সেকথা সত্য হতো, যদি একথা সত্য হতো যে মানুষ সাহিত্য থেকে কেবল বিনোদন নেয়। কিন্তু মানুষ তো সাহিত্য থেকে দর্শনও নেয়,—জীবনবোধ নেয়, দৃষ্টিভঙ্গি নেয়, ভাবপ্রকাশের কৌশল নেয়,—আর সবচেয়ে বেশি করে যা নেয়, তা হলো সমবেদনা—যে বেদনা কেউ পেয়ে এসেছে, তা যে আর কেউ পায়, তা জানলেই সমবেদনা পাওয়া হয়। চারপাশের মানুষ সমবেদনা প্রকাশে নিঃশব্দ হয়ে পড়লেও, লেখকদের শব্দে শব্দে তা ধ্বনিত হতে থাকে। তাই এত করে সাহিত্য পড়া; তাই শিল্পসাহিত্যের এত বিপুল আয়োজন—দুকথা গুছিয়ে না বললে, শুনে স্বস্তি নেই; ক’টা দৃশ্য মসৃণ সুষমায় জুড়ে না দিলে, দেখার তৃপ্তি নেই; ক’টা ধ্বনি ধেয়ে ধেয়ে উঠে তালে তালে পড়ে না গেলে, শুনে সুখ হয় না—তাই দুচরণের অণুকাব্য থেকে চৌদ্দ ফর্মার উপন্যাস পর্যন্ত কথা পাড়া হয়; তাই নদীর বুকে কুয়াশার মাঝে একটিমাত্র খড়াজালের ছবি থেকে ১৮০ মিনিটের ছায়াছবিতে দৃশ্যের পরে দৃশ্যের অবতারণা করা হয়; তাই চৌকির পরে মায়ের মুখের এক স্তবক ছড়া থেকে সহস্র স্তবকের ব্যালাড ধেয়ে ধেয়ে গেয়ে উঠে তালে তালে থামানো হয়—তবেই মানুষ সমবেদনা পায়, জীবনের গভীর বোধ পায়, কল্পনা পায়; শূন্য নেমে এসে জুড়ে বসে উদ্বিগ্ন মাথায়। শিল্পসাহিত্যের কাজ কিছু অন্যরাও করে দিচ্ছে—একথা সত্য—একথা আগেও সত্য ছিল—ওই ছিটেফোঁটা কাজে যাদের কাজ হয়ে যায়, শিল্পসাহিত্য তাদের জন্য নয়—আগেও ছিল না।
