পোশাকে রঙ ছড়িয়ে

আপডেট : ২৮ ডিসেম্বর ২০২০, ২০:৪৪

‘বিশ্বরঙ’র ফ্যাশনের মূল ভাবনা গড়ে ওঠেছে দেশীয় আত্মপরিচয়কে ঘিরে। দেশীয় সকল উত্সব পার্বণে এই ফ্যাশন হাউজটির থাকে বিশেষ বিশেষ আয়োজন। ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নয়, দায়িত্ববোধ ও মূল্যবোধ থেকেই করা হয়েছে। ‘রঙ’র প্রধান উদ্যোক্তা হিসেবে বিপ্লব সাহা আপদমস্তক শিল্পসত্ত্তায় পরিপূর্ণ হতে চেয়েছেন প্রতিবার।  তার ভাষ্যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে ১ম বিভাগে এমএফএ সম্পন্ন করে শিল্পসত্ত্বাকে দেশ ও জাতির কল্যাণে ব্যবহারের প্রচেষ্টায় নিজেকে মগ্ন করি অবিরাম। মুক্তবাজার অর্থনীতির এই অস্থির সময়েও নিজস্ব শেকড়ের সন্ধান করতে গিয়েই ফ্যাশন ডিজাইনার হিসেবে দেশীয় তাঁতকে প্রাধান্য দিয়েছি সবসময়। এ দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্যের বিশ্বব্যাপী মূল্যায়নে ‘বিশ্বরঙ’র পথচলা সুদীর্ঘ ২৬ বছরের। সকল সীমাবদ্ধতাকে উপেক্ষা করে সৃষ্টির ব্যাকুলতায় ১৯৯৪ সালের ২০ ডিসেম্বর সময় রাঙানোর ব্রত নিয়ে নারায়ণগঞ্জে সূচনা হয় ফ্যাশন হাউজ রঙ’র। সময়ের ব্যাপ্তিতে সময় রাঙানোর ব্রতটা রূপ নেয় এ দেশের ফ্যশন সচেতন মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসায়। বিংশ শতাব্দী অতিক্রম করে একবিংশ শতাব্দীর এই সময়ে এসে—সময় রাঙানোর ভাবনাটা ছড়াতে চায় বিশ্বময়। ‘রঙ যেন মোর মর্মে লাগে’— রবি ঠাকুরের এই অনুভবকে বিশ্বময় ছড়াতেই ২০১৫ সালে পথচলা শুরু করে ‘বিশ্বরঙ’।

বর্তমানে দেশের জনপ্রিয় ফ্যাশন ব্রান্ড ‘বিশ্বরঙ’ ১৯৯৪ সাল থেকে ভিন্নধর্মী কাজের জন্যই ফ্যাশন সচেতনদের অকৃত্রিম ভালোবাসায় সিক্ত। বিগত সময়ে দেশের ফ্যাশন জগতে ফ্যাশন সচেতনদের জন্য অন্তঃপ্রাণ প্রচেষ্টার ফসল তাদের নিরীক্ষামূলক কাজ। এ দেশের ইতিহাস ঐতিহ্য-শখের হাড়ি, মুখোশ, নকঁশীপাখা, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বাংলার পটচিত্র, বাংলা পঞ্জিকা, ঐতিহ্যে বাংলা সিনেমা, পানাম নগর, কান্তজি মন্দিরের টেরাকোটা, রিক্সা মোটিফ সহ আল্পনার মতো মহামূল্যবান মোটিফকে পোশাকের অলংকরণ হিসেবে ব্যবহার করে দেশীয় ফ্যাশনকে ইতিহাস ঐতিহ্যের মিশেলে নিয়ে যেতে চেয়েছেন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমৃদ্ধির শিখড়ে। প্রদর্শন করেছেন আমেরিকা, ভারত, মালয়শিয়া, লন্ডন, কাতার, অস্ট্রেলিয়া, হল্যান্ড, ইতালি, কানাডার মতো ফ্যাশন সচেতনদের দেশে। এসব দেশে নিয়মিত বিশ্বরঙ’র পোশাক বিক্রি হচ্ছে বাংলাদেশ থেকে—যা দেশের জন্য গর্বের এবং আনন্দের। তারা উপহার দিয়েছেন পোশাকে অতি উজ্জ্বল রঙের অনুভবকে যা বাংলাদেশের ফ্যাশন খাতকে আরো রাঙ্গিয়েছে অনুকরণীয়ভাবে। টাঙ্গাইলের মলিন তাতের শাড়িকে আধুনিক ফ্যাশনের অনুষঙ্গ করতে নিরলস প্রচেষ্টার ফলাফল বর্তমানে বাংলাদেশের ফ্যাশন খাতে বিদ্যমান। বিভিন্ন দিবসে পোশাকের বর্ণিলতা তাদের মাধ্যমেই শুরু হয়, যা আজ অভিন্ন এক রীতিতে সামগ্রিকভাবে প্রচলিত।

ফ্যাশন হাউজ ‘বিশ্বরঙ’ শুধু পোশাক বানাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। বরং প্রতিষ্ঠানটি বেশ কিছু সামাজিক কর্মসূচিরও আয়োজন করে থাকে। ২০১০ সালে জাতীয় যাদুঘরে প্রথমবারের মতো ‘আমাদের প্রত্যাহিক জীবনে রঙের উপস্থিতি’ শীর্ষক এক যুগান্তকারী প্রদর্শনীর আয়োজন করে, যা সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বোদ্ধা মহলেও ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করে। সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেও সরে আসেনি কখনো, দেশীয় বুটিক শিল্পকে রক্ষায় রাজপথেও ছিল সরব। শিশুদের মেধাবিকাশের লক্ষ্যে আয়োজন করে মা দিবসে ‘আমার রঙে আমার মা’ শীর্ষক এক ব্যতিক্রম প্রতিযোগীতা ও প্রদর্শনীর। শিশুদের আঁকা প্রাণবন্ত চিত্রকলাকে ফ্যাশনের উপাত্ত হিসেবে ব্যবহার করে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা। ২০ বছর পূর্তিতে প্রতিষ্ঠানটি আরটিভির সঙ্গে যৌথভাবে আয়োজনে করে ‘২০২০ কালার্স’। সারাদেশের টিনএজদের মধ্য থেকে প্রতিভাবানদের বাছাই করে উন্নত প্রশিক্ষণের মধ্যদিয়ে এদেশের মিডিয়াকে উপহার দেয় একঝাঁক নতুন মুখ। যাদের মধ্য থেকে কেউ কেউ আন্তর্জাতিক পর্যায়েও কাজ করছে এখন।

এই দীর্ঘ পথচলা প্রসঙ্গে বিশ্বরঙ’র কর্ণধার বিপ্লব সাহা বলেন, ‘বিশ্বরঙ’র সৃষ্টিশীলতা সবসময়ই সুস্পষ্ট এবং স্বতন্ত্র। আমরা আমাদের স্থানীয় কারিগর, তাঁতি, সূচীশিল্পী, কারুশিল্পীদের সঙ্গে কাজ করি এবং বিস্ময়করভাবে প্রাণবন্ত সংগ্রহের পরিসীমা অতিক্রম করি ফ্যাশনপ্রেমীদের অভিন্ন নিরবিচ্ছিন্ন চাওয়াকে। আমাদের নকশাগুলি আমাদের লোক সংস্কৃতির ঐতিহ্য দ্বারা অনুপ্রাণিত, যা ঐতিহাসিকভাবে দক্ষতার উত্স হিসাবে নির্ধারিত ভূমিকা পালন করে আসছে সুদীর্ঘ ২৫ বছর ধরে। সর্বোপরি এদেশের সাধারণ মানুষই আমাদের সৃষ্টির এক মহান অনুপ্রেরণা। এই সুদীর্ঘ ২৬ বছরের পথচলায় ‘বিশ্বরঙ’র পাশে আছেন সাংবাদিক বন্ধুরা, বিভিন্ন মিডিয়া কর্মীরা, মিডিয়া তারকারা, অভিনেতা, অভিনেত্রী, মডেল সহ নানা পেশার শুভানুধ্যায়ীরা। তাদের প্রতি অকৃত্রিম অশেষ কৃতজ্ঞতা। শুভেচ্ছা সবসময়ের।

পোশাক ও ছবি বিশ্বরঙ