িয়ে পড়ে সিগারেটের নেশায়। অতএব, অভিভাবকদের নিজ সন্তানের প্রতি সচকিত দৃষ্টি রাখতে হবে যে, আপনার সন্তান কার সঙ্গে মেলামেশা করছে, কোন পরিবেশে চলাফেরা করছে ইত্যাদি বিষয়ে। ধূমপান হতেই একজন কিশোরের মনোজগতে মাদকের প্রতি কৌতূহল বাড়তে আরম্ভ করে। অসত্ বন্ধুদের মাধ্যমে সে কৌতূহলের বশবর্তী হয়ে শুরু করে মাদক সেবন। এভাবেই সে ধীরে ধীরে ডুবে যায় মাদকের ভয়াল নেশায়। এক সময় নেশার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে এসব যুবকরা জড়িয়ে পড়ে ছিনতাই, চাঁদাবাজি, চুরি, ডাকাতি ইত্যাদি সামাজিক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে। অশান্ত হয়ে ওঠে একটি সভ্য সমাজ। অতএব, দেশ হতে মাদকের শেকড় উপড়ে ফেলতে হলে ধূমপানমুক্ত সমাজ গড়ে তুলতে হবে।

এ দেশে যত্রতত্র ধূমপান করা যেন একটি রীতিতে পরিণত হয়েছে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, বাস টার্মিনাল, লঞ্চঘাট, স্টেডিয়াম, রাস্তাঘাট সমস্ত জায়গাগুলো যেন সিগারেটের বিষাক্ত ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে আছে। ফলে, অধূমপায়ী ব্যক্তিরাও ধূমপান না করেই বিষাক্ত ধোঁয়া দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছেন। দেশের প্রচলিত আইনে প্রকাশ্যে ধূমপান করলে শাস্তির বিধান রয়েছে। অথচ, পুলিশ প্রশাসনের লোকেরাও যখন ইউনিফর্ম পরে রাস্তায় ডিউটিরত অবস্থায় প্রকাশ্যে ধূমপান করেন তখন আইনের প্রতি প্রশাসনেরই অবজ্ঞা দেখে হতাশ হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না।

মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার কথা মুখে বলা যতটা সহজ, বাস্তবে রূপ দেওয়া ঠিক ততটাই কঠিন। কেননা, সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়ছে মাদকতা। যেন একটি প্রজন্ম উন্মত্ত হয়ে আছে মাদকের বিধ্বংসী নেশায়। কিশোর, যুবক, স্কুলছাত্র, কলেজছাত্র, বিশ্ববিদ্যালয়ছাত্র সর্বত্রই যেন জালের মতো বিস্তার লাভ করেছে মাদকের ভয়াল থাবা। ফলে, মাদক নির্মুলে কঠোর আইন করার পাশাপাশি আরো অনেক বিষয়ে মনোযোগ দিতে হবে।

যুবসমাজ মাদকে জড়িয়ে যাচ্ছে নানাবিধ কারণে। ধূমপানে আসক্তি, কৌতূহল, অসত্ সঙ্গ, ব্যক্তিজীবনে হতাশা, পারিবারিক অশান্তি, বেকারত্ব, অপরাজনীতি, প্রেমে ব্যর্থতা এসব থেকেই একজন মানুষ মাদক সেবনে জড়িয়ে পড়ে। ফলে, এসব থেকেই ধীরে ধীরে শেষ হয়ে যাচ্ছে আমাদের যুবসমাজ।

মাদকতা নির্মুলে সীমান্তে মাদকের চোরাচালান প্রতিরোধে কঠোর এবং দেশের ভেতর মাদক উত্পাদনের সব আস্তানা ধ্বংস করতে হবে। খোঁজ নিয়ে দেখা যায় মাদক ব্যবসায়ীদের পুলিশ গ্রেফতার করলেও তারা উচ্চআদালত থেকে জামিনে বেরিয়ে গিয়ে পুনরায় জড়িয়ে পড়ছে মাদক ব্যবসায়। এক্ষেত্রে করণীয় হলো, মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবীদের গ্রেফতার করে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে শাস্তির ব্যবস্থা করা। আর পুলিশ প্রশাসনের ভেতর ওত পেতে থাকা সেসব অসত্ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া, যারা মাদক ব্যবসায়ীদের নিকট থেকে মোটা অঙ্কের উেকাচ গ্রহণ করে অবাধে মাদক ব্যবসার সুযোগ প্রদান করছে। এছাড়াও, বেকারত্ব দূরীকরণে নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরির জন্য সরকারি উদ্যোগগুলো সফলভাবে বাস্তবায়নে সবাইকে সততার সঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে। আর সবারই নিজ সন্তানের প্রতি খেয়াল রাখতে হবে; এবং তাদের ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার আলোয় আলোকিত করতে হবে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।